1. [email protected] : admi2017 :
  2. [email protected] : Daily Khabor : Daily Khabor
  3. [email protected] : shaker :
  4. [email protected] : shamim :
রবিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ১০:১৬ পূর্বাহ্ন

‘অপয়া’ ২০২০

ডেইলি খবর নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ৫৩ বার পড়া হয়েছে

২০২০ সাল। হতাশা, আতঙ্ক আর বিষাদের বছর!নানান আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনার মধ্য দিয়েই পার হল বছরটি। বছরের তৃতীয় মাসে বিশ্বের সঙ্গে মহামারী করোনাভাইরাসে জর্জরিত হয় বাংলাদেশ। তাই বছরটিকে মনে রাখা হবে নানা কারণে। তবে সেখানে বেদনার গ্লানিই বেশি। বছরটি প্রিয়জন হারানোর বেদনা দিয়েছে অনেক বেশি। এজন্য ‘অপয়া’ বছর হিসেবেই ২০২০ সালকে মনে রাখবে দেশের মানুষ।
গত ৮ মার্চ যখন দেশে প্রথম করোনা শনাক্ত হয়, তখন থেকেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে থাকে জনজীবনে। শুরুতে সাধারণ মানুষ বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব না দিলেও একটা পর্যায়ে অবহেলার আর সুযোগ ছিল না। একের পর এক স্বজন, প্রিয় মানুষ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে পুরো জাতি। এর মধ্যেই দেশে নেমে এলো আরেকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্পান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও উড়িষ্যা থেকে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে। এতে প্রাণ হারান ১৬ জন। তবে এ দুর্যোগে অনেক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হলেও বাংলাদেশ সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবেলা করেছে; যার ফলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি আশঙ্কাজনক হয়নি।

প্রবাদ আছে, কপালের লিখন না যায় খণ্ডন- এটিই যেন বাস্তবে মিলতে থাকে একের পর এক ঘটনার মধ্য দিয়ে। ২৯ জুন রাজধানী ঢাকার শ্যামবাজারে বুড়িগঙ্গায় লঞ্চ দুর্ঘটনায় অন্তত ৩৪ জন নিহত হন; যা সারা দেশের মানুষের অন্তরে নাড়া দেয়।

যুবলীগ নেত্রী পাপিয়াকাণ্ড
বছরের শুরুতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে যুবলীগ নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়া র‌্যাবের হাতে আটক হওয়ার ঘটনা; যা সারা দেশে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি প্রতারণা, অর্থপাচার, জাল টাকা সরবরাহ, মাদক ব্যবসা ও অনৈতিক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমান সুমনসহ ৪ জনকে আটক করে র‌্যাব। এরপরই পাপিয়ার নানা অপকর্মের ফিরিস্তি বের হতে থাকে। তিনি গুলশানের একটি পাঁচ তারকা হোটেলের প্রেসিডেনশিয়াল স্যুটসহ চারটি কক্ষ ভাড়া নিয়েছিলেন। ২০১৯ সালের ১৩ অক্টোবর থেকে ২০২০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হোটেলটির কক্ষ ভাড়া, খাবার ও আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ পাপিয়া মোট বিল পরিশোধ করেছেন ৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা। প্রতিদিন হোটেলের বিলই দিতেন আড়াই লাখ টাকা।
অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা, রাজধানীর অভিজাত হোটেলগুলোতে সুন্দরী তরুণী সরবরাহ, মাদক চোরাচালান, চাকরির তদবির, জবরদখল, দেশ-বিদেশে ক্যাসিনো ব্যবসা– এমন কোনো অভিযোগ নেই যা তার বিরুদ্ধে নেই। সুন্দর অবয়বের আড়ালে পাপিয়ার পাপের সাম্রাজ্য এতদিন আড়ালেই ছিল। অবশেষে দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তার অপরাধ জগতের বিস্তৃতি।

এসব করেই বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হন বলে র‌্যাবকে জানান পাপিয়া। আটকের পর পাপিয়ার মোবাইল ফোন তদন্ত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তার ফোনটি অশ্লীল ভিডিওতে ঠাসা ছিল। এসব ভিডিওতে সুন্দরী তরুণীদের সঙ্গে উঠতি শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী ছাড়াও আমলা এবং কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার অশ্লীল ছবি ছিল। র‌্যাব জানায়, রাজনীতির আড়ালে মাদক ও নারীদের নিয়ে ‘বাণিজ্য’ করতেন পাপিয়া। রাজধানীর তারকা হোটেলগুলোয় মাঝে-মধ্যেই ‘ককটেল পার্টি’র আয়োজন করতেন। এসব পার্টিতে উপস্থিত হতেন সমাজের উচ্চস্তরের লোকজন। মদের পাশাপাশি পার্টিতে উপস্থিত থাকত উঠতি বয়সী সুন্দরী তরুণীরা। মদের নেশায় টালমাটাল আমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গে কৌশলে ধারণ করা হতো ওই তরুণীদের অশ্লীল ভিডিও। পরে ওইসব ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন সময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করতেন পাপিয়া। বনিবনা না হলেই ফেসবুকে ছড়িয়েও দেয়া হতো। পাপিয়া দম্পতির বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তারা বর্তমানে কারাগারে বন্দি রয়েছেন।

রিজেন্টের সাহেদকাণ্ড
বছরের সবচেয়ে আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ছিল করোনা টেস্ট জালিয়াতি। উত্তরার বেসরকারি রিজেন্ট হাসপাতাল ছিল এ জালিয়াতির কেন্দ্রবিন্দু। হাসপাতালটি টেস্ট না করেই করোনা রিপোর্ট দিত। এছাড়াও সরকার কর্তৃক করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে রোগীদের কাছ থেকে টাকা না নেয়ার কথা থাকলেও রিজেন্ট হাসপাতাল সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এসব অভিযোগ ওঠার পরই দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হয়। অভিযান চালায় রিজেন্ট হাসপাতালে। অভিযানে গিয়ে অভিযোগের প্রমাণও পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একপর্যায়ে হাসপাতালটির দুটি শাখা (উত্তরা ও মিরপুর) সিলগালা করে দেয়। একই সঙ্গে হাসপাতালটির চেয়ারম্যান সাহেদ করিম ওরফে মো. সাহেদের বিরুদ্ধে প্রতারণা, অনিয়ম, দুর্নীতি, জালিয়াতিসহ বহু অভিযোগে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়।
এসব মামলায় ১৫ জুলাই ভোরে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার কোমরপুর সীমান্তের লাবন্যবতী নদীর কুমড়োর খালের বেইলি ব্রিজের নিচ থেকে সাহেদকে বোরকা পরিহিত অবস্থায় গ্রেফতার করে র‌্যাব। এ সময় তার কাছ থেকে একটি পিস্তল ও তিন রাউন্ড গুলি ও ২ হাজার ৩৩০ রুপি উদ্ধার করা হয়। এরপর তাকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় আনা হয়। গ্রেফতারের সময় সাহেদের কাছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়া যাওয়ায় তার বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। এছাড়া তার বিরুদ্ধে অর্থপাচারের মামলাও দায়ের করা হয়। গত ২৮ সেপ্টেম্বর অস্ত্র আইনে করা একটি মামলায় সাহেদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন ঢাকার একটি আদালত। এ আইনের অপর ধারায় সাহেদকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। রায়ে আদালত বলেছেন, উভয় ধারা একসঙ্গে কার্যকর হবে। আলোচিত এ মামলার রায়ে আদালত দুটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। সেগুলো হচ্ছে- সাহেদ ধুরন্ধর। দ্বিতীয় পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, আমাদের সমাজে সাহেদের মতো ভদ্রবেশী অপরাধীদের জন্য এ রায়টি একটি বার্তা হয়ে থাকবে। বর্তমানে সাহেদ কারাগারে বন্দি। তার বিরুদ্ধে বাকি মামলাগুলোর বিচারকার্য চলমান রয়েছে। শুধু সাহেদ নয়, তার সহযোগীসহ প্রতিষ্ঠানের আরও আটজন কর্মকর্তাকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। তারাও কারাগারে বন্দি।

জেকেজির সাবরিনাকাণ্ড
রিজেন্টের সাহেদ কেলেঙ্কারিতে তোলপাড় শুরুর মধ্যেই ওঠে আসে আরেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জেকেজি হেলথ কেয়ারের নাম। এ প্রতিষ্ঠানটিও করোনাভাইরাস পরীক্ষার টেস্ট না করেই রিপোর্ট সরবরাহ করত। জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা চৌধুরী ও তার স্বামী প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী আরিফ চৌধুরী। এ দু’জনের বিরুদ্ধেই করোনা টেস্ট জালিয়াতিতে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ উঠে। শুরু হয় দেশজুড়ে তোলপাড়। বিশেষ করে ডা. সাবরিনা আসেন আলোচনা-সমালোচনার শীর্ষে। ডা. সাবরিনা ছিলেন জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসক। পাশাপাশি তিনি জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান। অভিযোগ উঠার পরই তাকে থানায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়। পরে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। এর আগে তার স্বামী আরিফকেও গ্রেফতার করা হয়। দু’জনকেই কয়েক দফায় রিমান্ডে নেয়া হয়। বর্তমানে তারা কারাগারে বন্দি।

পুলিশের গুলিতে মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ড
পাপিয়া, সাহেদ আর সাবরিনাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই দেশে ঘটে আরেক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। ৩১ জুলাই কক্সবাজারের টেকনাফে বাহারছড়া ইউনিয়নের মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ নিহত হন। এ নিয়ে সারা দেশে তীব্র আলোচনা আর প্রতিবাদ শুরু হয়। অভিযোগ ওঠে টেকনাফ থানার ওই সময়কার ওসি প্রদীপ কুমার দাশের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় গত ৫ আগস্ট নিহত সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে প্রধান আসামি করে টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ৯ পুলিশ সদস্যকে আসামি করে কক্সবাজার আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটির তদন্ত করার আদেশ দেন র‌্যাবকে। এ ঘটনায় ওসি প্রদীপকে প্রথমে ক্লোজড (প্রত্যাহার) এবং পরে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই সঙ্গে পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলীকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পাশাপাশি সেখানের সব পুলিশ সদস্যকে একযোগে প্রত্যাহার করা হয়। পরে ওসি প্রদীপ, পরিদর্শক লিয়াকতসহ একে একে ১৪ জনকে গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। নেয়া হয় রিমান্ডে। ১৪ আসামির মধ্যে ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও কনস্টেবল রুবেল শর্মা ছাড়া অন্য ১২ আসামি তদন্ত সংস্থা র‌্যাবের মাধ্যমে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর আলোচনায় ছিলেন তৎকালীন কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন। ওই সময় এসপি মাসুদ হোসেনের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার দাবি ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে। সিনহা হত্যা মামলায় এসপি মাসুদকে আসামি করতে আদালতে আবেদনও করেছিলেন তার বোন, তবে বিচারক তা খারিজ করে দেন। ইতোমধ্যেই এসপি মাসুদকে কক্সবাজার থেকে প্রত্যাহার করে রাজশাহীতে পাঠানো হয়েছে।

সিনহা হত্যাকাণ্ডের শুরুতেই ঘটনাটি বিভিন্ন দিকে মোড় নিতে থাকে। প্রথমেই ওসি প্রদীপ সিনহার ওপর দোষ চাপাচ্ছিলেন। তার দাবি ছিল, সিনহাকে চেকপোস্টে থামিয়ে তল্লাশি করতে চাইলে সিনহা পিস্তল বের করলে আত্মরক্ষার্থে ঘটনাস্থলে থাকা পরিদর্শক লিয়াকত গুলি চালান। এতে সিনহা গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটে পড়েন। পরে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক সিনহাকে মৃত ঘোষণা করেন। কিন্তু ওসি প্রদীপের এ দাবি ধোপে ঠেকেনি। র‌্যাবের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

মামলায় বরখাস্তকৃত ওসি প্রদীপসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে গত ১৩ ডিসেম্বর কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তামান্না ফারাহর আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা র‌্যাব। জানা গেছে, তদন্তে এখন পর্যন্ত ১৫ জনের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়েছে র‌্যাব। এর মধ্যে ১৪ জন জেলহাজতে আছেন। তারা হলেন- টেকনাফ থানার বরখাস্তকৃত ওসি প্রদীপ কুমার, বাহারছড়া ক্যাম্পের বরখাস্তকৃত পরিদর্শক লিয়াকত আলী, এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, টেকনাফ থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্য ছাড়াও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন-এপিবিএনের তিন সদস্য। এর মধ্যে টেকনাফ থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) সাগর দে পলাতক। বাকি তিনজন স্থানীয়। মামলাটির আইনি কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

ইউএনও ওয়াহিদার ওপর বর্বর হামলা
সিনহা হত্যাকাণ্ডে দেশে তোলপাড় চলার মধ্যেই ২ সেপ্টেম্বর রাতে ঘটে আরেকটি ঘটনা। সেই রাতে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে ইউএনওর সরকারি বাসভবনে হামলা চালানো হয়। সরকারি বাসভবনে ঢুকে ইউএনও ওয়াহিদা খানম ও তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ওমর আলী শেখকে নির্মমভাবে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে জখম করা হয়।

হামলার ঘটনায় ইউএনও ওয়াহিদা খানমের বড়ভাই শেখ ফরিদ উদ্দীন বাদী হয়ে গত ৩ সেপ্টেম্বর রাতে ঘোড়াঘাট থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় ইউএনও অফিসের বরখাস্তকৃত কর্মচারী (মালি) রবিউল ইসলামসহ ৫ জনকে আসামি করা হয়। মামলায় অন্য ৪ আসামি হলেন- ঘোড়াঘাট পৌর যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা আসাদুল ইসলাম, রংমিস্ত্রি নবীরুল ইসলাম, সান্টু কুমার দাস ও ইউএনওর বাসভবনের নৈশ্যপ্রহরী নাদিম হোসেন পলাশ।

ঘটনার প্রথমেই চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয় হামলার কারণ ও উদ্দেশ্য নিয়ে। একপর্যায়ে অভিযোগ ওঠে এ ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় যুবলীগের নেতাকর্মী জড়িত। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যুবলীগের তিনজনকে গ্রেফতার করে। তারা হলেন- ঘোড়াঘাট উপজেলার আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম ও উপজেলা যুবলীগের সদস্য আসাদুল ইসলাম এবং ঘোড়াঘাট সিংড়া ইউনিয়ন যুবলীগের নেতা মাসুদ রানা। এ ঘটনায় গ্রেফতার তিনজনকে দল থেকে বহিষ্কার করে যুবলীগ।

ঘটনার পরপরই তদন্তে নামে র‌্যাব ও পুলিশের যৌথ দল। একে একে ইউএনওর দুই গাড়িচালক, বাসভবনের নৈশপ্রহরীকে গ্রেফতার করা হয়। প্রত্যেককেই রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে ওঠে আসে ইউএনও ওয়াহিদার অফিসের বরখাস্তকৃত কর্মচারী (মালি) রবিউল ইসলামের নাম। গ্রেফতার করা হয় তাকে। দুই দফায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় রবিউল। এরপরই ইউএনও ওয়াহিদা খানম ও তার বাবা ওমর আলী শেখের ওপর হামলার কারণ বেরিয়ে আসে। সে একাই এ হামলা চালায় বলে আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়। হামলার ঘটনার ঠিক ২ মাসের মাথায় গত ২০ সেপ্টেম্বর একমাত্র আসামি করে তার বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেয়া হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দিনাজপুর ডিবি পুলিশের ওসি ইমাম জাফর জানান, ফরেনসিক রিপোর্ট ও নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আসামি রবিউল ইসলামকে একমাত্র আসামি করে তার বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। অন্য ৪ আসামির বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় তাদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়ার সুপারিশ করা হয় চার্জশিটে।

এদিকে হামলায় গুরুতর আহত ইউএনওকে হেলিকপ্টারে ঢাকায় আনা হয়। দীর্ঘদিন ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে গত ১ অক্টোবর সুস্থ হন ইউএনও।

ফতুল্লায় মসজিদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড
ইউএনওর ওপর হামলার ঘটনার মধ্যেই ৪ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার তল্লায় বায়তুস সালাত জামে মসজিদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মসজিদের পাশের তিতাস গ্যাসের পাইপলাইন থেকে গ্যাস নিঃসরণের ফলে সংঘটিত বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে ইমাম, মোয়াজ্জিন ও শিশুসহ অন্তত ৩১ জন মুসল্লি পুড়ে প্রাণ হারান।গ্যাসের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণের ঘটনায় গ্রেফতার তিতাসের ৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করে।

সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূকে গণধর্ষণ
তল্লার মসজিদে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় লাশের মিছিলের রেশ কাটিয়ে উঠার আগেই ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে এক গৃহবধূ গণধর্ষণের শিকার হন। ওই গৃহবধূ তার স্বামীকে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন। ওই সময় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী গৃহবধূকে জোর করে ছাত্রাবাসে তুলে নিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। এ সময় গৃহবধূর স্বামীকে কলেজের সামনে বেঁধে রাখা হয়। এরপর পুলিশ নির্যাতিতা নারীকে উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করলে ওসিসিতে তিন দিন চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে যান তিনি।

এ ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়। গোটা দেশে তীব্র প্রতিবাদে নেমে পড়েন শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণী, শিক্ষক, বিভিন্ন পেশাজীবী, রাজনীতিবিদসহ সাধারণ মানুষ। ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সমাবেশ শুরু হয়। এর মধ্যেই ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।

এ ঘটনায় ভিকটিমের স্বামী বাদী হয়ে ওই রাতেই শাহপরান থানায় মামলা করেন। মামলায় ছাত্রলীগের ছয় নেতাকর্মীসহ অজ্ঞাত আরও তিনজনকে আসামি করা হয়। মামলায় অভিযুক্তরা হলেন- এমসি কলেজ ছাত্রলীগ কর্মী সাইফুর রহমান, কলেজের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, মাহফুজুর রহমান মাছুম, অর্জুন লস্কর, বহিরাগত ছাত্রলীগ কর্মী রবিউল এবং তারেক আহমদ। মামলার অপর তিন আসামি অজ্ঞাত।

এ ঘটনার পর সিলেটসহ সারা দেশে তোলপাড় শুরু হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আসামিদের ধরতে বিভিন্ন স্থানে অভিযানে চালায়। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব-৯) ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকায় চারজনকে গ্রেফতার করে। এছাড়া সিলেট জেলা পুলিশ দুইজনকে, সুনামগগঞ্জ ও হবিগঞ্জ পুলিশ দুইজনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর আট আসামিকে পর্যায়ক্রমে পাঁচদিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। রিমান্ড শেষে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয় তারা। জবানবন্দিতে প্রধান আসামি সাইফুরসহ তারেক, রনি ও অর্জুন ধর্ষণের কথা স্বীকার করে। রবিউল ও মাহফুজুর ধর্ষণে সহায়তা করার কথা স্বীকার করে। সন্দেহভাজন আসামি মিসবাউর রাজন ও আইনুলও জবানবন্দি দেয়। এছাড়া গ্রেফতার ৬ আসামির ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয় ১ অক্টোবর। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে তাদের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এরপর ২৯ নভেম্বর আসামিদের ডিএনএ রিপোর্ট হাতে পান তদন্ত কর্মকর্তা। ৪৯ জন সাক্ষীর জবানবন্দি, ঘটনাস্থলে পাওয়া আলামত, আসামিদের জবানবন্দি বিচার-বিশ্লেষণ করে ঘটনার ৯৮ দিনের মাথায় মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য।

এদিকে এ ঘটনা তদন্তে গত ৩০ সেপ্টেম্বর এক সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। তদন্তে চার শিক্ষার্থীর ধর্ষণকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় তাদের ছাত্রত্ব সাময়িকভাবে বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় সিন্ডিকেট। এরা হল- বিএসএস ডিগ্রি পাস কোর্সের ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের অনিয়মিত ছাত্র সাইফুর রহমান (২৮), ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ইংরেজি মাস্টার্স ফাইনাল বর্ষের নিয়মিত শিক্ষার্থী শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি (২৫), বিএসএস ডিগ্রি পাস কোর্সের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের নিয়মিত শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম (২৫) এবং ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্স ফাইনাল বর্ষের নিয়মিত শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমান (২৫)।

বেগমগঞ্জে গৃহবধূকে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন ও ভিডিও ভাইরাল
এমসি কলেজের গণধর্ষণকাণ্ডে বিক্ষোভ আর প্রতিবাদে সারা দেশ যখন উত্তাল- এর মধ্যেই ৪ অক্টোবর ঘটে আরেকটি ঘটনা। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক গৃহবধূকে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের ৩২ দিন আগে ধারণকৃত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে দেশব্যাপী ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়।

পরে জানা যায়, ২ সেপ্টেম্বর রাত ৯টায় একলাসপুরের কুখ্যাত দেলোয়ার বাহিনী জয়কৃষ্ণপুর গ্রামের গৃহবধূর (২৮) বাড়িতে হামলা করে তার স্বামীকে ঘরের বাহিরে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখে। এ সময় তাকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করে এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল করে। এ ব্যাপারে ওই নারী ৪ অক্টোবর ৯ জনের নাম উল্লেখ করে বেগমগঞ্জ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন।

চাঞ্চল্যকর গৃহবধূ নির্যাতন ও ধর্ষণ মামলা দুটি তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর পিবিআই চট্টগ্রাম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ইকবাল ও নোয়াখালী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী তদারকি করেন। পরবর্তীতে ধর্ষণ মামলাটি পুলিশ পরিদর্শক মো. সিরাজুল মোস্তফা ও নির্যাতন মামলাটি পুলিশ পরিদর্শক মামুনুর রশিদ পাটোয়ারীকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়।

ধর্ষণ মামলার দুই আসামি ও নির্যাতন মামলায় ওই দুজনসহ ১০ আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযুক্ত আসামিরা হল- মামা বাহিনীর প্রধান দেলোয়ার হোসেন দেলু (২৬), জামাল উদ্দিন প্রকাশ প্রবাসী জামাল (৫২), নূর হোসেন বাদল (২২), আব্দুর রহিম (২০), মোহম্মদ আলী প্রকাশ আবুল কালাম (২৩), শামসুদ্দিন সুমন প্রকাশ কন্ট্রাক্টর সুমন (৩২), ইস্রাফিল হোসেন মিয়া (২১), মাইন উদ্দিন সাজু (২১), নূর হোসেন রাসেল (২৯), আনোয়ার হোসেন সোহাগ (২৪), আবদুর রব চৌধুরী প্রকাশ লম্বা চৌধুরী (৫০), মোস্তাফিজুর রহমান প্রকাশ আরিফ (১৯), মিজানুর রহমান প্রকাশ তারেক (২০), মোয়াজ্জেম হোসেন সোহাগ প্রকাশ সোহাগ মেম্বার (৪৫)। এদের মধ্যে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে আট আসামি। এখনও পর্যন্ত পলাতক রয়েছে চার আসামি। তারা হল- জামাল উদ্দিন, আবদুর রব চৌধুরী, মোস্তাফিজুর রহমান আরিফ ও মিজানুর রহমান তারেক।

বেগমগঞ্জে গৃহবধূকে ধর্ষণচেষ্টা ও বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার দুই মামলায় প্রধান আসামি দেলোয়ার হোসেন প্রকাশ দেলুসহ ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে গত ১৫ ডিসেম্বর আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। চার্জশিটে গ্রেফতার দুই আসামি রহমত উল্যা ও মাইন উদ্দিন শাহেদকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

চাঞ্চল্যকর এই দুই ঘটনাকে ঘিরে দেশব্যাপী তীব্র প্রতিবাদ, আন্দোলন আর ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের দাবি ওঠে। পরে ১৩ অক্টোবর ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করা হয়। পরে মুজিববর্ষ উপলক্ষে জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশনে আইনটি পাস হয়।

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ইস্যু
এরপর বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট ঘটনা ঘটলেও ১৩ নভেম্বর আবার একটি ইস্যু নিয়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা আর বিক্ষোভ শুরু হয়। সম্প্রতি ঢাকায় দুটি পৃথক সমাবেশ করে হেফাজতের নেতা মামুনুল হক ও ফয়জুল করিম চরমোনাই পীর ধোলাইপাড়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মাণাধীন ভাস্কর্যকে মূর্তি আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশে যে কোনো ধরনের ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন। তাদের বক্তব্যের পরই রাজনীতি অঙ্গনসহ সারা দেশে আন্দোলন ও প্রতিবাদ শুরু হয়। বর্তমানে কিছুটা শান্ত থাকলেও বিষয়টি একেবারেই থেমে যায়নি। সূত্র: যুগান্তর

বিজ্ঞাপন

এ জাতীয় আরো খবর