1. [email protected] : admi2017 :
  2. [email protected] : Daily Khabor : Daily Khabor
  3. [email protected] : rubel :
  4. [email protected] : shaker :
  5. [email protected] : shamim :
বুধবার, ০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ১২:০১ অপরাহ্ন

‘অবৈধ’ টাকায় বৈধ বৈভব

ডেইলি খবর নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ২৪৫ বার পড়া হয়েছে

ব্যবসার কথা বলে দেশের ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণ তুলে অবৈধভাবে নিয়ে গেছেন কানাডায়। টরন্টোতে করেছেন তিনটি বাড়ি, সঙ্গে একটি রেস্তোরাঁ। জনৈক ব্যবসায়ীর এই ‘কীর্তি’ নিয়ে বড়সড় খবর ছেপেছে বাংলাদেশের একাধিক গণমাধ্যম। আরো অনেক ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ কিংবা সরকারি কর্মচারী—কার কয়টা বাড়ি, কয়টা রেস্তোরাঁ রয়েছে টরন্টোর ‘বেগমপাড়ায়’ এবং সেসব কতটা আলিশান—এসব তথ্যের সব গণমাধ্যমে না এলেও যথেষ্ট ‘ভাইরাল’ হয়েছে ফেসবুক-ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। টরন্টোর সচেতন বাংলাদেশিরা এসবের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে বিভিন্ন পরিসরে ‘নাগরিক আন্দোলন’ও করেছেন।

স্বয়ং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনও সম্প্রতি কথা বলেছেন টরন্টোর ‘বাড়িওয়ালাদের’ নিয়ে। তাঁর ভাষ্য মতে, কমপক্ষে ২৮ জন বাংলাদেশির তথ্য তাঁর কাছে আছে, যাঁরা ইনভেস্টমেন্ট কোটায় কানাডায় বাড়ি-গাড়ি করেছেন! এঁদের মধ্যে কতজন সরকারি কর্মকর্তা, কতজন ব্যবসায়ী; রাজনীতিবিদই বা কতজন—সে তথ্যও পেয়েছেন তিনি। এই খবরে আরো গরম এখন ফেসবুক-ইউটিউব। টরন্টোর ‘বেগমপাড়া’ এখন এতটাই পরিচিত নাম, যেন ঢাকার কোনো মহল্লা!

দেশের টাকা পাচার হয়ে যাওয়াটা মেনে নেওয়া যেকোনো সচেতন বাংলাদেশির পক্ষেই কঠিন! টরন্টোর বাংলাদেশিরা এ নিয়ে কী ভাবছেন জানতে চাইলে বিষয়টি নিয়ে শুরু থেকেই সোচ্চার টরোন্টবাসী ও সাংবাদিক শওগাত আলী সাগর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি বাংলাদেশ ও কানাডা সরকারের নজরে আনার চেষ্টা করেছি। বলা যায়, এক ধরনের ‘সামাজিক আন্দোলন’ গড়ে তুলেছি। দেরিতে হলেও বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারের নজরে এসেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও এ নিয়ে কথা বলেছেন। প্রাথমিক তদন্তে যে ২৮ জনের নাম এসেছে, তাঁদের নিয়ে সরকারের পরবর্তী কার্যক্রম এখন দেখার বিষয়।’

কানাডার আইনে কী এসব সম্পদ অবৈধ : এসব বাড়িওয়ালার কী হবে বা কী হতে পারে? কানাডা সরকার কী এঁদের সব তথ্য তুলে দেবে বাংলাদেশ সরকারের হাতে? নাকি বাড়ি-সম্পদ অধিগ্রহণ করে নেবে ‘অবৈধ’ সাব্যস্ত করে? বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব প্রশ্নের সহজ উত্তর হচ্ছে—কানাডায় অবৈধ টাকায় বাড়ি করা এক ধরনের অসম্ভব ব্যাপার। যেকোনো উপায়েই হোক, টাকা বৈধ করেই তাঁদের বাড়ি কিনতে হয়েছে। অর্থাৎ কানাডা সরকার যথাযথ কর পেয়েছে এই অর্থের ওপর। আইনি যত বিষয় আছে, সব মেনেই একজন নাগরিক এখানে বাড়ি কিনতে পারেন। সে ক্ষেত্রে দেশের ‘কালো টাকা’ যে পদ্ধতিতেই হোক কানাডায় ‘সাদা’ হয়েই আবাসন কম্পানির অ্যাকাউন্টে গেছে।

শওগাত আলী সাগর বলেন, গুঞ্জন আছে যে এই শ্রেণির বেশির ভাগ লোকই বাংলাদেশ থেকে টাকা প্রথমে পাচার করে অন্য দেশ, মূলত দুবাই বা সিঙ্গাপুরে নিয়ে রাখেন। এরপর সেই দেশে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলেন। এরপর তাঁরা একই নামে ব্যবসার লাইসেন্স নেন কানাডায়। এভাবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটি হয়ে ওঠে বহুদেশীয়। ব্যবসায়িক কারণ দেখিয়েই তাঁরা আগের দেশের ব্যবসায়িক ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা সরিয়ে নেন কানাডার ব্যবসায়িক হিসাবে। এ ক্ষেত্রে যথাযথ কর দেওয়া হয় কানাডা সরকারের নিয়ম অনুসারে। বড় অঙ্কের টাকা স্থানান্তরে এই পদ্ধতির অনুসরণই হয় বেশি। কানাডার আইনে এটা আর ‘মানি লন্ডারিং’ নয়!

তবে কানাডায় ‘মানি লন্ডারিং’ যে হয় না তা নয়! তবে সে সবই রয়েছে সরকারের নজরে। অর্থপাচার এবং অবৈধ লেনদেন বন্ধ করতে কানাডায় কাজ করে ‘ফিন্যানশিয়াল ট্রানজেকশনস অ্যান্ড রিপোর্ট অ্যানালিসিস সেন্টার অব কানাডা, সংক্ষেপে ফিনট্রাক।’ সম্প্রতি গোয়েন্দা সংস্থা ‘ফিনট্র্যাক’-এর জালে উঠে এসেছে প্রায় এক হাজার ৬০০ অর্থপাচারকারীর নাম। এর মধ্যে কোনো বাংলাদেশি আছে কি না তা এখনো জানা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী কাজ এখন রয়েল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশের (আরসিএমপি)। দোষী সাব্যস্ত হলে বেশ বড় সাজাই পেতে হবে এঁদের, তা নিশ্চিত!

কানাডায় কত প্রবাসীর বাড়ি আছে : পুরো কানাডায় কমবেশি লাখখানেক বাংলাদেশি থাকেন। এঁদের বেশির ভাগই উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবী, কানাডায় গেছেন অভিবাসী হয়ে। ‘স্কিল মাইগ্রেশন’ বা পরবর্তী সময়ে ‘এক্সপ্রেস অ্যান্ট্রি’ ক্যাটাগরিতে। কেউ কেউ উচ্চ শিক্ষার্থে এসে পরে এখানেই চাকরি পেয়ে পর্যায়ক্রমে ‘পারমান্যান্ট রেসিডেন্সি’ ও নাগরিকত্ব পেয়েছেন। এই শ্রেণির অর্ধেকেরও বেশি হয়তো এরই মধ্যে কানাডায় বাড়ি কিনতে পেরেছেন। তবে এ জন্য তাঁদের চাকরি করে পরিবারের নিয়মিত খরচ চালিয়ে তার পর নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা জমাতে হয়েছে ‘ডাউনপেমেন্টের’ জন্য।

কানাডায় সাধারণ মানুষের পক্ষে বাড়ি কেনা কি খুব কঠিন? এমন প্রশ্নের জবাবে ক্যালগেরির মর্টগেজ বিশেষজ্ঞ এবং শীর্ষস্থানীয় একটি ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা সাইনি রমন জানান, বিষয়টা কঠিন, আবার সহজ। কঠিন এ কারণে যে, ব্যাংক দেখবে আপনার ‘মর্টগেজ’ শোধ করার সক্ষমতা কতটুকু। এ ক্ষেত্রে কানাডায় চাকরির ইতিহাসই প্রথম বিবেচনায় আনা হয়। যখন ‘মর্টগেজের’ জন্য কেউ আবেদন করবেন, তখন তাঁর অবশ্যই চাকরি থাকতে হবে। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে দেখা হয়, কানাডায় ব্যবসায়িক ইতিহাস। আগের একাধিক বছরের করের কাগজপত্রও যাচাই করা হয়। এসব কিছু ঠিক না থাকলে বাড়ি কেনা খুবই কঠিন। কানাডার নাগরিক বা পারমান্যান্ট রেসিডেন্ট হওয়াটাও জরুরি। আবার সহজও একই কারণে। ওপরের বিষয়গুলো ঠিকঠাক থাকলে মাত্র ৫ শতাংশ ডিপোজিট দিয়েও বাড়ি কেনা সম্ভব, যদি ভালো ‘ক্রেডিট রেকর্ড’ এবং বাড়ির মর্টগেজ পরিশোধের সাধ্য থাকে। বিত্তবানদের গ্রহণ করতে কারো আপত্তি নেই, থাকার কারণও নেই!

গোলমালের শুরু যেখানে : গোলমালের শুরু ২০০৭-২০০৮ সালের দিকে, যখন বাংলাদেশে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু হয়। কাকতালীয়ভাবে প্রায় একই সময় ২০০৮ সালে ‘ইনভেস্টমেন্ট’ (বিনিয়োগ) ক্যাটাগরির ভিসা চালু করে কানাডা সরকার। বিভিন্ন দেশের বিত্তশালীরা টাকা বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে কানাডায় আসা শুরু করেন। ২০১৪ সাল পর্যন্ত চলে এই ধারা। ২০১৪ সালে সরকার এই ক্যাটাগরি বন্ধ করে দিলে শুধু টাকার জোরে কানাডায় আসার পথ বন্ধ হয়ে যায়। অনেকে বৈধ টাকা বিনিয়োগ করলেও প্রায় শ দুয়েক বাংলাদেশি অবৈধ টাকার জোরে সুযোগটি নিয়েছেন বলে আলোচনা আছে টরোন্ট এলাকায়। এর সঠিক পরিসংখ্যান কারো পক্ষেই দেওয়া সম্ভব নয়, বিশেষ করে কানাডায়। কারণ এখানে ব্যক্তির তথ্য নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা খুবই শক্তিশালী।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রাথমিক সংখ্যা হিসেবে যদিও ২৮ জনের কথা বলেছেন, তবে এটা কানাডা সরকারের দেওয়া কোনো তথ্য যে নয় তা তিনি নিজেই বলেছেন প্রকারান্তরে। ২০১৪ সালে ‘ইনভেস্টর’ ক্যাটাগরি বন্ধ হওয়ার পরও অবৈধ বিত্তবান শ্রেণির কানাডায় পাড়ি জমানো চলছে অল্প-বিস্তর। এসব ক্ষেত্রে তাঁদের নির্ভর করতে হচ্ছে স্ত্রী-সন্তানের কানাডার নাগরিকত্ব বা ‘পারমান্যান্ট রেসিডেন্সির’ ওপর। এ ছাড়া আর কোনো পথ আপাতত খোলা নেই!

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর তথ্যের সূত্রও অনানুষ্ঠানিক : ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে কানাডায় বাড়ি কেনা নিয়ে যে তথ্য দিয়েছেন তা অনানুষ্ঠানিক সূত্র থেকে পাওয়া। পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরে সাংবাদিকদের বলেন, এটি কোনো ধরনের ‘অফিসিয়াল’ তথ্য নয়। তবে এ তালিকায় সাবেক সচিবসহ সরকারি কর্মকর্তাদের নাম বেশি থাকার বিষয়টি তাঁকে অবাক করেছে। তিনি জানান, বিষয়টি তদন্ত করার দায়িত্ব পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নয়। তবে উপযুক্ত সংস্থা তদন্ত করলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিয়ম অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

এ জাতীয় আরো খবর