1. [email protected] : admi2017 :
  2. [email protected] : Daily Khabor : Daily Khabor
  3. [email protected] : rubel :
  4. [email protected] : shaker :
  5. [email protected] : shamim :
বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ০৭:৪২ অপরাহ্ন

আগাম চাহিদায় নকল ওষুধ তৈরি

ডেইলি খবর নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১
  • ৩০৩ বার পড়া হয়েছে

ওষুধ রোগাক্রান্ত মানুষের জীবন রক্ষা করে। আবার ওষুধই মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নকল বা ভেজাল ওষুধের কারণে এখন জীবন-মৃত্যুর যেন রশি টানাটানি শুরু হয়েছে। সাধারণ মানুষের সুস্বাস্থ্য ও জীবন রক্ষা নিয়ে দেখা দিয়েছে মহা শঙ্কা। নকল বা ভেজাল ওষুধ সেবনের ফলে রোগ ভালো হওয়ার পরিবর্তে আরও অসুস্থতা বাড়ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর মাঝেমধ্যে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করলেও বন্ধ হচ্ছে না নকল-ভেজাল ওষুধের কারবার।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনেকটা বৈধ কোম্পানির মতো ‘চাহিদাপত্র’ দিয়ে উৎপাদন করানো হচ্ছে এসব নকল-ভেজাল ওষুধ। বিশেষ করে যখন কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ে বা যে ওষুধের চাহিদা বাড়ে তখনই বেশি সোচ্চার হয়ে উঠছে মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করা ভয়ঙ্কর এই নকল ওষুধ চক্র। ব্যাপক মুনাফার লোভে এক শ্রেণির ফার্মেসি এসব নকল ওষুধ বিক্রিতে সহায়তা করছে, যার সিংহভাগই ঘটছে মফস্বল শহর বা গ্রামাঞ্চলে। সম্প্রতি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ, এলিট ফোর্স র‌্যাব এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের নকল-ভেজাল ওষুধবিরোধী বেশ কয়েকটি অভিযানের পর জানা গেছে আরও নানা তথ্য।

পুলিশ ও র‌্যাবের একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, পুরান ঢাকার টিপু সুলতান রোডে বেশ কিছু কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব কারখানায় যে-কেউ গেলেই তাকে ওষুধের ডাইস বানিয়ে দেওয়া হয়। তবে সাম্প্রতিক অভিযানের পর তারা খুব কৌশলী হয়েছে। অন্যদিকে গোয়েন্দারাও ভালোমতো নজর রেখেছেন। একইভাবে রাজধানীর ফকিরাপুল-মতিঝিল এলাকায় তৈরি হয় নকল-ভেজাল ওষুধের প্যাকেট ও ফয়েল পেপার। এ রকম কিছু প্রিন্টিং প্রেসের দিকেও নজরদারি করা হচ্ছে।

কর্মকর্তারা জানান, চাহিদাপত্র অনুসারে নকল বা ভেজাল ওষুধ উৎপাদনের জন্য কয়েকটি গ্রুপে কাজ সম্পন্ন হয়ে থাকে। এর মধ্যে একটি গ্রুপ কাঁচামাল সংগ্রহ করে থাকে। আরেকটি গ্রুপ ডাইস তৈরি করে, আরেক গ্রুপ বানায় প্যাকেট এবং অন্য একটি গ্রুপের কাজ ফয়েল পেপার তৈরি করা। এভাবে হুবহু নকল ওষুধ তৈরি সম্পন্ন হলে চাহিদাপত্র অনুযায়ী সেগুলো গ্রহণ করে মূল হোতা। এরপর সেগুলো নিজস্ব বা বিভিন্ন কোম্পানি একশ্রেণির প্রতিনিধির (রিপ্রেজেন্টেটিভ) মাধ্যমে আসল ওষুধের আড়ালে ছড়িয়ে দেয় গ্রামাঞ্চলের ফার্মেসিগুলোতে।

প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ইউজিসি অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ওষুধসহ অনেক কিছুতেই দীর্ঘদিন ধরে নকল-ভেজাল কারবার হয়ে আসছে। তবে ওষুধ নকল বা ভেজাল হলে সেটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক এবং ভয়ঙ্কর বিষয়ও বটে। কারণ নকল-ভেজাল ওষুধে উপকার তো হয়ই না বরং ভয়ঙ্কর ক্ষতি হয়। নকল বা ভেজাল ওষুধ সেবন করলে পরিপাকতন্ত্রের জটিলতা, লিভার ক্যানসার, কিডনি ড্যামেজ, হার্ট, ফুসফুসসহ সর্বাঙ্গেই ভয়াবহ সমস্যা দেখা দেয়, যে কারণে মানুষের প্রাণহানি বা অঙ্গহানির মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থান করা এই মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মোবাইল ফোনে আরও বলেন, নকল-ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে সবসময়ই একটা শক্ত অবস্থান থাকতে হবে। ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরকে এসব বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। পাশাপাশি জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে ওষুধ নকল বা ভেজালের প্রবণতা কমবে বলে আশা করা যায়।

বেশ কয়েকটি সফল অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. রাজীব আল মাসুদ বলেন, যখন কোনো ওষুধের চাহিদা বাড়ে, তখন সেই ওষুধই নকল করার জন্য তৎপরতা শুরু করে চক্রের সদস্যরা। নকল ওষুধের কারবার অনেকটা মানুষ হত্যার মতো বিষয়। গ্রামের অনেক ফার্মেসি ব্যবসায়ী মুনাফার লোভে সস্তামূল্যের নকল ওষুধ অসুস্থ বা সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করছে। এসব ওষুধে রোগ ভালো তো দূরের কথা, মানুষ জটিল রোগে আক্রান্তসহ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি জানান, সম্প্রতি ঢাকার সাভার, পিরোজপুর ও কুমিল্লায় মোট ছয়টি অভিযান চালানো হয়। এসব অভিযানে তিনটি চক্রের মোট ২০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ডিসি রাজীব আল মাসুদ আরও বলেন, নকল বা ভেজাল ওষুধ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আরও বিস্তর কাজ চলছে। সন্দেহজনক আরও একাধিক চক্রের কর্মকা- ও তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী এলিট ফোর্স র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু বলেন, ইতোমধ্যে ভেজাল, মানহীন বা অননুমোদিত ওষুধের বিরুদ্ধে কয়েকটি অভিযান চালিয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসামিকে জেল-জরিমানা করা হয়েছে। নিয়মিত মামলাও করা হয়েছে। তবু সিন্ডিকেটের তৎপরতা মাঝেমধ্যেই বাড়ছে।

তিনি বলেন, নকল ওষুধ কারবারি চক্রের বিরুদ্ধেও র‌্যাবের গোয়েন্দারা কাজ করছেন। জীবন রক্ষাকারী ওষুধের বিষয়ে র‌্যাব সবসময়ই সতর্ক আছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, নামসর্বস্ব কোম্পানি বা লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানে নকল বা ভেজাল ওষুধ বেশি উৎপাদন হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াটিও সহজ ও সাধারণ মানুষের সন্দেহের বাইরে থাকে। কেননা ওষুধ উৎপাদনের জন্য যেসব উপাদান বা সরঞ্জাম লাগে তার প্রায় পুরো ‘সেটআপ’ থাকে ওইসব প্রতিষ্ঠানে। ফলে সহজেই তারা নকল বা ভেজাল ওষুধ উৎপাদন করতে পারে। এসব কারখানায় নামিদামি কোম্পানির ব্র্যান্ড বা মোড়ক নকল করে বাজারজাত করা হয়ে থাকে নকল বা ভেজাল ওষুধ। বিশেষ করে যে ওষুধগুলোর বাজারমূল্য কিছুটা বেশি, সেগুলোকেই বেশি টার্গেট করা হয়। বাজারজাতের জন্য টার্গেট করা হয় গ্রামাঞ্চলের বাজার এবং সহজ-সরল মানুষকে। কেননা, এসব নকল ওষুধ আসল ব্র্যান্ডের ওষুধের চেয়ে অনেক কমদামে অসাধু ফার্মেসি মালিকরা বিক্রি করে থাকে। দাম কম হওয়ায় সাধারণ মানুষও কিনছে হরহামেশাই।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নকল ওষুধ তৈরির কারখানা হিসেবে ইদানীং বেশি ব্যবহৃত হয় নামসর্বস্ব ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ও ইউনানি ওষুধের প্রতিষ্ঠান, যাদের অনেকেরই ওষুধ উৎপাদন বা বাজারজাতকরণের বৈধ লাইসেন্সও রয়েছে। আবার অনিয়মসহ নানা কারণে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল হওয়া এমন কিছু প্রতিষ্ঠানও নকল-ভেজাল ওষুধের কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। গত সোমবারও কুমিল্লায় এমন একটি অভিযান পরিচালনা করেছে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর।

এ প্রসঙ্গে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের পরিচালক মো. আইয়ুব হোসেন বলেন, ‘অনিয়মের কারণে কুমিল্লার ওই ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ‘লাইসেন্স সাসপেন্ড’ করা হয়েছিল। গোপন সংবাদে আমরা জানতে পারি, সেখানে আবারও ভেজাল বা অবৈধভাবে ওষুধ উৎপাদন করা হচ্ছে। এর আগে গত সোমবার অভিযান চালিয়ে ঘটনার সত্যতা পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

আইয়ুব হোসেন বলেন, নকল বা ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে নিয়মিতভাবে মনিটরিং করার পাশাপাশি মাঝেমধ্যেই বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়, যেখানে অনেক অভিযানে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের স্বয়ং মহাপরিচালকও সশরীরে নেতৃত্ব দেন। অর্থাৎ আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নকল-ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে কাজ করছি।

গত ৪ সেপ্টেম্বর ওষুধ নকলকারী চক্রের সাতজনকে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) লালবাগ বিভাগ। রাজধানীর কাজলা, আরামবাগ ও মিটফোর্ড এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতারের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ নকল ওষুধ, ওষুধ তৈরির সরঞ্জাম ও ওষুধের খালি বাক্স উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ক্যানসার ও করোনাসহ গুরুতর অনেক রোগেরই ওষুধ রয়েছে। পুলিশের ধারণা, জড়িতরা ধরা না পড়লে এ ওষুধগুলোও রোগীর উদ্বিগ্ন স্বজনরা কিনে নিত এবং তাতে বহু রোগীর মৃত্যু হতে পারত।

নকল ও ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে গত দুই সপ্তাহেই ডিবি পুলিশের লালবাগ বিভাগের অন্তত তিনটি অভিযান পরিচালিত হয়েছে রাজধানীর মিটফোর্ডসহ বিভিন্ন এলাকায়। এ সময় বিপুল নকল ওষুধসহ জড়িত চক্রের বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই চক্রটি করোনাকালে চাহিদা অনুযায়ী নকল ওষুধ তৈরি করে সরবরাহ করে যাচ্ছিল।

এর আগে অন্তত দুই বছর ধরে নকল ওষুধ তৈরির গোপন কারবারে জড়িত মূল হোতা শফিকুল ইসলাম ওরফে আনিছ ও তার সহযোগী রবিউল ইসলামকে গত ২৪ এপ্রিল গ্রেফতার করা হয়। এ সময় জব্দ করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ নকল ওষুধ ও ওষুধ তৈরির সরঞ্জাম। পুলিশ জানায়, রাজশাহী নগরীর ভদ্রার পদ্মা আবাসিক এলাকার একটি বাড়িতে তৈরি হচ্ছিল নামিদামি কোম্পানির নকল ওষুধ। নিজেদের তৈরি করা এসব নকল ওষুধ রাজশাহী ছাড়াও তারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাজারজাত করছিল। এরকম আরও বেশ কিছু এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে নকল ওষুধ কারবারি চক্রের অনেক সদস্যকে গ্রেফতার করেছে।

বিজ্ঞাপন

এ জাতীয় আরো খবর