1. [email protected] : admi2017 :
  2. [email protected] : Daily Khabor : Daily Khabor
  3. [email protected] : rubel :
  4. [email protected] : shaker :
  5. [email protected] : shamim :
মঙ্গলবার, ০৪ অক্টোবর ২০২২, ০১:৪৬ অপরাহ্ন

আসামিরা জামিনে, চাকরিতে সহযোগীরা

ডেইলি খবর নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ২৬ মে, ২০২২
  • ৩৩ বার পড়া হয়েছে

তিন বছর ধরে ফাইলবন্দি রয়েছে ভোটার তালিকায় রোহিঙ্গাদের নাম নিবন্ধনের তদন্তকাজ। আসামিদের অনেকেই এখন জামিনে রয়েছে। আর এ কাজে সহযোগিতাকারী হিসেবে যেসব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম এসেছে তারা বহাল তবিয়তে রয়েছেন কর্মস্থলে। তিন বছর ধরে কচ্ছপ গতিতে চলছে এ তদন্ত। তদন্তকারী সংস্থা বলছে, নির্বাচন কমিশনের অসহযোগিতার কারণে তদন্তে ধীরগতি হয়েছে। কবে নাগাদ এর প্রতিবেদন দেওয়া যাবে তা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা।

এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সঠিক তদন্ত এবং এ অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে অন্য রোহিঙ্গারাও বাংলাদেশে ভোটার হতে উৎসাহী হবে, এতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়বে।

২০ মে থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেশব্যাপী ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ তালিকায় রোহিঙ্গা অন্তর্ভুক্তি ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে ইসি। রোহিঙ্গা নাগরিকদের ভোটার হতে কেউ সহযোগিতা করলে তাদের নামে মামলা দেওয়ার ‘হুঁশিয়ারি’ দিয়ে প্রশাসনের সব পর্যায়ে সম্প্রতি একটি চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি। তবে কতটা কার্যকর হবে এ হুঁশিয়ারি?

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিগত দিনে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী এ কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি নির্বাচন কমিশন। এমনকি তদন্তকারী সংস্থাকেও কোনো সহযোগিতা করেনি ইসি। ফলে গত তিন বছর ধরে ঝুলে আছে আগের তদন্তকাজ। আসামিরা অনেকেই জামিনে বের হয়েছে। ইসির অভিযুক্ত কর্মকর্তারা বহাল রয়েছে নিজ কর্মস্থলে। ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন মূল হোতারা।

২০১৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গাদের এনআইডি পাইয়ে দেওয়া চক্রের অনুসন্ধানে কক্সবাজার থেকে কাজ শুরু করে দুদক। টানা পাঁচ দিনের অনুসন্ধানে কক্সবাজার থেকে রোহিঙ্গা দালালসহ সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৬ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১১টায় জয়নাল আবেদীন, বিজয় দাস ও তার বোন সীমা দাসকে আটক করা হয়। পরে ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে এনআইডি জালিয়াতির ঘটনায় গ্রেফতার করা হয় চট্টগ্রাম নির্বাচন অফিসের আরেক কর্মচারী মোস্তফা ফারুককে। এ তিনজনকে গ্রেফতারের পর বেরিয়ে আসে জাল এনআইডি বানানোর পারিবারিক ব্যবসার চমকপ্রদ কাহিনি। যেখানে পুরো ঘটনার মধ্যমণি হয়ে কাজ করেন ডবলমুরিং থানা নির্বাচন অফিসের অফিস সহায়ক জয়নাল আবেদীন, পাঁচলাইশ নির্বাচন অফিসের সাবেক অফিস সহায়ক নাজিম ও চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী মোস্তফা ফারুক। এরও আগে ১৮ আগস্ট লাকি নামে এক নারী স্মার্ট কার্ড তুলতে জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে গেলে তার হাতে পুরনো এনআইডিতে ১৭ ডিজিটের নম্বর দেখে কর্মকর্তাদের সন্দেহ হয়। পরে জেরার মুখে লাকি নিজের প্রকৃত নাম জানান রমজান বিবি এবং ২০১৪ সালে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসার পর টেকনাফের মুচনী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ছিলেন বলে স্বীকার করেন। ওই রোহিঙ্গা নারী ভুয়া ঠিকানা দিয়ে তৈরি করিয়েছিলেন ওই জাল এনআইডি। অথচ ওই ভুয়া পরিচয়পত্রের তথ্যও নির্বাচন কমিশনের তথ্যভান্ডারে সংরক্ষিত আছে। এ ঘটনার পর রোহিঙ্গাদের ভোটার করা ও এনআইডি পাইয়ে দেওয়ার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজতে অভিযান শুরু করে দুদক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নির্বাচন কমিশন থেকেও একটি তদন্ত কমিটি করা হয়।

এরপর ২০১৯ সালের ২২ নভেম্বর এক নির্বাচন কর্মকর্তার বিষয়ে জানতে পারেন তদন্তকারী সংস্থা। ওই বছরের ১৮ নভেম্বর চট্টগ্রাম নগরের লাভ লেনের জেলা নির্বাচন কার্যালয় থেকে অফিস সহায়ক নাজিম উদ্দিনকে গ্রেফতার করা হয়। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে নাজিম উদ্দিন আবদুল লতিফ শেখের নাম জানান। আবদুল লতিফ ২০১৬ সালের দিকে নগরের পাঁচলাইশ থানা নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি পাবনা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের আরও এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নাম জবানবন্দিতে জানিয়েছিলেন নাজিম। এর আগে গ্রেফতার আরেক অফিস সহায়ক জয়নালসহ ২০১৬ সালে নির্বাচন অফিসের একটি সিন্ডিকেট রোহিঙ্গাদের এনআইডি পাইয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করে। এ সময় নাজিম পাঁচলাইশ নির্বাচন অফিসে কর্মরত ছিলেন। পাঁচলাইশ থানা নির্বাচন অফিসের তৎকালীন কর্মকর্তা আবদুল লতিফ শেখের ঘনিষ্ঠ হিসেবে দাপট ছিল নাজিমের। ২০১৭ সালে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র পাইয়ে দিতে জয়নাল ও নাজিম মিলে সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। এ সময় তাদের সহায়তা করেন এই আবদুল লতিফ শেখসহ কয়েকজন।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের (সিটিইউ) ডেপুটি কমিশনার ফারুক উল হক বলেন, নির্বাচন কমিশনের অসহযোগিতার কারণে তদন্তটা বিভিন্ন সময় আটকে ছিল। কারণ তদন্ত করতে গিয়ে আমরা যখন ইসির কিছু কর্মচারীর যোগসাজশ পেলাম তখন তাদের সম্পর্কে ইসির কাছে তথ্য চাইলে তারা তথ্য দিতে গড়িমসি করে। সর্বশেষ যেটা পাঠায় সেটা আবার ফটোকপি, যা আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়। সেখানে দিতে হবে অরিজিনাল কপি। এ তথ্য আদালতে পাঠানোর পরে আদালত সিদ্ধান্ত দিতে বেশ সময় নেন। এভাবে বিভিন্ন ইস্যুতে তদন্তে ধীরগতিতে অনেকদিন ঝুলে থাকে বিষয়টি।

তিনি বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে কোন কোন কর্মকর্তা জড়িত, কতগুলো সার্ভারে নাম ঢুকেছিলÑ এসব বিষয় নিয়ে ইসির কাছে একটা ডিটেইলস মতামত চাওয়া হয়েছিল। কারণ ইসির সার্ভারে তো এমনি এমনি নাম আপলোড হবে না। এসব তথ্য দিতে গড়িমসি করেছে ইসি। বিভিন্ন অজুহাতে ঘোরানো এবং তথ্য না দেওয়ার প্রবণতার কারণে কাজটি এখনও ঝুলে রয়েছে।

সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের পুলিশ পরিদর্শক সঞ্জয় সিনহা বলেন, ২০১৯ সালের শেষের দিকে আমরা ১৮ আসামিকে গ্রেফতার করি। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশনের অস্থায়ী ডাটা এন্ট্রি অপারেটর ছিল সাতজন এবং চারজন স্থায়ী। বাকিরা দালাল এবং এ চক্রের সহায়তাকারী। এরা এখন সবাই জামিনে আছে।

সঞ্জয় সিনহা বলেন, প্রথমে পেনালকোডের ৪০৬, ৪০২, ৪৬৭, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারায় জাল-জালিয়াতি মামলা রেকর্ড হয়েছিল। এরপর এর সঙ্গে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন, জাতীয় ভোটার তালিকা আইন, জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইনসহ তিনটি ধারা যুক্ত করা হয়। পেনালকোডের ধারা অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ক্ষমতার অপব্যবহার করে যদি কোনো অপরাধ করেন ওই অপরাধের তদন্ত করার দায়িত্ব দুর্নীতি দমন কমিশনের। পেনালকোডে যে মামলা রেকর্ড হয়েছে সেগুলো তদন্ত করছে দুদক, এটার রিপোর্ট তারা দেবে। এ ছাড়া বাকি তিনটি ধারা মামলা তদন্ত করে রিপোর্ট দেব আমরা। তবে কবে রিপোর্ট দিতে পারব তা এখনও বলতে পারছি না। কারণ আমরা নির্বাচন কমিশন থেকে অনেক তথ্য পাইনি।

নির্বাচন ব্যবস্থাপনা-১-এর যুগ্ম সচিব মো. নুরুজ্জামান তালুকদার বলেন, ওই সময়ে ইসিতে বিভাগীয়ভাবে কোনো অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ এসেছে কাউন্টার টেরোরিজম ও দুদক থেকে। তারা বিষয়টি তদন্ত করছে। যদি কর্মচারী শৃঙ্খলা আপিল বিধিমালা ২০২০ অনুযায়ী আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ আসত তা হলে আমরা অবশ্য ব্যবস্থা নিতে পারতাম।

কতজন কর্মকর্তা এর সঙ্গে জড়িত- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেটি আমার জানা নেই। তবে তারা কর্মস্থলে বহাল আছে। তদন্ত শেষে রিপোর্ট হাতে পেলে আমরা দেখব পুনরায় তদন্ত করার দরকার আছে কি না। এরপর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্তকারী সংস্থা এখনও আমাদের কিছু জানায়নি।

এ প্রসঙ্গে ইসির প্রশাসন অনু বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. কামাল উদ্দিন বিশ্বাস বলেন, আমাকে প্রধান করে ওই সময় আট সদস্যের একটা তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটিতে সরকারের আইসিটি ও অন্যান্য সংস্থার কর্মকর্তারাও সদস্য ছিলেন। সেই তদন্ত রিপোর্ট আমরা দেড় বছর আগে সচিব দফতরে জমা দিয়েছি। ইসি কমিটির প্রধান হিসেবে এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারব না।

তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে দুদকের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক (ডিডি) মাহমুদ হাসান বলেন, এ মামলার আগের তদন্তকারী কর্মকর্তারা বিভিন্ন জায়গায় বদলি হয়ে গেছেন। এখন নতুন কর্মকর্তারা এসেছেন। আমাদের তদন্তকাজ চলছে। দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ বলেন, একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্ভুল ও ভুয়া ভোটারবিহীন তালিকা অবশ্যই প্রয়োজন। রোহিঙ্গারা প্রভাবিত করে ভোটার তালিকায় নিজেদের নাম তুলেছে। বাংলাদেশে তাদের অবস্থান স্থায়ী করার জন্য এটা চলতে থাকলে অন্য রোহিঙ্গারাও এ দেশে ভোটার হতে উৎসাহী হবে। এটি রাষ্ট্রের জন্য হুমকি এবং ওই এলাকার বাসিন্দাদের জন্যও হুমকি। এসব কর্মকাণ্ডে যারা জড়িত তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা দরকার। এখন আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না, কারণ যারা এর সঙ্গে জড়িত তারা তো তদন্তে সহযোগিতা করবে না।

তিনি বলেন, এ এনআইডি দিয়ে যে রোহিঙ্গারা পাসপোর্ট করে বিদেশ যাচ্ছে, তারা সেখানে কোনো অপরাধ করলে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হবে। এ রাষ্ট্রের জন্য নিরাপত্তা হুমকি। তাই বিদেশে যাওয়ার আগে পাসপোর্ট করতে গেলে সেটি ভালোভাবে তদন্ত করার দরকার।

বিজ্ঞাপন

এ জাতীয় আরো খবর