1. [email protected] : admi2017 :
  2. [email protected] : Daily Khabor : Daily Khabor
  3. [email protected] : shaker :
  4. [email protected] : shamim :
বুধবার, ২১ এপ্রিল ২০২১, ০৭:৩৪ পূর্বাহ্ন

করোনাভাইরাস: জনস্বাস্থ্য কি মানবাধিকার?

ডেইলি খবর নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২০
  • ৪৪ বার পড়া হয়েছে

শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন: মানুষের যে মানবাধিকার তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে জীবনের অধিকার। সব ধর্ম ও দর্শনের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক আলোচনার বড় একটি অংশ আবর্তিত হয়েছে বুদ্ধিমান, সৃজনশীল, ও আধ্যাত্মিক প্রাণী মানুষের জীবনকে কেন্দ্র করে। আর মানুষের মসৃণ ও অর্থপূর্ণ জীবন নির্ভর করে তার শারীরিক স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। এই স্বাস্থ্য মানে দুই পায়ের ওপর ভর দিয়ে কোনোমতে জীবন পার করে দেওয়া নয় বা হাতড়ে হাতড়ে জীবন বহন করাও নয়! এই স্বাস্থ্য বলতে বোঝায় সুস্থ, স্বাভাবিক, নীরোগ ও ভারসাম্যপূর্ণ শরীর তথা শারীরিক স্বাস্থ্য ও আনন্দময়, হাসি-খুশি, সংবেদনশীল ও মানবিক বোধে উচ্চকিত মন তথা মানসিক স্বাস্থ্যকে। দুটির সমন্বয়ে আমরা যে শব্দবন্ধটি পাই, সেটিকে বলে ‘জনস্বাস্থ্য’।
দুই. জনস্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার এবং এর সঙ্গে জীবনের অধিকার অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আইন ও মানবাধিকারের ‘লেন্স’ দিয়ে দেখলে নিঃসন্দেহে এ কথা বলা যায় যে, জীবনের অধিকার ও জনস্বাস্থ্য পরস্পর-নির্ভরশীল ও একে অপরের পরিপূরক। কিন্তু বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রেই জীবনের অধিকারকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও জনস্বাস্থ্যকে কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) সৃষ্ট তাণ্ডবের সময়ে বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে আলোচিত বিষয়টি হচ্ছে- জনস্বাস্থ্যের জন্য বাজেটে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা উচিত ছিল, অনেক দেশেই সেটি করা হয়নি। ‘ওয়ার ইন্ডাস্ট্রি’ এবং অস্ত্র উৎপাদন ও ব্যবসার জন্য ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো দশকের পর দশক ধরে মিলিয়ন-বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে; অথচ জনস্বাস্থ্যে ভালো বরাদ্দ থাকলে জনমানুষ আরও ভালো চিকিৎসা পেতেন এবং বৈশ্বিকভাবে জনস্বাস্থ্যের অবস্থা হতো আরও সন্তোষজনক। সার্স, মার্স ও ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণের সময় থেকে বিশ্বের উন্নত ও ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যদি সচেতন হতো, বেশি করে অর্থ বরাদ্দ করত, নানা রকম ভাইরাসের সংক্রমণ রোধ ও তার ভ্যাকসিন আবিস্কারের জন্য; তাহলে করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে হয়তোবা সারাবিশ্বকে এমন করে নাজেহাল হতে হতো না।
উল্লেখ্য, সার্স ও করোনাভাইরাস ২০০২ সালের নভেম্বর মাসে প্রথম এশিয়াতে ধরা পড়ে এবং পরে ২৬টি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ৮ হাজার ব্যক্তি আক্রান্ত হন এবং ৭৭৪ জন মৃত্যুবরণ করেন। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্স ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে ২৭টি দেশে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উপাত্ত অনুযায়ী, আবির্ভাবের পর থেকে ২০২০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মার্স ও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন দুই হাজার ৫১৯ জন এবং মৃত্যু ঘটেছে ৮৭৭ জনের।
২০১৩-১৫ সাল পর্যন্ত পশ্চিম আফ্রিকার কয়েকটি দেশে ইবোলা ভাইরাস মহামারি আকারে দেখা দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ইবোলা ভাইরাসে ২৭ হাজার ৬৭৮ জন আক্রান্ত হন এবং ১১ হাজার ২৭৬ জন মৃত্যুবরণ করেন। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, সার্স, মার্স, করোনাভাইরাস ও ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণের পর বিশ্বের ক্ষমতাধর ও উন্নত রাষ্ট্রগুলো এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনেক বেশি মনোযোগ দেওয়া ও অর্থ বরাদ্দ করা উচিত ছিল এসব ভাইরাসের সংক্রমণ রোধ ও ভবিষ্যতের ভাইরাস মোকাবিলার জন্য। কিন্তু সেটি তো করা হয়ইনি, বরং ‘ওয়ার ইন্ডাস্ট্রি’ ও সামরিক খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে।
তিন. ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক গৃহীত সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণার ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেকটি ব্যক্তির জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার আছে।’ সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ২৫ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘প্রত্যেক ব্যক্তির অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও অন্যান্য সামাজিক সেবাসহ মানসম্পন্নভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে, যেটি তার ও তার পরিবারের সদস্যদের সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণের জন্য প্রয়োজন…।’
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহার লাভ… প্রত্যেক নাগরিকের… অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষত আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোন ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।’ ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ বলছে, ‘আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।’ জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতার কথা বলা হয়েছে সংবিধানের ১৮ (১) অনুচ্ছেদে, যে অনুচ্ছেদের ভাষ্য হচ্ছে- ‘জনগণের পুষ্টির স্তর-উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবেন…।’
দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে, জীবনের অধিকার ও জনস্বাস্থ্য অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত হলেও দেশে দেশে জীবনের অধিকারকে যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, জনস্বাস্থ্যকে সেই গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের কথাই ধরা যাক। বাংলাদেশের সংবিধানে ৩১ ও ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদকে স্থান দেওয়া হয়েছে ‘মৌলিক অধিকার’ শীর্ষক তৃতীয় ভাগে, যে ভাগে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ১৮টি পৌর ও নাগরিক অধিকার এবং এই অধিকারগুলো আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য। কিন্তু জনস্বাস্থ্য বিষয়ক ১৮ (১) অনুচ্ছেদকে স্থান দেওয়া হয়েছে ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’ শীর্ষক দ্বিতীয় ভাগে, যেটি আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য নয়। এর সঙ্গে যদি আমরা জনস্বাস্থ্যে বাজেট বরাদ্দের পরিমাণটি দেখে নিই, তাহলে আমরা বুঝতে পারব যে, জনস্বাস্থ্য কতটা অবহেলিত!
চার. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, প্রত্যেকটি রাষ্ট্রের তার জিডিপি বা মোট জাতীয় উৎপাদনের ৫ শতাংশ জনস্বাস্থ্যে ব্যয় করা উচিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উপাত্ত অনুযায়ী, ২০১৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মোট জাতীয় উৎপাদনের ১৭.০৬ শতাংশ ব্যয় করে জনস্বাস্থ্যের জন্য, অস্ট্রেলিয়া করে ৯.২১ শতাংশ, কানাডা ১০.৫৭ শতাংশ, কিউবা ১১.৭১ শতাংশ, ফ্রান্স ১১.৩১ শতাংশ, জার্মানি ১১.২৫ শতাংশ, জাপান ১০.৯৪ শতাংশ, সুইজারল্যান্ড ১২.৩৫ শতাংশ ও ব্রিটেন ৯.৬৩ শতাংশ।
এবার আমরা কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশ ও উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তির দিকে নজর দিতে পারি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ব্রাজিল তার মোট জাতীয় উৎপাদনের ৯.৪৭ শতাংশ ব্যয় করে জনস্বাস্থ্যের জন্য, চীন ৫.১৫ শতাংশ, ভারত ৩.৫৩ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়া ২.৯৯ শতাংশ, ইরান ৮.৬৬ শতাংশ, দক্ষিণ আফ্রিকা ৮.১১ শতাংশ ও মালয়েশিয়া ৩.৮৬ শতাংশ। জনস্বাস্থ্যে ব্যয়ের ব্যাপারে ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইরানের অবস্থা মোটামুটি সন্তোষজনক হলেও উদীয়মান অর্থনৈতিক বিশ্ব পরাশক্তির দেশ চীনের অবস্থা ভালো নয়, আর উন্নয়নশীল দেশ ভারতের অবস্থা তো শোচনীয়।
সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ, যে রাষ্ট্রটি তার জিডিপির ৯.০৩ শতাংশ ব্যয় করে জনস্বাস্থ্যে। ৫.৫৫ শতাংশ ব্যয় নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে নেপাল। এ ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার ব্যয় জিডিপির ৩.৮১ শতাংশ। জিডিপির ২.২৭ শতাংশ ব্যয় নিয়ে সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থায় আছে বাংলাদেশ, যেটি পাকিস্তানের (২.৯০ শতাংশ) চেয়েও কম! ২০১৮ সালের ৭ মে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন কর্তৃক প্রস্তুত এক জরিপে বলা হয় যে, জিডিপির হিসাবে স্বাস্থ্যে বাংলাদেশের বরাদ্দ কমেছে। জাতিসংঘ কমিশনের এই জরিপ অনুযায়ী, জনস্বাস্থ্যে বাংলাদেশের বরাদ্দ দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন।
পাঁচ. এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল এক দশক ধরে ক্ষমতায় থাকার কারণে শিল্পায়ন, নগরায়ণ, শক্তিশালী অবকাঠামো নির্মাণ, বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন, একটি সম্পন্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে তোলাসহ অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশেষ করে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নের একটি নতুন চূড়া স্পর্শ করে, যখন জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি বিষয়ক কমিটি জানায় যে, বাংলাদেশ উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হওয়ার শর্তগুলো পূরণ করেছে। উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সাল থেকে বাংলাদেশ জাতিসংঘের এলডিসি বা অনুন্নত দেশের তালিকায় ছিল।
২০১৫ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়। আর ২০১৮ সালে উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হওয়ার প্রাথমিক স্বীকৃতি পায় জাতিসংঘের কাছ থেকে, যেটি বাংলাদেশের পাকাপাকিভাবে পাওয়ার কথা রয়েছে ৬ বছর পরে। তবে সব অর্জন স্বীকার করেও এ কথাটি কবুল করতে হবে যে, গত এক দশক ধরে বাংলাদেশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়ানো ও অবকাঠামো নির্মাণকেন্দ্রিক উন্নয়নের মডেল অনুসরণ করছে।
নীতিনির্ধারণের জায়গা থেকে যেটি বোঝা প্রয়োজন সেটি হচ্ছে- জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়ানো ও শক্তিশালী অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা, দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি ও ন্যায়বিচারের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা, মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ সব নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজন ও অধিকার নিশ্চিত করা না হলে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে অর্থপূর্ণ হয়ে উঠবে না। আর উন্নয়নের সুফল যদি মানসম্পন্ন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে উন্নয়নের চূড়ান্ত লক্ষ্য অধরাই থেকে যাবে।
অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এ জাতীয় আরো খবর