1. [email protected] : admi2017 :
  2. [email protected] : Daily Khabor : Daily Khabor
  3. [email protected] : shaker :
  4. [email protected] : shamim :
বুধবার, ২৭ অক্টোবর ২০২১, ০৯:৫০ পূর্বাহ্ন

খুন হওয়া ইমরান কারাগারে!

ডেইলি খবর নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ২৫ মে, ২০২১
  • ৯৫ বার পড়া হয়েছে

খুন হয়েছেন একজন। তবে আদালতে দেওয়া তিন আসামির জবানবন্দিতে এসেছে অন্যজনের নাম। ঘটনার চার বছর পর জানা গেল, আসামিদের জবানবন্দিতে ‘খুন হওয়া’ ইমরান হোসেন ওরফে আজমল নামের ওই ব্যক্তি অন্য একটি মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে বন্দি। আর খুন হওয়া ব্যক্তিটি হলেন মো. মুজিবুর।

কথিত ইমরান হত্যায় এই মুজিবুরকে অন্যতম সন্দেহভাজন খুনি হিসাবে চিহ্নিত করেছিল পুলিশ। এই হত্যায় ইমরান নিজেও অংশ নেয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মুজিবুর হত্যার দায় স্বীকার করে ফৌজদারি দণ্ডবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন ইমরান।

অথচ চার বছর আগে তিন আসামির জবানবন্দিতে উঠে আসে, মাদক ব্যবসার বিরোধের জেরে তথাকথিত ইমরানকে গলা টিপে খুন করেন আসামিরা। কথিত এই হত্যার মিশনে খুন হওয়া মুজিবুরসহ ১০ জন অংশ নেন।

অর্থাৎ যে মুজিবুর খুন হয়েছেন, সেই মুজিবুরকেই অন্যতম হত্যাকারী হিসাবে চিহ্নিত করে পুলিশ। যদিও আদালতে সাজানো জবানবন্দি দেওয়া আসামিরা যুগান্তরের কাছে দাবি করেছেন, নির্মম নির্যাতন এবং ক্রসফায়ারের ভয়ে পুলিশের সাজানো গল্পে তারা আদালতে জবানবন্দি দিতে বাধ্য হয়েছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কদমতলী থানার একটি হত্যা মামলায় উল্লিখিত জবানবন্দির বিষয়ে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য। এমনকি মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই প্রদীপ কুমার কুন্ড ‘সাজানো গল্পে’ হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করে পুরস্কৃতও হন। ২০১৭ সালের ১০ জুন ঢাকা ডিএমপির অপরাধ পর্যালোচনা সভায় তাকে পুরস্কৃত করা হয়। তদন্তের এই পর্যায়ে রহস্যঘেরা মুজিবুর হত্যায় কারাগারে বন্দি ইমরান এবং তার সহযোগীদের সন্দেহভাজন খুনি হিসাবে ধারণা করছেন বর্তমান তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, যারা হত্যায় জড়িত নন, তাদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা অন্যায়। প্রচণ্ড রকম শারীরিক নির্যাতন ছাড়া কেউ এ ধরনের স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হবে না। মামলার রহস্য উদ্ঘাটনে দ্রুত কৃতিত্ব দেখাতে গিয়ে হোক বা যেভাবেই হোক, নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায় করেছে পুলিশ।

তিনজন কীসের ভিত্তিতে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন, সেটি তদন্ত করে বের করা উচিত। আমি মনে করি, পুরো বিষয়টির আলাদা তদন্ত হওয়ার প্রয়োজন আছে। বিচার বিভাগীয় তদন্তও হতে পারে। এ ধরনের জবানবন্দি আদায়ের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন প্রত্যেককে বিচারের আওতায় আনা উচিত।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২০ মে লাশ উদ্ধারের পর কদমতলী থানা পুলিশ কথিত ইমরান হত্যার গল্প সাজায়। তখন থানার ওসি ছিলেন কাজী ওয়াজেদ আলী। মামলার বাদী এসআই লিটন মিয়া। এজাহারে উল্লেখ করা তথ্যের সূত্র ধরেই মামলার তদন্ত ‘ভুল পথে’ পরিচালিত হয়।

বাদী এজাহারে তথ্য গোপন করার পাশাপাশি ‘অসমর্থিত’ সূত্রের বরাতে খুন হওয়া ব্যক্তি সম্পর্কে ‘ভুল ধারণা’ দেন। প্রকৃত খুন হওয়া মুজিবুরকে এজাহারেই সন্দেহভাজন খুনি হিসাবে উল্লেখ করেন তিনি। জামাল হোসেন ওরফে হিজড়া জামাল নামে এক ব্যক্তির ঘর থেকে লাশ উদ্ধার করা হলেও এ সম্পর্কে কোনো তথ্যই উল্লেখ করা হয়নি এজাহারে।

ঘটনার সময় তার অবস্থান কোথায় ছিল, এ বিষয়েও কোনো তথ্য নেই। তার দেওয়া বিভ্রান্তিকর তথ্য বিশ্বাস করে পুলিশ তিন আসামির জবানবন্দি আদায় করে। এ ঘটনার এক মাসের মধ্যে এসআই প্রদীপ কুমার নিশ্চিত হন ভুক্তভোগী প্রকৃতপক্ষে ইমরান নন। তিনি বেঁচে আছেন। এই তথ্য উদ্ঘাটনের পর তিনি বিষয়টি চেপে যান। জামাল পুলিশকে ভুল তথ্য দিয়েছেন, সেটি নিশ্চিত হলেও রহস্যজনক কারণে তাকে তখন আইনের আওতায় আনা হয়নি।

এদিকে ২০১৭ সালের ৩০ মে ঢাকা মহানগর পুলিশের নিউজপোর্টাল ‘ডিএমপিনিউজডটওআরজি’-তে মামলার রহস্য উদ্ঘাটন সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, কথিত ইমরান হত্যার ঘটনায় বিল্লাল হোসেন এবং জালাল নামে দুজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে ঘটনার বিস্তারিত জানিয়েছে। কদমতলী থানা পুলিশ তদন্ত করে নিশ্চিত হয়েছে ওই লাশটি ইমরানের।

মামলার নথি পর্যালোচনা করে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২০ মে কদমতলীর ঢাকা ম্যাচ এলাকার ইগলু আইসক্রিম ফ্যাক্টরির সামনে টিনের ছাপড়া ঘর থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। লাশের শরীরে পচন ধরায় তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

২২ মে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করে পুলিশ। লাশ উদ্ধারের ১০ দিনের মধ্যেই ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তারা হলেন বিল্লাল হোসেন, জালাল, কালা সুমন, রাসেল ও মহিম। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বিল্লাল, জালাল ও সুমন। তারা তিনজনই এখন জামিনে আছেন।

আদালতে সাজানো জবানবন্দি দেওয়া বিল্লাল হোসেন এবং জালাল প্রায় একই ধরনের তথ্য দিয়ে জানান, এসআই প্রদীপ কুমার কুন্ডর নেতৃত্বে তাদের গ্রেফতার করা হয়। তারপর নির্মম নির্যাতন চলে তাদের ওপর। মারধরের পাশাপাশি চোখে মরিচের গুঁড়া দেওয়া হয়। ক্রসফায়ারের ভয়ও দেখানো হয় তাদের। তারা পুলিশকে বারবার বলেছেন, তারা কোনো খুনের সঙ্গে জড়িত নন। কিন্তু পুলিশ কোনো কথাই শোনেনি।

বিল্লাল হোসেন বলেন, আমাকে গ্রেফতারের পর কদমতলীর ওয়াসার লেগুনার পাড়ে আনসার ক্যাম্পের সামনে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। ইমরান হত্যার কথা স্বীকার না করলে ক্রসফায়ার দেওয়া হবে বলেও ভয় দেখানো হয়। পরে থানায় নিয়ে হাত-পা বেঁধে টেবিলে শুইয়ে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে আমার ওপর নির্যাতন চলে। প্লাস দিয়ে চেপে ধরে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষতবিক্ষত করা হয়।

নির্যাতনের পরও স্বীকার না করায় চোখে মরিচের গুঁড়া দেওয়া হয়। সহ্য করতে না পেরে জোরে চিৎকার দিলে মুখের মধ্যে গামছা ঢুকিয়ে দেয় এসআই প্রদীপ। তখন থানার মধ্যে প্রদীপের সঙ্গে দুই সোর্সও নির্যাতন করেছে। এমনকি যার ঘর থেকে মুজিবুরের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, সেই জামালও সেখানে ছিল। এমন নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আদালতে জবানবন্দি দিতে রাজি হই।

প্রায় একই ধরনের নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে জালাল যুগান্তরকে বলেন, প্রদীপ বলে, যেভাবে স্ট্যাটমেন্ট লিখে দেব, সেভাবেই আদালতে জবানবন্দি দিবি। মৃত্যুভয় আর জাহান্নাম থেকে তখন বাঁচতে তা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। বাধ্য হয়ে আমরা জবানবন্দি দিতে রাজি হই।

এ বিষয়ে এসআই প্রদীপ কুমার কুন্ডর সঙ্গে শনি, রবি ও সোমবার তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এরপর সোমবার এই প্রতিবেদকের পরিচয় দিয়ে একই নম্বরে খুদে বার্তা (শর্ট মেসেজ সার্ভিস বা এসএমএস) পাঠিয়ে মুজিবুর হত্যার বিষয়ে কয়েকটি প্রশ্ন লিখে উত্তর চাওয়া হয়।

একই দিন (সোমবার) হোয়াটসঅ্যাপে তার মোবাইল ফোন নম্বরে ওই প্রশ্নগুলো পাঠানো হয়। এক্ষেত্রে হোয়াটসঅ্যাপের নির্ধারিত সংকেত দেখে নিশ্চিত হওয়া গেছে প্রশ্নগুলো ‘সিন করা’ (দেখা) হয়েছে। কিন্তু সোমাবার রাত ১০টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এসআই প্রদীপ কুমার কুন্ড এসএমএস ও হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো প্রশ্নের উত্তর দেননি অথবা কলব্যাক করেননি।

মুজিবুর হত্যার সময় কদমতলী থানার তৎকালীন ওসি এবং বর্তমান পল্লবী থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী বলেন, তদন্তের কোনো পর্যায়েই পুলিশ বলেনি উদ্ধার হওয়া লাশ ইমরানের। ঘটনার পর সন্দেহভাজন হিসাবে গ্রেফতার হওয়া তিনজন স্বেচ্ছায় আলাদা আলাদা বিচারকের কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন। এখানে পুলিশ জোর করে কোনো জবানবন্দি আদায়ের সুযোগ নেই।

তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেও প্রকৃতপক্ষে ইমরান খুন হয়েছেন কি না, সেটির তদন্ত শুরু করেন এসআই প্রদীপ কুমার কুন্ড। ঘটনার এক মাস পর তিনি ইমরানের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে নিশ্চিত হন তিনি খুন হননি। খুন হওয়া ব্যক্তিটির পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ার কারণে তদন্তও তখন শেষ হয়নি। ঘটনার চার বছর পর জানা গেল, খুন হওয়া ব্যক্তিটি হলেন মুজিবুর। তিনি আরও জানান, আসামিরা বাঁচার জন্য এখন অনেক কথাই বলবেন। তাদের কোনো ধরনের নির্যাতন করা হয়নি।

এ বিষয়ে মামলার বাদী এসআই লিটন মিয়া যুগান্তরকে বলেন, চার বছর আগের ঘটনা। এজাহার না দেখে এ বিষয়ে বলা সম্ভব নয়। এজাহার দেওয়ার পর সেটি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও পরীক্ষা করে দেখেন। জামালের ঘর থেকে লাশ উদ্ধারের বিষয়টি এজাহারে নেই কেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।

কথিত ইমরানই খুনি : সাজানো জবানবন্দি আদায়ের চার বছর পর গত ফেব্রুয়ারিতে কারাগারে থাকা ইমরান আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে তিনি দাবি করেন, মাথায় শিলপাটা দিয়ে আঘাত করে মুজিবুরকে হত্যা করা হয়। তারপর লাশের চেহারা বিকৃত করে মুজিবুরকে ইমরানের জামা পরিয়ে দেওয়া হয়।

সাজানো জবানবন্দি দেওয়া সুমনও এই হত্যায় জড়িত বলে তিনি (ইমরান) জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন। তবে সাজানো জবানবন্দি দেওয়া অন্য দুইজনের (বিল্লাল ও জালাল) নাম আসেনি। পুলিশের সোর্স জামালও (যার ঘর থেকে মুজিবুরের লাশ উদ্ধার হয়) এই হত্যার মিশনে অংশ নেন। ফেব্রুয়ারিতে জামালকে পুলিশ গ্রেফতার করে। তিনি পুলিশের কাছে এখনো দাবি করছেন, মুজিবুর বেঁচে আছেন।

কদমতলী থানার বর্তমান ওসি জামাল উদ্দীন মীর শনিবার বলেন, বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন। তাছাড়া এটি জটিল বিষয়। মুজিবুর হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ইমরান এরই মধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এ ঘটনায় জামালকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বক্তব্য এখনো অস্পষ্ট।

শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ তদন্ত : অনুসন্ধানে জানা যায়, মুজিবুর খুন হওয়ার পর জামাল পালিয়ে গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে চলে যান। পরে লাশ উদ্ধারের পর নিজেই পুলিশের কাছে এসে ‘সাজানো’ গল্প বলেন। পুলিশ তার তথ্যের ভিত্তিতেই কথিত ইমরানের লাশ বলে শনাক্ত করে। পরে পাঁচ আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। আসামিদের গ্রেফতার অভিযানে পুলিশের সঙ্গেই ছিলেন জামাল। এজাহারে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির সঙ্গে চলাফেরা করেন এমন ১১ জন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হলেও জামালের নাম নেই। অথচ ইমরানের সঙ্গে জামালের ব্যাপক সখ্য ছিল।

মুজিবুরের মেয়ে মেহেরীন শেখ বলেন, লাশ উদ্ধারের পর আমাদের ডেকেছিল পুলিশ। লাশে পচন ধরায় আমরা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারিনি এটা আমার বাবার লাশ। পুলিশ লাশের পাশ থেকে আমার বাবার জাতীয় পরিচয়পত্র এবং মানিব্যাগ উদ্ধার করে। পরে তারা বলেছিল, ইমরান নামে এক ব্যক্তি খুন হয়েছেন। খুনের সঙ্গে আমার বাবা জড়িত। এ কারণে তিনি পালিয়ে গেছেন। ঘটনার চার বছর পর জানতে পারলাম আমার বাবা খুনি নন, উলটো বাবাকেই খুন করা হয়েছে। তবে মামলার বাদী এসআই লিটন মিয়ার দাবি-মুজিবুরের মানিব্যাগ ও জাতীয় পরিচয়পত্র তিনি পাননি।

বিজ্ঞাপন

এ জাতীয় আরো খবর