1. [email protected] : admi2017 :
  2. [email protected] : Daily Khabor : Daily Khabor
  3. [email protected] : shaker :
  4. [email protected] : shamim :
মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৮:০৪ অপরাহ্ন

গণমাধ্যমের সর্বগ্রাসী করপোরেটকরণ

ডেইলি খবর নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১
  • ২৩ বার পড়া হয়েছে

মাহফুজ আনাম
সাংবাদিক হিসেবে গণমাধ্যমের প্রতি সরকারের শোষণমূলক আচরণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার কিছু অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। কিন্তু, মালিক নিজেই যখন তার গণমাধ্যমের প্রতি শোষণমূলক আচরণ করেন, তখন কীভাবে এবং কেন এমন পরিস্থিতির মোকাবিলা করব?
অর্থাৎ মালিক যখন নির্ধারণ করে দেন সম্পাদক কী ছাপবেন কিংবা কী ছাপবেন না, প্রয়োজনে সম্পাদককে বাধ্য করা হয় কিংবা সম্পাদক রাজি না হলে তাকে তোয়াক্কা না করেই সংবাদ প্রকাশ করা হয়? কিছু ভয়াবহ গল্প শোনা যায় যেখানে সম্পাদককে ব্যবহার করা হয় সিলমোহর হিসেবে। পুরো বার্তাকক্ষ নিশ্চুপ হয়ে দেখতে থাকে, মালিকপক্ষের লোকজন এসে সাংবাদিকদের বাধ্য করে তাদের ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষ অথবা যাদেরকে বিরোধী বলে মনে হয় তাদের নামে মিথ্যে, অসম্মানজনক-মানহানিকর সংবাদ প্রকাশে।
একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কেন সংবাদপত্র প্রকাশ করছে? এ প্রসঙ্গে আলোচনায় একজন সম্পাদক বন্ধু বললেন, তারা কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। এই বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখার জন্যে তাদের গণমাধ্যম, বিশেষ করে সংবাদপত্র খুবই প্রয়োজন। যে খাতে তারা বিনিয়োগ করছে,সেই খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম রয়েছে। যারা নতুন প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন মিথ্যা ও মানহানিকর প্রতিবেদন প্রকাশ করে ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতি করছে।
এক্ষেত্রে সহজেই অনুমেয় যে নতুন সংবাদপত্রটির ভূমিকা কী হবে। এই গল্পের অন্তর্নিহিত অর্থ হচ্ছে, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তারা সংবাদপত্রে (পড়ুন গণমাধ্যমে) বিত্ত ও ক্ষমতার বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। যাতে সেগুলো তাদের ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধাচরণ ও অন্য গণমাধ্যমকে তাদের অসাধু কর্মকান্ড ফাঁস করে দেওয়া থেকে বিরত রাখার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
তার মানে হচ্ছে—পেশাদার সাংবাদিকতার নীতি কার্যকর থাকছে না। কার্যকর থাকছে না সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা,গণতন্ত্র,সত্য,মানুষের অধিকার,জনস্বার্থ, সামষ্টিক মঙ্গল, দুর্নীতি উন্মোচন, ন্যায়বিচারের সংগ্রাম, সমতা, ন্যায্যতা, ন্যায়সঙ্গত সমাজ গঠনের মতো ধারণাগুলো। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিতায় আনার যে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গণমাধ্যম পালন করে, তা উধাও হয়ে যাচ্ছে। আর এর সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার ধারণা।
স্বাধীন গণমাধ্যমের ধারণার ওপর বিভিন্ন মহল থেকে হুমকি আসে। তার মধ্যে আছে সরকার, বিজ্ঞাপনদাতা, মালিকপক্ষ এবং এমনকি সাংবাদিকদের নিজেদের নৈতিক মান ধরে রাখতে না পারার ব্যর্থতাও।সরকারের কাছ থেকে এই হুমকি আসে মূলত দুই দিক দিয়ে। প্রথমত, নিপীড়নমূলক আইন তৈরির মাধ্যমে। দ্বিতীয়ত,সেই আইনগুলো প্রয়োগের ধরনের মাধ্যমে। এই দুটি বিষয় সম্মিলিতভাবে স্বাধীন গণমাধ্যমের প্রতি সরকারের সার্বিক মনোভাব প্রকাশ করে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন হচ্ছে এর সর্বশেষ ও সবচেয়ে কলুষিত উদাহরণ।বাংলাদেশে গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট সব আইন নিপীড়ন বা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে প্রণীত। সাংবাদিক, সংবাদপত্র অথবা সার্বিকভাবে গণমাধ্যমকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্যে অথবা এর মূল উদ্দেশ্যকে সহায়তা করার জন্যে এবং গণমাধ্যমকর্মীদের পুলিশি হয়রানি বা নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদের প্রতিকারের জন্যে আমাদের সংবিধানে তথ্য অধিকার আইন (আরটিআই) ছাড়া আর কোনো আইন নেই। এক্ষেত্রে আমাকে কেউ ভুল প্রমাণ করতে পারলে আমি খুবই খুশি হব।
বিজ্ঞাপন নিয়ে হুমকি তো সব সময়ই ছিল। একটি বড় প্রতিষ্ঠান হয়তো অবাধে দেশের মানুষের সম্পদ লুটপাট করছে। কিন্তু, তাদের অপকর্মের বিষয়ে সামান্য কিছু লিখলেই সংবাদপত্রটির নাম কাটা পড়তে পারে তাদের কাছ থেকে বিজ্ঞাপন পাওয়ার তালিকা থেকে। এ ধরনের আচরণ নতুন কিছু নয়। কিন্তু, বর্তমানে এর তীব্রতা অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। প্রশ্ন আসতে পারে, একটি পত্রিকা যদি কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কিছু লেখে, তাহলে কেন তারা সেই পত্রিকায় তাদের বিজ্ঞাপন ছাপাবে? কিন্তু, এখানে ভুলে গেলে চলবে না,পত্রিকাটি সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লিখছে না। পত্রিকাটি লিখছে ওই প্রতিষ্ঠানটির একটি সুনির্দিষ্ট অনৈতিক ও বেআইনি কাজের বিরুদ্ধে। যেটি সমাজ ও পরিবেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্যে সবার সামনে উন্মোচন করা অপরিহার্য।
গণমাধ্যম ও বিজ্ঞাপনদাতাদের সম্পর্কে কোনোভাবেই এমন কিছু আসা উচিত নয় যা সাংবাদিকতার স্বাধীন ও নৈতিক মানদন্ডের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। এটি একটি জটিল বিষয় এবং করোনা মহামারির কারণে তা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। গণমাধ্যমের আয়ের কাঠামো সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে এই বিষয়টি।
আমাদের আজকের মূল আলোচ্য বিষয় হচ্ছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে গণমাধ্যমকে ‘করপোরেট’ নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টা। গণমাধ্যমের ওপর সার্বিক নিয়ন্ত্রণ নয়, নিজ মালিকানায় থাকা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ। এই আলোচনাটিকে শুধুমাত্র সংবাদপত্রে সীমাবদ্ধ রাখতে চাই। কারণ, এই বিষয়েই আমার সামান্য জ্ঞান আছে বলে মনে করি। শুরুতেই বিষয়টিকে স্ববিরোধী বলে মনে হতে পারে। কারণ, কেউ যদি কোনো কিছুর মালিক হয়, তাহলে সে সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করবে এটাই স্বাভাবিক। হ্যাঁ, এটা অনেক ক্ষেত্রে সত্য। কিন্তু, সব ক্ষেত্রে নয়। একটি হাসপাতালের মালিক কেবল বিনিয়োগ করেছেন বলেই কি নিজের ইচ্ছামতো সেটি চালাতে পারবেন? ডাক্তারদেরকেই সেই হাসপাতাল পরিচালনা করতে হবে। ব্যবসায়ীরা উড়োজাহাজ সংস্থার মালিক হতে পারেন। কিন্তু, সেগুলো কি পেশাদার কর্মী ছাড়া তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী চালাতে পারবে? এই বিষয়টি গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অনেকেই সংবাদপত্র শিল্পে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু,শুধুমাত্র পেশাদার সাংবাদিকদেরকেই এর পরিচালনার দায়িত্ব দিতে হবে।
এখানে আমাদের সামনে সার্বিকভাবে সংবাদপত্রের ভূমিকার প্রসঙ্গ চলে আসে। এটি কি শুধুমাত্র মালিকের স্বার্থই রক্ষা করবে? একজন বলেছিলেন, ‘সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হচ্ছে সংবাদমাধ্যমের মালিকদের স্বাধীনতা।’ বিষয়টি কি সত্য? তাহলে সার্বিকভাবে সমাজ, জনগণ,নীতি ও আদর্শের প্রেক্ষাপটে জাতীয় স্বার্থের কী হবে? বাকস্বাধীনতা, মানুষের সত্য জানার অধিকার, ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহিতার মতো মৌলিক নীতিগুলোর কী হবে?
যদি গণমাধ্যমের ভূমিকা মালিকদের করপোরেট স্বার্থের চেয়ে অনেক বেশি বড় হয় (সংজ্ঞা অনুযায়ী এটি বড়ই হওয়ার কথা) এবং যদি তা সমগ্র জাতির স্বার্থকে রক্ষা করে, তাহলে এটিকে অবশ্যই পেশাদার সাংবাদিকদের নেতৃত্বে পূর্ণ স্বাধীনতার সঙ্গে পরিচালিত হতে দেওয়া উচিত। অন্যান্য দেশের কিছু অভিজ্ঞতা এই বিষয়টিকে প্রমাণ করার ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে।
সময়ের প্রবাহে সংবাদপত্রে আরও বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ছাপাখানার কারিগরি জটিলতা বাড়ার কারণে মূলধন বাড়াতে হচ্ছে এবং এই প্রেক্ষাপটে, একক মালিকানা বেশ ঝামেলাপূর্ণ হয়ে গেছে। আর্থিক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগের মাধ্যমে এই খাতে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। শিল্পোন্নত দেশের সংবাদপত্রের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই তারা ব্যাংক, বীমা,বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, মিউচুয়াল ও বিনিয়োগ তহবিল, সেবা খাত ইত্যাদি থেকেও বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে। কেন এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সংবাদপত্রে বিনিয়োগ করে? কারণ এটাই যে,সংবাদপত্রে বিনিয়োগ একটি লাভজনক বিনিয়োগ এবং বিনিয়োগকারীরা এই খাত থেকে ভালো লাভ (বিনিয়োগের বিপরীতে লাভ বা রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট) পাচ্ছেন।
আলোচনার এ পর্যায়ে এসে ঘটনাটি একটি চমকপ্রদ মোড় নিয়েছে। সংবাদপত্রে বিনিয়োগ এসেছে, কারণ সেখান থেকে ভালো লাভ আসছে। ফলাফল এমন হওয়ার কারণ হচ্ছে,সংবাদপত্র জনগণের স্বার্থ রক্ষায় নিবেদিত ছিল, এই খাতের মালিকানায় থাকা বিভিন্ন সুবিধাবাদী মহলের স্বার্থ রক্ষায় নয়। একই কারণে তাদের ব্যবসার পরিধি বেড়েছে এবং তারা বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণীয় লভ্যাংশ দিতে পেরেছেন।
বাংলাদেশের গণমাধ্যমে বাড়তে থাকা করপোরেট বিনিয়োগ কোনো নতুন বা নজিরবিহীন ঘটনা নয়। বিষয়টি খানিকটা অবশ্যম্ভাবী ছিল বলা যায়। তবে, যে বিষয়গুলো নজিরবিহীন কিংবা অবশ্যম্ভাবী ছিল না, তা হচ্ছে করপোরেট নিয়ন্ত্রণের সর্বগ্রাসী রূপ এবং সংবাদপত্রের নৈতিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়া। এটি গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধ্বংস করছে, যা তার গ্রহণযোগ্যতার চালিকাশক্তি।
একজন বিনিয়োগকারী অবশ্যই চাইবেন সংবাদপত্রে বিনিয়োগ করে সেখান থেকে লাভ করতে। এই প্রত্যাশাটি কোনোদিক দিয়েই অস্বাভাবিক বা অযৌক্তিক নয়। এক্ষেত্রে একমাত্র উপায় হচ্ছে গণমাধ্যমকে তার মতো করে চলতে দেওয়া। যার মাধ্যমে গণমাধ্যম জনগণের স্বার্থ রক্ষায় নিবেদিত থাকবে। নৈতিক সাংবাদিকতা, সব ক্ষেত্রে কল্যাণমূলক মনোভাব এবং বাকস্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করে একটি সংবাদপত্র বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে। এতে রাজস্ব বেড়ে যায়। এর দ্বারা সাংবাদিকদের সম্মানজনক সম্মানী ও ভালো কাজের পরিবেশ এবং একইসঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্যে ভালো লভ্যাংশের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়। এটাই হচ্ছে মুক্ত ও স্বাধীন গণমাধ্যমের ব্যবসায়িক মডেল এবং এটাই একমাত্র গ্রহণযোগ্য মডেল। কিন্তু, যখন বিনিয়োগকারীরা উপরের চক্রটি ভেঙে তাদের মালিকানায় থাকা সংবাদপত্রগুলোকে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যে ব্যবহার করে,অথবা জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে,তখন ভয়াবহ কিছু সমস্যা দেখা দেয়। বাংলাদেশ এখন তেমন সমস্যার মুখোমুখি।
আবারও বলছি, সংবাদপত্রের নেপথ্যে করপোরেট উদ্দেশ্য থাকা নতুন কিছু নয় এবং এটি শুধু বাংলাদেশেই ঘটছে না। তবে, এক্ষেত্রে একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। যেসব দেশে প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্র আছে, সেখানে সম্পাদক নিজেই একটি প্রতিষ্ঠানের সমতুল্য। সম্পাদক নামক প্রতিষ্ঠানটি সুপ্রতিষ্ঠিত, অসম্ভব সুনাম-সম্পন্ন এবং এটি জনগণের কাছে বিপুল বিশ্বাসযোগ্য। ইরাক আক্রমণের সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জানিয়ে পশ্চিমা সংবাদপত্র ও তাদের সম্পাদকরা বড় আকারে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছিলেন। তবে,তাদের মধ্যে কেউ কেউ ভুল বুঝতে পেরে এই বিতর্কিত ঘটনাগুলোর আড়ালে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উন্মোচন করেন, যা তাদের হারানো বিশ্বাসযোগ্যতাকে কিছু পরিমাণে ফিরিয়ে দেয়।
আমাদেরকে ‘সম্পাদক’ নামক প্রতিষ্ঠানটির পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সুরক্ষা ও সংরক্ষণ নিয়ে গুরুত্ব সহকারে চিন্তা করতে হবে। আমাদের কাছে পাকিস্তান আমলের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, জহুর হোসেন চৌধুরী ও আবদুস সালাম এবং প্রাক ১৯৪৭ আমলের আবুল কালাম শামসুদ্দীন ও আবুল মনসুর আহমেদের অসাধারণ উদাহরণ রয়েছে। তারা আমাদেরকে আজকের বাংলাদেশি গণমাধ্যমে ‘সম্পাদক’র প্রতিষ্ঠানিক রূপটিকে নতুন করে তৈরি করার জন্যে অনুপ্রাণিত করেন।
সম্পাদক হলেন সেই অতীব গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, যিনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সরকার,বিভিন্ন সংস্থা,বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান, শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতাসহ সব ধরনের আক্রমণ থেকে রক্ষা করেন। তিনি তার সাহসী, নৈতিক ও সৎ নেতৃত্ব এবং নির্দলীয় অবস্থান দিয়ে মালিকের হস্তক্ষেপ থেকে পত্রিকাকে রক্ষা করেন। তিনি তার সহকর্মী সাংবাদিকদের বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চরম উৎকর্ষে পৌঁছাতে অনুপ্রাণিত করেন। এই বিষয়গুলো বাংলাদেশে মুক্ত ও স্বাধীন গণমাধ্যম টিকে থাকার জন্যে খুবই জরুরি।
স্বীকার করতে দ্বিধা নেই,আমরা অনেকেই এই কাজে ব্যর্থ হয়েছি। মালিকের জনসংযোগ কর্মকর্তার ভূমিকা পালন করে আমরা নিজেরাই প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছি। আমরা অনেকেই আমাদের পদাধিকার ব্যবহার করে ধনী ও শক্তিমানদের কাছ থেকে অনুগ্রহ আদায় করেছি,প্রভাবের বিনিময়ে ব্যক্তিগত অর্জন পেয়েছি, নিজ অবস্থানের অপব্যবহার করে অন্যদের ক্ষতি করেছি এবং প্রকৃত সত্যটি জানা সত্ত্বেও সুবিধাজনক রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে থাকার জন্য তথ্যের বিকৃতি ঘটিয়েছি।
অন্যভাবে বলা যায়,আমরা অনেকেই নিজ নিজ সংবাদপত্রের দিকে যথেষ্ট পরিমাণ মনোযোগ দেইনি এবং খেয়াল রাখিনি সেখানে কী প্রকাশিত হচ্ছে,প্রকাশিত সংবাদ কতটুকু গবেষণা নির্ভর, ব্যবহৃত তথ্যসূত্রগুলো কতটুকু মানসম্পন্ন ও নির্ভরযোগ্য এবং কোনো প্রতিষ্ঠান অথবা কারও ব্যক্তিগত সম্মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার আগে সব তথ্য-উপাত্ত সঠিকভাবে খতিয়ে দেখা হয়েছে কি না।এর সব কিছুই সম্পাদক নামের প্রতিষ্ঠানটি এবং যে সংবাদপত্রের তিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন তার বিশ্বাসযোগ্যতাকে মাটিতে নামিয়ে এনেছে।
সার্বিকভাবে সাংবাদিকতা ও প্রকারান্তরে দেশের মঙ্গলের জন্যেই এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়া দরকার।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তৃতির সঙ্গে সুনামির মতো এসেছে অসংখ্য সংবাদ পোর্টাল। এগুলো অসম্পাদিত, অসমর্থিত, সূত্রবিহীন সংবাদে পরিপূর্ণ। এসব পোর্টালে সরকার ও শক্তিশালী ব্যবসায়িক মহলের মদদপুষ্ট ও প্রচারণামূলক ‘অপতথ্য’র সীমাহীন প্রবাহ খুব সম্ভবত সাংবাদিকতার ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সম্পাদকের ভূমিকাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এক বিজ্ঞজন বলেছিলেন, ‘আপনি যদি সংবাদ না পড়েন, তাহলে কিছুই জানবেন না। কিন্তু, আপনি যদি সংবাদ পড়েন, তাহলে ভুল জানবেন।’ এটা এমন একটি বিষয়, যা আমাদের (সাংবাদিকদের) জন্যে উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত,যদি আমরা আমাদের পেশাটিকে বাঁচাতে চাই।সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা শহর থেকে সর্বমোট এক হাজার ২০০টি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। দেশজুড়ে এই সংখ্যা তিন হাজার ২২২। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, সংবাদপত্র বাংলাদেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধিশালী খাতগুলোর মধ্যে একটি। এক্ষেত্রে প্রশ্ন আসে, এই পত্রিকাগুলোর ব্যবসায়িক মডেল কী? এই পত্রিকার পাঠক ও বিজ্ঞাপনদাতা কারা? আমরা যারা দীর্ঘদিন ধরে এই খাতের সঙ্গে জড়িত,তারা জানি কীভাবে সংবাদপত্রের বাজার সংকুচিত হয়েছে। কীভাবে এতগুলো প্রকাশনা এখনো টিকে আছে,সেটা নিয়ে আমরা বিস্মিত হই। অবশ্য এগুলোর একমাত্র কাজ যদি হয় করপোরেট মালিকদের গুণকীর্তন করা,তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থরক্ষার জন্যে মিথ্যে সংবাদ পরিবেশন করা, তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিষয়ে ভুয়া সংবাদ ছাপানো এবং মালিকদের কাছ থেকে পাওয়া ভর্তুকির ওপর টিকে থাকা, তাহলে বিষয়টি ভিন্ন। কিন্তু, যদি এমনটি হয়, তাহলে অবহেলা করা হয় পেশাদার সাংবাদিকতার ধারণাটিকেই।এক অর্থে আমরা মাও সে তুংয়ের কথার সুরে সুর মিলিয়ে বলতে পারি, ‘হাজার ফুল ফুটতে দাও।’ কিন্তু, অপরদিকে আমরা খুব ভালো করেই জানি, ভুল মানুষের হাতে পড়লে কীভাবে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংস হতে পারে এবং অসম্পাদিত, খারাপভাবে সম্পাদিত বা পুরোপুরি ভুয়া সংবাদের এই যুগে গণমাধ্যম কতটা ক্ষতিকারক হতে পারে।
মাহফুজ আনাম: সম্পাদক ও প্রকাশক, দ্য ডেইলি স্টার

বিজ্ঞাপন

এ জাতীয় আরো খবর