1. [email protected] : admi2017 :
  2. [email protected] : Daily Khabor : Daily Khabor
  3. [email protected] : shaker :
  4. [email protected] : shamim :
সোমবার, ১৭ মে ২০২১, ০৬:১৬ অপরাহ্ন

‘গায়েবি’ গমে আত্মসাৎ

ডেইলি খবর নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০
  • ৫১ বার পড়া হয়েছে

এক দিনে মাত্র একটি ট্রাকে সরকারি খাদ্যগুদামে ১৫ হাজার টন গম পরিবহনের চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। এই গম সরবরাহের নামে রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংক বিডিবিএলে এলসি (ঋণপত্র) খুলে ব্যাংকের ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন ঢাকা ট্রেডিং হাউসের মালিক টিপু সুলতান। জালিয়াতি করে এলসির পরের দিনই একটি ট্রাকে ওই পরিমাণ গম সরবরাহ দেখানো হয়েছে কাগজপত্রে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ এই দুর্নীতির তথ্য।

সূত্র জানায়, বিদেশ থেকে গম আমদানির জন্য ঋণের আবেদনের সঙ্গে ঢাকা ট্রেডিং হাউস খাদ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে যে সমঝোতা স্মারকটি ব্যাংকে জমা দিয়েছিল, সেটি ছিল ভুয়া। এই অভিনব কায়দায় বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের (বিডিবিএল) অর্থ আত্মসাৎ করতেই পরিকল্পিত নাটক সাজিয়েছিলেন টিপু সুলতান। ওই ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছিল বিডিবিএলের রাজধানীর মতিঝিল প্রিন্সিপাল শাখা থেকে। দুদকের তদন্তে ওই অর্থ আত্মসাতের ক্ষেত্রে ব্যাংকের এই শাখার কতিপয় কর্মকর্তার সংশ্নিষ্টতা পাওয়া গেছে।

দুদকের তদন্ত থেকে জানা যায়, টিপু সুলতান ব্যাংকে দেওয়া কাগজপত্রে পুরানা পল্টনের সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণির আল-রাজি কমপ্লেক্সের ১৫ তলায় ডি/১৪০০, ১৬৬-১৬৭ ফ্ল্যাটে তার মালিকানাধীন ঢাকা ট্রেডিং হাউসের ঠিকানা ব্যবহার করেছেন। তদন্তে দেখা যায়, ঢাকা ট্রেডিং হাউস মূলত একটি অস্তিত্বহীন কোম্পানি। এই ভুয়া কোম্পানির নামেই বিডিবিএলের প্রিন্সিপাল শাখায় একটি হিসাব খোলা হয় ২০১২ সালের প্রথম দিকে।

জানা যায়, টাকা আত্মসাতের উদ্দেশ্যে সে সময় খাদ্য অধিদপ্তর, খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়কে ৫০ হাজার টন গম সরবরাহের কথা উল্লেখ করে অধিদপ্তরের সঙ্গে একটি ভুয়া সমঝোতা চুক্তি তৈরি করেছিলেন টিপু সুলতান। এটি তৈরি করেন ২০১২ সালের ২৪ এপ্রিল। এরপর খাদ্য অধিদপ্তরকে গম সরবরাহের কথা বলে বিডিবিএলের প্রিন্সিপাল শাখায় ৩০ কোটি টাকার এলটিআর (লোন ট্রাস্ট রিসিপ্ট) ঋণের জন্য আবেদন করা হয়।

৫০ হাজার টন গম কেনার বিপরীতে ৩০ কোটি টাকা ঋণের আবেদনের সঙ্গে ভুয়া চুক্তিপত্রটি জমা দেওয়া হয়েছিল ২০১২ সালের ২৯ এপ্রিল। পরে ওই শাখা থেকে চুক্তিপত্রটি যাচাই না করে গ্রাহকের দাবি করা ৩০ কোটি টাকার এলটিআর তৈরি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। ২০১২ সালের ৪ জুন প্রস্তাবটির বিপরীতে ঋণ-সংক্রান্ত মঞ্জুরিপত্র ইস্যু করা হয়। এর পরের দিন ওই ৫০ হাজার টন গমের মধ্যে ১৫ হাজার টনের আমদানি এলসি খোলা হয়। এর পরের দিন এলসির বিপরীতে ১৫ হাজার টন গম সরবরাহ করা হয়েছে উল্লেখ করে অর্থছাড়ের জন্য শাখায় লিখিত অনুরোধ জানান ঢাকা ট্রেডিং হাউসের মালিক টিপু সুলতান। এরপর ১৫ হাজার টন গমের বিপরীতে দ্রুততম সময়ে ২৫ কোটি টাকা ছাড় করা হয়। এরপর এই ২৫ কোটি টাকা তাৎক্ষণিক উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়।

সূত্র জানায়, এক দিনে ১৫ হাজার টন গম সরবরাহের বিষয়টি সত্য নয় মর্মে প্রমাণিত হয়েছে। এসপিএস করপোরেশন নামে যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গম সরবরাহ দেখানো হয়েছে, বাস্তবে এটি একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠান।

দুদকের বক্তব্য: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, এক দিনে ১৫ হাজার টন পরিবহন দেখানো হয়েছে, যা বাস্তবে অসম্ভব। ঢাকার মোহাম্মদপুরের এসপিএস করপোরেশনের ট্রাকের মাধ্যমে ঢাকার তেজগাঁওয়ের খাদ্যগুদামে গম পরিবহন দেখানো হয়েছে। চট্টগ্রাম নৌ বন্দর, বেনাপোল স্থলবন্দর বা বেসরকারি কোন গোডাউন থেকে গম সরবরাহ করা হয়েছে, তার কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে যেখান থেকেই পরিবহন করা হোক না কেন একটি ট্রাকে এক দিনে সরকারি গুদামে ১৫ হাজার টন গম সরবরাহ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বিডিবিএলের অর্থ আত্মসাতে সেগুলো ছিল সাজানো নাটক।

চোখের পলকে পরিবহন করলেও সম্ভব নয়: দুদক সূত্র জানায়, একটি ট্রাকের একসঙ্গে পাঁচ টন পণ্য পরিবহনের ক্ষমতা আছে। সেই ট্রাক দিনে ২০ বার পরিবহন করলেও এক দিনে সর্বোচ্চ ১০০ টন পরিবহন করতে পারে। চোখের পলকে সারাদিন পরিবহন করলেও ওই পরিমাণ গম পরিবহন সম্ভব নয়। ব্যাংকে জমা দেওয়া সব কাগজপত্র ভুয়া। ট্রাকের যে নম্বর দেখানো হয়েছে, বাস্তবে ওই নম্বরের কোনো ট্রাক নেই। আর যে প্রতিষ্ঠান থেকে ট্রাক ভাড়া দেখানো হয়েছে সেই প্রতিষ্ঠানও অস্তিত্বহীন। প্রকৃতপক্ষে জাল কাগজ দিয়ে পরস্পর যোগসাজশে বিডিবিএলের ২৫ কোটি টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়েছে, যা পরিশোধের সম্ভাবনা শূন্য।

খাদ্য অধিদপ্তরের বক্তব্য: খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) বদরুল হাসান বলেন, ঢাকা ট্রেডিং হাউস সম্পূর্ণরূপে একটি জাল চুক্তি তৈরি করেছিল। সেটাতে আমার স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। ওই গম কেনার জন্য কোনো টেন্ডার দেওয়া হয়নি। টেন্ডার ছাড়া কেনাকাটার কোনো প্রশ্নই আসে না। বিডিবিএল ওই চুক্তি পাওয়ার পর আমাদের একটি চিঠি দিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইতে পারত। এটি হলেই জালিয়াতি ধরা পড়ে যেত। বিডিবিএল কীভাবে কী করেছে- এটা তাদের বিষয়। তবে এ বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। ঘটনার পাঁচ-ছয় বছর পর একটি অডিট টিম এসে জিজ্ঞেস করেছিল ওই চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেছিলাম কিনা? বলেছি, না, প্রশ্নই আসে না।

জানা যায়, খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক এই ডিজি ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের ওই জালিয়াতির ঘটনার সময় অধিদপ্তরের পরিচালকের (প্রকিউরমেন্ট) দায়িত্বে ছিলেন। এ দায়িত্বে থাকার সময়ই তার স্বাক্ষর জাল করে ঢাকা ট্রেডিং হাউসের টিপু সুলতান গম কেনার ভুয়া সমঝোতা স্মারক তৈরি করেছিলেন। বদরুল হাসান ডিজির দায়িত্বে থাকার সময় বিডিবিএল নিযুক্ত অডিট কমিটিকে বিষয়টি লিখিত চিঠি দিয়ে জানতে চাওয়ার জন্য বলেছিলেন। পরে অডিট কমিটি এ-সংক্রান্ত কোনো চিঠি দেয়নি।

বিডিবিএলের বক্তব্য: বিডিবিএলের প্রিন্সিপাল ব্রাঞ্চের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) এম শফিকুল ইসলাম বলেন, ২০১২ সালে গম আমদানির জন্য ব্যাংকে ঋণ প্রস্তাবটি পেশ করার সময় খাদ্য অধিদপ্তরে চিঠি দিয়ে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে এ নিয়ে কোনো ধরনের জটিলতা তৈরি হতো না। দীর্ঘদিন পর হলেও ব্যাংকের ওই ২৫ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা তদন্ত করা হচ্ছে। জিএম শফিকুল ইসলাম বলেন, এ ব্যাপারে ব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংকিং ডিভিশনের জিএম পরিতোষ সরকারকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্বচ্ছতার সঙ্গে তদন্ত হবে বলে তিনি আশা করেন। কমিটি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদন: সূত্র জানায়, অর্থ আত্মসাতের ওই ঘটনা তদন্তে বিডিবিএলের নিয়োগ করা অডিট ফার্ম জি. কিবরিয়া অ্যান্ড কোম্পানি ঢাকা ট্রেডিং হাউসের অনুকূলে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যাংকিং পদক্ষেপ গ্রহণ, সরবরাহ ডকুমেন্টের সত্যতা যাচাই-বাছাইকরণ, ঋণের শ্রেণিকরণ সঠিক হচ্ছে কিনা তা নীরিক্ষা করেছে। তাদের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রাহক টিপু সুলতান জাল রেকর্ডপত্র বিডিবিএলের প্রিন্সিপাল শাখায় উপস্থাপন করে তা দিয়ে গম সরবরাহ না করে অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন।

হিসাব খোলার সময় অসতর্কতা: বিডিবিএল সূত্রে জানা যায়, ঢাকা ট্রেডিং হাউসের হিসাব খোলার সময় তাদের আপ-টু-ডেট ইনকাম ট্যাক্স সার্টিফিকেট সংগ্রহ করা হয়নি। হিসাবের নথির কেওয়াইসিতে (নো ইউর কাস্টমার) টিন নম্বর সংযোজন করা হয়নি। তবে কেওয়াইসির পরিচয়দানকারী তথ্য সঠিক ছিল। কেওয়াইসি ও জাতীয় পরিচয়পত্রে টিপু সুলতানের বাবার নাম এক নয়।

সূত্র জানায়, এলসি খোলার পর ৩০ দিনের মধ্যে মালপত্র সরবরাহের কথা উল্লেখ ছিল ঋণ প্রস্তাবটিতে। এলসি খোলার পরের দিন একটি ট্রাকে ১৫ হাজার টন গম সরবরাহ ও বুঝে পাওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক।

ঋণ-সংক্রান্ত নীতিমালা মানা হয়নি: দুদকের তদন্ত থেকে জানা যায়, ব্যাংকের ক্রেডিট কমিটি ঋণ-সংক্রান্ত নীতিমালা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম-কানুন মেনে ঋণ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছিল। ঋনের বিপরীতে ব্যাংকে ছয় কোটি টাকার সিকিউরিটি মানি রাখা ও আগের পাওনা থাকলে তা পরিশোধের কথাও বলা হয়েছিল। ক্রেডিট কমিটির মতামত উপেক্ষা করে ঋণ প্রস্তাবটি অনুমোদনের সুপারিশ করে পরিচালনা পর্ষদে উপস্থাপন করা হয়েছিল। পরে ব্যাংকের পর্ষদ সভায় ঋণের অনুমোদন দেওয়া হয়।

দুদকের মামলা: সূত্র জানায়, বিডিবিএলের টাকা আত্মসাতের কিছু প্রমাণসহ টিপু সুলতান ও সংশ্নিষ্ট ব্যাংকের তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদক মামলা করে গত বছরের জুনে। এরপর শুরু হয় মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম। এই তদন্তে বেরিয়ে আসে একদিনে একটি ট্রাকে ১৫ হাজার টন গম পরিবহনের আজগুবি তথ্য-প্রমাণ। তড়িঘড়ি করে ব্যাংকের টাকা আত্মসাতের উদ্দেশ্যেই জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়। দুদকের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান মামলাটি করেছিলেন। তিনিই মামলাটি তদন্ত করে ভয়াবহ এই জালিয়াতি বের করেছেন।

শিগগির চার্জশিট: দুদক সূত্র জানায়, এই দুর্নীতির তদন্ত ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। কিছু দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন কমিশনে জমা দেওয়া হবে। এরপর কমিশন প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে চার্জশিটের অনুমোদন দেবে। চার্জশিটে ঢাকা ট্রেডিং হাউসের মালিক টিপু সুলতান, ব্যাংকের সাবেক জিএম সৈয়দ নুরুর রহমান কাদরী, এজিএম দেওয়ান মোহাম্মদ ইসহাক, এসপিও দীনেশ চন্দ্র সাহার নাম থাকছে বলে জানা গেছে।

টিপু সুলতান জেলে: ঢাকা ট্রেডিং হাউসের মালিক টিপু সুলতান ভুয়া ঋণে জনতা ব্যাংকের ১৯০ কোটি টাকা আত্মসাতের অন্য একটি মামলায় বর্তমানে জেলে আছেন। দুদকের এ মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হন ২০১৮ সালে। সূত্র: সমকাল

এ জাতীয় আরো খবর