1. [email protected] : admi2017 :
  2. [email protected] : Daily Khabor : Daily Khabor
  3. [email protected] : rubel :
  4. [email protected] : shaker :
  5. [email protected] : shamim :
বুধবার, ০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ০২:৪১ পূর্বাহ্ন

তুরস্কের লুজান শান্তি চুক্তি নিয়ে যতসব ভ্রান্ত ধারণা

ডেইলি খবর নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় সোমবার, ২২ মার্চ, ২০২১
  • ১০৭ বার পড়া হয়েছে

প্রায় একশ বছর আগে পশ্চিমাদের সঙ্গে আধুনিক তুরস্কের স্বাক্ষরিত লুজান চুক্তি নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা, জল্পনা-কল্পনা। শুধু তুরস্কেই না, বাংলাদেশেও এ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। কেউ লিখছেন ২০২৩ সালে শেষ হচ্ছে লুজান চুক্তি।

আর তখনই তুরস্কে ফিরে আসবে খিলাফত। কোনো কোনো পত্রিকা আবার লিখছে তুরস্ক তখন হবে মুসলিম পরাশক্তি আর দখল করে নিবে সিরিয়া এবং ইরাকের কিছু শহর। কেউবা বলছেন লুজানের কারণে তুরস্ক তার খনিজ সম্পদ উত্তোলন করতে পারছে না।

আসুন দেখি এগুলোর কতটুকু সত্য আর কতটুকুই বা মনগড়া?

লুজান চুক্তি কী?

লুজান চুক্তি হল ১৯২৩ সালে স্বাক্ষরিত এমন একটি শান্তি চুক্তি যার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে বর্তমান তুরস্কের সীমানা। অর্থাৎ আধুনিক তুরস্কের জন্ম এই চুক্তির মাধ্যমে।

তখন ১৯২২ সাল। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ শেষ হয়েছে কয়েক বছর আগে।কিন্তু ইউরোপর কিছু কিছু জায়গায় তখনও সংঘাত চলছে। বিশাল উসমানীয় সম্রাজ্য ভেঙে খান খান।

পশ্চিমাদের মদদে ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকায় উসমানীয়ওদের অধীন থেকে বেড়িয়ে গঠিত হয়েছে প্রায় ৪৫ টির মত নতুন রাষ্ট্র।

ইস্তান্বুলে উসমানীয়দের শেষ সুলতান অয়াহদুদ্দিন কার্যত নিষ্ক্রিয়, ক্ষমতাহীন। মিত্রশক্তিদের হাত থেকে শেষ ভূমিটুকু রক্ষায় মরণপণ লড়াই করছেন কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে একদল তুর্কি সেনা। পরাশক্তির বিরুদ্ধে কয়েকটি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতাও পেয়েছেন তাঁরা। গ্রীকদেরকেও তাড়িয়ে দিয়েছেন নিজেদের ভূখণ্ড থেকে।

২৮ অক্টোবর ১৯২২ সাল। মিত্রশক্তির পক্ষ থেকে তুর্কিদের কাছে দাওয়াত আসে বৈঠকে বসার। আহ্বান আসে যুদ্ধ সমাপ্তির জন্য,একটি শান্তি চুক্তির জন্য আলোচনায় বসার। একই বৈঠকে দাওয়াত দেওয়া হয় আঙ্কারায় কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বাধীন তুর্কি সরকারেকে এবং ইস্তানবুলে নিভু নিভু সালতানাতের সুলতানকেও। কিন্তু এই দাওয়াত আসার তিন দিনের মাথায় আতাতুর্ক সালতানাতকে বিলুপ্ত ঘোষণা করলে শান্তি চুক্তির বৈঠকে শুধুমাত্র তার নেতৃত্বাধীন সরকারের যোগ দেওয়ার পথ উম্মুক্ত হয়।

২০ নভেম্বর ১৯২২ সালে শুরু হয়ে ৮ মাস ধরে চলে দর কষাকষি। চব্বিশে জুলাই ১৯২৩ সালে স্বাক্ষরিত হয় চুক্তিটি। সুইজারল্যান্ডের লুজান শহরে স্বাক্ষরিত হয়েছিল বিধায় এর নাম হয় লুজান চুক্তি।

কারা ছিল এই চুক্তিতে?

চুক্তিতে একদিকে ছিলেন উসমানীয় সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি তুরস্কের প্রতিনিধিরা।অন্যদিকে ছিলেন ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান, গ্রিস, রোমানিয়া এবং যুগোস্লাভিয়ার প্রতিনিধিরা।

লুজান চুক্তিতে কী কী ছিল?

১. গ্রীসের সঙ্গে সীমানা নির্ধারণ করা হয় এই চুক্তির মাধ্যমে।

২. তুরস্কে বসবাসরত অমুসলিমদের সংখ্যালঘু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে তাদেরকে তুরস্কের নাগরিকত্ব দেয়া হয়।

৩. তুরস্কে বসবাসরত গ্রীক নাগরিকদেরকে গ্রীসে ফেরত নেওয়া এবং গ্রীসে বসবাসরত তুর্কি নাগরিকদেরকে তুরস্কে ফেরত আনার সিদ্ধান্ত হয়।

৪. ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং ইতালি তাদের দখলকৃত তুর্কি ভূখণ্ড ছেড়ে যায়।

৫. উসমানীয় সম্রাজ্যের যে ঋণ ছিল তা শুধু তুরস্কের উপের না চাপিয়ে বরং উসমানীয় থেকে জন্ম নেওয়া নতুন দেশগুলোর মধ্যে বণ্টন করা হয়।

৬. ৪০০ বছর ধরে চলে আসা তুরস্ক-ইরান সীমান্ত অপরিবর্তিতই থেকে যায়।

৭. তুরস্ক-সিরিয়া সীমানা নির্ধারণ: সিরিয়ার সঙ্গে সীমানা নির্ধারণ নিয়ে ২০ অক্টোবর ১৯২১ সালে ফ্রান্সের সঙ্গে তুরস্কের যে চুক্তি হয়েছিল সে অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ করা হয়।

৮. তুরস্ক-ইরাক সীমানা নির্ধারণ: ইরাক-তুরস্ক সীমানা নির্ধারণ নিয়ে ব্রিটেনের সঙ্গে লুজান চুক্তির সময়ে আলোচনা হলেও তুরস্ক ইরাকের মসুল শহরের ওপর থেকে তার অধিকার ত্যাগ না করায় লুজানে কোনো সমাধান হয়নি। তিন বছর পর ১৯২৬ সালে ব্রিটেন, তুরস্ক এবং ইরাকের মধ্যে স্বাক্ষরিত এক চুক্তির মাধ্যমে তুরস্ক মসুল শহরের ওপর থেকে তার অধিকার ছেড়ে দেয়।
৯. এজিয়ান সাগরের দ্বীপগুলোর কর্তৃত্ব বণ্টন: উসমানীয়রা ১৯১২ সালে ইতালি এবং ১৯১৩ সালে গ্রীসের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে এজিয়ান সাগরের দ্বীপগুলোকে এই দুই দেশের কাছে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। লুজান চুক্তির মাধ্যমে তুরস্ক পূর্ববর্তী এই দুই চুক্তির শর্তগুলকে মেনে নেয়। এ চুক্তির মাধ্যমে শুধুমাত্র তুরস্কের ভূখণ্ড থেকে তিন মাইলের মধ্যে যে দ্বীপগুলো আছে সেগুলো তুরস্কের হাতে আসে। বাকি দ্বীপগুলো গ্রীসের হাতে চলে যায়। ফলশ্রুতিতে এজিয়ান সাগরে গ্রীসের মূল ভূখণ্ড থেকে শত শত মাইল দূরে কিন্তু তুরস্কের খুবই কাছে থাকা সত্ত্বেও প্রায় সবগুলো দ্বীপ গ্রীসের হাতে চলে যায়।

১০. সাইপ্রাসকে ব্রিটেনের হাতে ছেড়ে দেওয়া: লুজান চুক্তির ২০ নম্বর ধারা অনুযায়ী তুরস্ক সাইপ্রাসের ওপর থেকে তার সব কর্তৃত্ব ছেড়ে দিয়ে ওখানে ব্রিটেনের কর্তৃত্ব মেনে নেয়।

সাইপ্রাস পরবর্তীতে ১৯৬০ সালে ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতা পায়। পরবর্তীতে ওখানকার তুর্কিদের উপরে অত্যাচার নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে গেলে ১৯৭৪ সালে তুরস্ক ওখানকার তুর্কি নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য সামরিক অভিযান চালিয়ে সাইপ্রাসের একটি অংশ দখল করে নেয়।

১১. তুরস্কের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত প্রণালীগুলোর কর্তৃত্ব নির্ধারণ: লুজানে যে বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় সেটি হল বসফরাস প্রণালী এবং দারদেনালিস বা চানাক্কালে প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের বিষয়টি। একটি জাহাজের ভূমধ্যসাগর থেকে কৃষ্ণ সাগরে যেতে হলে প্রথমে চানাক্কালে প্রণালী পরে বসফরাস প্রণালী ব্যাবহার করতে হয়।

লুজানে এই দুই প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে একটি আন্তর্জাতিক কমিটি করার সিদ্ধান্ত হয়। যে কমিটিতে তুরস্কও থাকবে কিন্তু তার হাতে কোনো কর্তৃত্ব থাকবে না। এছাড়াও এই দুই প্রণালীর তীরবর্তী অঞ্চলকে অস্ত্রমুক্ত রাখারও সিদ্ধান্ত হয়। এমনকি এর আশেপাশে কোন অস্ত্রধারী বাহিনীও রাখতে পারবে না তুরস্ক।

তুরস্ক এই প্রণালী দিয়ে অতিবাহিত জাহাজ থেকে এক কানাকরি টোলও আদায় করতে পারবে না বলেও সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে ২০ জুলাই ১৯৩৬ সালে সুইজারল্যান্ডের মন্ট্রেক্স শহরে তুরস্ক, ব্রিটেন, ফ্রান্স, বুলগেরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, গ্রীস, জাপান, রোমানিয়া, সোভিয়েত রাশিয়া, এবং যুগোস্লাভিয়ার মধ্যে এই প্রণালীদুটি নিয়ে আরেকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে প্রণালীগুলোর কর্তৃত্ব পুরোপুরি তুরস্কের কাছে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তুরস্ক এগুলো দিয়ে অতিবাহিত কোন জাহাজ থেকে টোল নিতে পারবে না। শুধু মাত্র মেইন্টেন্সের জন্য নামমাত্র কিছু টাকা নিতে পারবে।এই চুক্তিটি প্রতি বিশ বছর পরে নবায়ন হয়। সর্বশেষ নবায়ন হয়েছে ২০১৬ সালে। অর্থাৎ এই চুক্তিটি ২০৩৬ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
লুজান চুক্তি নিয়ে যতসব ভ্রান্ত ধারণা

এক. এই চুক্তি ১০০ বছর পরে শেষ হয়ে যাবে।

এই চুক্তিপত্রে এমন কোনো ধারা নেই যেখানে লেখা আছে লুজান চুক্তি ১০০ বছর পরে শেষ যাবে। এমনকি গোপন কোন ধারাও নেই। এনিয়ে তুরস্কের সব বিখ্যাত ইতিহাসবিদরাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে লুজান চুক্তি ১০০ বছর পরে শেষ হওয়া নিয়ে কোথাও কিছু লেখা নেই। এগুলো সব মনগড়া, বানোয়াট এবং গুজব।

দুই. এই চুক্তির কারণে তুর্কিরা তাদের খনিজ সম্পদ উত্তোলন করতে পারছে না। লুজান চুক্তির কোথাও তুর্কিদের খনিজ সম্পদ নিয়ে কোনও কিছু লেখা নেই। আর তুর্কিদের খনিজ সম্পদ উত্তোলনের ওপরে কোনও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাও নেই। তুর্কিরা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী খনিজ সম্পদ উত্তোলন করছে। এর মধ্যে আছে স্বর্ণ, তেল, গ্যাস, বোরন ও কয়লা।

তিন. এই চুক্তির কারণে তুর্কিরা বসফরাস এবং চানাক্কালে প্রণালীর টোল আদায় করতে পারছে না।

এই চুক্তির কয়েক বছর পরে মন্ট্রেক্স চুক্তি নামে আরেকটি চুক্তি হয়েছিল সেটির কারণে টোল আদায় করতে পারছে না। এবং সেই চুক্তিটিও কমপক্ষে ২০৩৬ সাল পর্যন্ত বলবত থাকবে। সুতরাং ততদিন পর্যন্ত টোল আদায়ের বিষয়টির কোনও সুরহা হবে না।

চার. এই চুক্তি শেষ হলে তুরস্ক সিরিয়ার রাক্কা এবং আলেপ্পো শহরগুলো দখল করে নেবে।

যেহেতু চুক্তি শেষ হওয়ার কোনো সম্ভবনা নেই। তাই সিরিয়ার এই শহরগুলো দখলেরও কোন বিষয় নেই। আর তুরস্ক ইতিমধ্যেই সিরিয়ায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির অনেকখানি অঞ্চল তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে।

পাঁচ. এই চুক্তি শেষ হলে ইরাকের মসুল শহর তার দখলে নিয়ে নেবে তুরস্ক।

না, তুরস্কের দ্বারা মসুল শহর দখলের কোন সম্ভাবনা নেই। তবে, ইরাকের উত্তরাঞ্চলে ঘাঁটি গেড়ে থাকা পিকেকে সন্ত্রাসী সংগঠনটির বিরুদ্ধে তুরস্ক কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন সময় সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছে। কিছুদিন আগে সে অভিযান আরও ব্যাপকভাবে শুরু করছে কিন্তু তা মসুল শহর থেকে অনেক দূরে। আর এ বিষয় নিয়ে ইরাক সরকারের সঙ্গেও ভালো যোগাযোগ আছে আঙ্কারার।

ছয়. ২০২৩ সালে তুরস্কে খিলাফত ফিরে আসবে।

এ বিষয়টিও আসলে এখনও পর্যন্ত গুজব। আর তুরস্ক-বিদ্বেষীদের পশ্চিমা বিশ্বে এবং সেক্যুলারদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করার জন্য রটিত কিছু কাল্পনিক থিওরি। যে খিলাফত চলে গেছে সে আর আসবেনা ফিরে।এমনকি, এ নিয়ে তুরস্কের ক্ষমতাসীনদের মধ্যেও কোনও ভাবান্তর নেই।

সাত. আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো এমনিতেই ১০০ বছর পরে শেষ হয়ে যায়এটি একটি প্রচলিত রীতি।

একথাটিও সঠিক না। কারণ, বিশ্বে এখনও অনেক আন্তর্জাতিক চুক্তি আছে যেগুলো একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে বলবৎ আছে। সুতরাং আমরা বলতে পারি, লুজান চুক্তি ২০২৩ সালে শেষ হচ্ছে না। আর লুজান চুক্তি নিয়ে মুখরোচক অনেক কথাই সঠিক না। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে,লুজান চুক্তিটি একটি শান্তি চুক্তি আর শান্তি চুক্তি শেষ হয় কেবল যুদ্ধ শুরু হলে।

বিজ্ঞাপন

এ জাতীয় আরো খবর