1. [email protected] : admi2017 :
  2. [email protected] : Daily Khabor : Daily Khabor
  3. [email protected] : shaker :
  4. [email protected] : shamim :
বুধবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:২২ পূর্বাহ্ন

দেশী ৫ হাজার বিদেশযাত্রীদের ১০০ ডলারে মিলতো ভুয়া সনদ

ডেইলি খবর নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২০
  • ১০৭ বার পড়া হয়েছে

বিশেষ প্রতিনিধি: জেকেজির লোকেরা বাসা থেকে ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার ৬০০ টাকার বিনিময়ে নমুনা সংগ্রহ করছিলেন। তারা টাকার বিনিময়ে ভুয়া প্রতিবেদন দিচ্ছিলেন। এজন্য অপরাধের দায়ে জেকেজির চেয়ারম্যান ও জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের কার্ডিয়াক সার্জন সাবরিনা আরিফ চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর আগে তাদের লোকজনের ল্যাপটপে বিপুল সংখ্যক করোনা নেগেটিভ ভুয়া সনদের কপি বিতরণের তথ্য পায় পুলিশ।

তেজগাঁও বিভাগের পুলিশের উপ-কমিশনার হারুন অর রশিদ রোববার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, সোমবার সাবরিনাকে আদালতে নেওয়া হবে। আদালতের কাছে সাবরিনার পুলিশ রিমান্ডে নেয়ার আবেদন করবে। জিজ্ঞাসাবাদের পর এই ঘটনায় আর কে কে জড়িত রয়েছেন সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা সম্ভব হবে।

হারুন অর রশিদ বলেন, এর আগে করোনাভাইরাস পরীক্ষার নামে জালিয়াতির অভিযোগে জেকেজির যেসব সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছেন তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাদের সবাই বলেছেন সাবরিনাই জেকেজির চেয়ারম্যান। তাছাড়া তেজগাঁও কলেজে জেকেজির বুথে হামলার অভিযোগ উঠলে সাবরিনাই প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র হিসেবে সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য দেন। অভিযানের একদিন আগে তিনি নিজে প্রতিষ্ঠান থেকে সরে যান। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি কখনই কোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের দায়িত্বপালন করতে পারেন না।

নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা নিয়ে যে ঘটনা ঘটেছে সাবরিনা তার দায় এড়াতে পারেন না বলেও মন্তব্য করেন হারুন অর রশিদ। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা তার সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছেন। এর আগে হারুন অর রশিদ বলেন, সাবরিনার স্বামী আরিফুল হক চৌধুরীকে যে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, সাবরিনাকেও সেই একই মামলার আসামি করার প্রক্রিয়া চলছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে নমুনা সংগ্রহ করার চুক্তি করেছিল জোবেদা খাতুন সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (জেকেজি হেলথকেয়ার)। বাসা থেকে ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার ৬০০ টাকার বিনিময়ে তারা নমুনা সংগ্রহ করছিলেন এবং ভুয়া প্রতিবেদন দিচ্ছিলেন। একজন ভুক্তভোগীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তেজগাঁও বিভাগের পুলিশ প্রথমে সাবরিনা আরিফ চৌধুরীর স্বামী আরিফুল হক চৌধুরীসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে।

জালিয়াতির খবর প্রচার হওয়ার পর থেকে সাবরিনা আরিফ চৌধুরী এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেন। পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দেন। তিনি বলেন, সরকারি চাকরির বাইরে তিনি শুধু কিছুদিন ওখানে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েছেন। জালিয়াতির ঘটনার আঁচ পেয়ে সরে আসেন। নিজেকে বাংলাদেশের প্রথম কার্ডিয়াক সার্জন দাবি করা (আদতে তিনি প্রথম নন) এই নারী পরে নিজের নামও বদলে ফেলেন। আদতে তার নাম সাবরিনা শারমিন হোসেন হলেও তিনি তার স্বামীর উপাধি ব্যবহার করছিলেন। গ্রেপ্তারের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের নাম বদলে রাখেন সাবরিনা মিষ্টি চৌধুরী। তিনি স্বামীর বিরুদ্ধে তাকে নির্যাতনের অভিযোগও তোলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চিকিৎসা পেশার বাইরে তিনি ওভাল গ্রুপ লিমিটেড নামে একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্মেরও চেয়ারম্যান ছিলেন। এর প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন আরিফুল হক চৌধুরী। জালিয়াতির মামলায় গ্রেপ্তার বাকি চারজন হলেন হুমায়ুন কবীর, তার স্ত্রী তানজীনা পাটোয়ারী, সাইদ চৌধুরী ও আলমান। এর মধ্যে হুমায়ুন ও তানজীনা একসময় জেকেজিতে কর্মরত ছিলেন। এখন তারা নিজেরাই নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা ছাড়াই ফল দেন। বাকি দুজন এখনো জেকেজিতে কর্মরত।

শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, জেকেজি তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জেকেজি ওভাল গ্রুপ অব লিমিটেডের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। তারা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান স্বাস্থ্য সেবা সপ্তাহ উদযাপনের কাজ পায়। এমনকি পেশাজীবী চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) বিভিন্ন অনুষ্ঠানেরও টাকার বিনিময়ে আয়োজন করত। এদিকে তদন্তকালে জেকেজির এক ল্যাপটপেই করোনার তিন শতাধিক সনদ পায়, সত্যতা যাচাই করছে পুলিশ।

পুলিশ জোবেদা খাতুন সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার (জেকেজি হেলথকেয়ার) গুলশানের কার্যালয় থেকে জব্দ করা একটি ল্যাপটপ থেকেই তিন শতাধিক করোনা শনাক্তের সনদ পেয়েছে। এগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সনদে যে পরীক্ষাকেন্দ্রের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে যোগাযোগ করছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। নমুনা সংগ্রহের পর এই সনদগুলো পরীক্ষা ছাড়াই তৈরি করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করছেন তারা।

এদিকে পরীক্ষা ছাড়াই করোনা শনাক্তের ফল দেওয়ার অভিযোগে গত মঙ্গলবার জেকেজির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আরিফুল হক চৌধুরীসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে তেজগাঁও থানা পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়া জেকেজির সাবেক কর্মী হুমায়ুন কবীর ও তার স্ত্রী তানজীনা পাটোয়ারি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন পরদিন। বাকি চারজন আরিফুল হক চৌধুরী, জেকেজির প্রধান উপদেষ্টা সাঈদ চৌধুরী, আইটি কর্মকর্তা বিপ্লব দাস ও অফিস সহকারী আলামিনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুদিনের রিমান্ডে আনে পুলিশ।

তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামাল উদ্দীন জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জেকেজিকে শুধু বুথের মাধ্যমে করোনাভাইরাসের নমুনা শনাক্ত করে সরকার অনুমোদিত পরীক্ষাগারে পাঠানোর অনুমতি দিয়েছিল। সেই পরীক্ষাগার থেকেই করোনা শনাক্তের সনদ সেবাগ্রহীতাদের পাঠানোর কথা। এখানে সনদ দেওয়ার সঙ্গে জেকেজির কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। তারপরও তাদের একটি ল্যাপটপে তিন শতাধিক সনদ পাওয়া গেছে। এগুলোর সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। এর আগে হুমায়ুন কবিরের ল্যাপটপে পাওয়া ৩৭টি করোনা পরীক্ষার সনদ ভুয়া বলে জিজ্ঞাসাবাদে নিশ্চিত হয়েছেন তারা।

তেজগাঁও থানা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কল্যাণপুরের একটি বাড়ির তত্বাবধায়ক কামাল হোসেনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে হুমায়ুন কবীর ও তার স্ত্রীকে প্রথম গ্রেপ্তার করা হয়। হুমায়ুন কবীর ছিলেন জেকেজির গ্রাফিক ডিজাইনার। আর তানজীনা রাজধানীর পান্থপথের ন্যাশনাল নার্সিং ইনস্টিটিউটের ইনস্ট্রাক্টর ছিলেন। সেখান থেকে জেকেজির চিফ নার্সিং অ্যাডভাইজার পদে যোগ দেন। তারা দুজনই গত ১২ এপ্রিল জেকেজি থেকে চাকরি ছেড়ে চলে আসেন।

তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহের জন্য জেকেজি বুকিং বিডি ও হেলথ কেয়ার নামে আরও দুটি প্লাটফর্ম চালু করে। সেবাগ্রহীতাদের যোগাযোগের জন্য পাঁচ-ছয়টি হটলাইন নম্বর চালু করেছিল তারা। করোনার উপসর্গ থাকা ব্যক্তিরা এই নম্বরেই বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহের জন্য জেকেজির সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। নমুনা সংগ্রহ বাবদ সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকে ১০০ ডলার বা ৮ হাজার ৬০০ টাকা নেওয়া হতো।

ওসি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে হুমায়ুন ও তানজীনা দাবি করেছেন জেকেজির সিইও আরিফুল হক তাদের এই কাজে বাধ্য করেছেন। চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর হুমায়ুনকে জেকেজিতে আটকে রাখা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে কাজ করতে রাজি হলে তাকে ছাড়া হয়।

ওসি বলেন, নমুনা সংগ্রহের সময় তারা রোগীর উপসর্গ লিখে আনতেন। এরপর সংগৃহীত নমুনা রাস্তায় ফেলে দিতেন। পরে রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী প্রতিবেদন তৈরি করে তা পাঠিয়ে দিতেন।

মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা তেজগাঁও অঞ্চলের সহকারী কমিশনার মো. মাহমুদ বলেন, হুমায়ুন গ্রাফিক ডিজাইনার হওয়ায় রিপোর্ট তৈরির কাজ তিনিই করতেন। তিনি নিজেও সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে একটি বলয় তৈরি করে ফেলেছিলেন। তার ব্যক্তিগত নম্বরে তারা যোগাযোগ করতেন। তাদের যেদিন গ্রেপ্তার করা হয়, সেদিনও পাঁচজনের নমুনা সংগ্রহ করেছেন এই দম্পতি।

সহকারী কমিশনার মো. মাহমুদ সংবাদ মাধ্যমকে আরো বলেন, অনুমতি না থাকা সত্বেও বাড়ি থেকে নমুনা সংগ্রহের কাজ শুরু করেছিলেন জেকেজির সিইও আরিফুল হক চৌধুরী। পুরো বিষয়টি তিনিই তদারক করতেন। একাধিক সূত্র জানায়, জেকেজির সিন্ডিকেটের সদস্যরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সাথে যোগসাজসে তারা অবাধে এসব সমাজবিরোধী কাজ চালিয়ে আসছিলো।

বিজ্ঞাপন

এ জাতীয় আরো খবর