1. [email protected] : admi2017 :
  2. [email protected] : Daily Khabor : Daily Khabor
  3. [email protected] : shaker :
  4. [email protected] : shamim :
বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর ২০২১, ১১:২৮ পূর্বাহ্ন

পররাষ্ট্রনীতিতে এখন বাঁক বদলের সময়

ডেইলি খবর নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় সোমবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ৬৭ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা হচ্ছে- ‘সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কোনো দেশের সঙ্গেই বৈরিতা নয়।’ এ ধরনের রাষ্ট্রীয় পররাষ্ট্রনীতির উৎস হল- গত শতাব্দীর ষাটের দশকের জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন। পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে এ জোটটি এখন খুঁড়িয়ে খঁড়িয়ে চলছে।

তবে এখনও সেই জোটনিরপেক্ষ নীতিমালার আলোকেই চলছে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি, চীনের পুঁজিবাদী বিকাশ, যুক্তরাষ্ট্রের জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্বে মুক্তরাজার অর্থনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশে আরব বসন্তের প্রভাবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে বিশ্ব পরিস্থিতিতে বর্তমানে বড় পরিবর্তন এসেছে।

এর অভিঘাতে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রনীতি ঢেলে সাজানো হয়েছে। রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে মিত্রতা ও বৈরিতার পুরনো বয়ান, দৃষ্টিভঙ্গি ও কূটনীতি পাল্টে গেছে। মানুষের জীবন ভাবনা ও মনমানসিকতায় এসেছে লক্ষণীয় পরিবর্তন।

তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। আমাদের রাষ্ট্রিক কূটনীতির ভরকেন্দ্র পূর্বমুখী না পাশ্চাত্যমুখী হবে- এ বিষয়ে নানা ধাঁচের কথাবার্তা বুদ্ধিজীবী মহলে মাঝে মধ্যে শোনা যায়; কিন্তু বিষয়টি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী মহলে কোনো ধরনের গুরুত্ব পায় বলে মনে হয় না।

বর্তমানে এশিয়ার ভূরাজনীতিতে চীন-ভারত দ্বন্দ্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের চীনবিরোধী কট্টর মনোভাব বাংলাদেশের জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতিকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

এখানে বলে রাখা ভালো, যুক্তরাষ্ট্রের নৌশক্তির ৬০ শতাংশ ইতোমধ্যে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে মোতায়েন হয়েছে। দেশটি এখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি রাষ্ট্রিক জোট গঠনের পদক্ষেপ নিয়ে এগোচ্ছে। সেই জোটে বাংলাদেশকেও সঙ্গে চাইছে। সে লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন ই বিগান ঢাকা সফর করে গেছেন।

সফরকালে তিনি ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাগ্রিমেন্ট বা অ্যালায়েন্সের ব্যাপারে বাংলাদেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এবং আশা ব্যক্ত করেছেন, বাংলাদেশ এ জোটে শরিক হোক। এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ ইন্দোনেশিয়া, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, পাকিস্তান ও ভিয়েতনাম।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বন্ধু ও সামরিক মিত্র। তবে পাকিস্তানের সঙ্গে এখন যুক্তরাষ্ট্রের শীতল সম্পর্ক যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এ ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রকে নাকি চীনকে বেছে নেবে, তা এখনই বলার সময় হয়নি।

এ ইস্যুতে পাকিস্তানে ক্ষমতার পরিবর্তনও হতে পারে। কারণ সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়া পাকিস্তানের কোনো শাসকই টিকতে পারবেন না। যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের কথা না শুনলে পাকিস্তান-রাষ্ট্র অস্তিত্ব সংকটে পড়বে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের এখন পর্যন্ত যে তুরস্কপ্রীতি এবং পুরনো প্যান-ইসলামিক ঝোঁক, তা দেশটিকে রাশিয়ার কাছেও গ্রহণযোগ্য করবে না। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের রণাঙ্গনে রাশিয়া শিয়া-ইরান ও সিরিয়ার সমর্থক, সুন্নি তুরস্ক এক্ষেত্রে রাশিয়ার প্রতিপক্ষ।

তাছাড়া পাকিস্তান এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে আফগানিস্তানের মাটিতে রুশ সেনাদের মারাত্মক গ্যাঁড়াকলে ফেলে সামরিক পরাজয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। তাই এখনকার জবরদস্ত রুশ জাতীয়তাবাদী ভ­াদিমির পুতিনের প্রশাসন এবং রুশ সেনা-আমলাতন্ত্র ওই পরাজয়ের গ্লানি সহজে ভুলবে বলে মনে হয় না। এসব কারণে বলছি, পাকিস্তানের পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকা ছাড়া উপায় থাকবে না।

জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের সময়ে দুর্বল সামরিক শক্তির দেশগুলোর নির্দোষ, নির্দ্বন্দ্ব ও নিরীহ পররাষ্ট্রনীতির কোনো উপযোজ্যতা বিশ্বরাজনীতিতে এখন কি আছে? আমার বিবেচনায় নেই। সে কারণে বিশ্বরাজনীতিতে এখন কূটনৈতিক পক্ষ নিতে হবে শক্ত-সামর্থ্য রাষ্ট্রের সঙ্গে।

নিজে দুর্বল বলে অন্য সব দুর্বল রাষ্ট্রের অকেজো দঙ্গলের সঙ্গে জড়িয়ে থেকে কোনো লাভ হবে না। ব্যবসা-বাণিজ্য, সমরশক্তি, প্রতিবেশী অবিবেচক রাষ্ট্রের সঙ্গে সমস্যা সমাধান এবং নিজ দেশে উন্নয়নের ছক্কা মারতে হলে বিশ্বরাজনীতি এবং এশিয়া-প্যাসিফিক জোটের রাজনীতিতেও শক্তিধর রাষ্ট্রের সঙ্গে থাকতে হবে এবং সেটি যুক্তরাষ্ট্র। এ ক্ষেত্রে আমি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর যুগোত্তীর্ণ কথাটি স্মরণ করব।

পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ প্রশ্নে বামপন্থীদের বিরোধিতার জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘জিরো প্লাস জিরো, ইকুয়াল টু জিরো।’ তার এ বাণী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বাঁক বদলের এ ক্রান্তিলগ্নে বিরাট মূল্য বহন করে বলে আমার বিশ্বাস। তার এ কথা বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে আগামী দিনে পররাষ্ট্রনীতি নবায়নের ক্ষেত্রে দিশারি হিসেবে পথ দেখাবে বললে অত্যুক্তি হবে না।

বাংলাদেশ নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত। জনসংখ্যার চাপে দেশটি এখন ডুবন্ত নৌকার মতো। এ জনসংখ্যার বিরাট অংশ অদক্ষ ও আধুনিক শিক্ষাহীন। সমাজ মনন এখনও ইউরোপীয় রেনেসাঁর তুলনায় প্রায় মধ্যযুগে আছে। সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী ও নানা ধরনের আদি ভৌতিক চিন্তা-চেতনায় আকীর্ণ আমাদের সমাজ।

এ সমাজের যারা উচ্চশিক্ষিত ও ক্ষমতাবান তারাও ব্যস্ত আছেন নানাবিধ দৃষ্টিকটু কর্মকাণ্ডে। এর ব্যতিক্রম নেই বলছি না; কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্রের দেহে যেখানে এত সমস্যা এবং অন্ধকারের কারসাজি, সেখানে ব্যতিক্রমী আলোক শিখা ঘন কুয়াশায় ঢাকা পড়ে যায়। এমনি এক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ঘাড়ে সিনবাদের দৈত্যের মতো চেপে বসেছে রোহিঙ্গা সমস্যা। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে জাতিগত ও ধর্মীয় হিংসার শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে কমবেশি ১২ লাখ রোহিঙ্গা।

এ সমস্যার সমাধান করা সরকারের কাছে আশু করণীয় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে বাংলাদেশের উন্নয়ন ঠিকাদার চীন রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আশার বাণী শোনাচ্ছে বার বার; কিন্তু এ ব্যাপারে বাস্তব সুফল কিছু দেখছি না।

এ ছাড়া আমাদের মিত্র দেশ ভারত, মিয়ানমারের ফ্যাসিবাদী শাসকদের কাছে ব্যবসা-বাণিজ্যের দরকষাকষি নিয়েই ব্যস্ত। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং অস্ট্রেলিয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা নিয়ে জোর গলায় কথা বলেছে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ফেরত নেয়ার প্রশ্নে বলিষ্ঠ কূটনৈতিক ভূমিকা রেখেছে।

গাম্বিয়ার মতো ছোট্ট দেশ বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ইস্যুকে যে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (আইসিজে) নিয়ে গেছে, সেখানেও সাহস ও সমর্থন জুগিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং এর আন্তর্জাতিক মিত্ররা।

বাংলাদেশের রেমিটেন্স আয়, পোশাকশিল্পের ক্রেতা এবং অভিবাসন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াকেন্দ্রিক। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের ৯৭ শতাংশ যায় বিনা শুল্কে। কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া পাশ্চাত্য ভাবধারার দেশ, যুক্তরাষ্ট্রের আদর্শিক মিত্র।

এসব দেশ ও মহাদেশে বাংলাভাষী এবং বাংলাদেশি বংশের অভিবাসীরা বাস করছেন অন্তত তিন প্রজন্ম ধরে। এ অভিবাসীরা সেসব দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছেন।

অনেকে আইন সভার সদস্য, স্থানীয় প্রশাসনে জনপ্রতিনিধি হয়েছেন। অনেকে কমিউনিটি পর্যায়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারহীন চীনে বিদেশি বংশের কারও জন্য এ ধরনের সামাজিক ক্ষমতায়ন এবং সুযোগ পাওয়ার কথা কি কল্পনা করা যায়! এ ছাড়া সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে আমাদের দেশের শ্রমশক্তির বাজার রয়েছে, সেসব দেশও পাশ্চাত্যমুখী এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র।

আমাদের বর্তমান প্রজন্ম মেধাবী ও কারিগরি কর্মকৌশলে দক্ষ এবং ইংরেজি জানা মানুষের কর্মসংস্থান ও অভিবাসনের জন্য বেছে নিতে হবে যুক্তরাষ্ট্র এবং পাশ্চাত্যকে। অন্যদিকে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরও গতিশীল করা, নারীর ক্ষমতায়নের চলমান ধারা অব্যাহত রাখা এবং মৌলবাদী-জঙ্গিদের সমাজ থেকে নির্মূল করতে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের দেশগুলোর সঙ্গে একযোগে কাজ করতে হবে। সেজন্য পাশ্চাত্যের সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান ও শিক্ষা দরকার।

ঠিক একইভাবে দরকার যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য দেশগুলোর সঙ্গে আরও গভীর কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়। সে সম্পর্কের সোনালি দুয়ার উন্মুক্ত করতে যাচ্ছে ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাগ্রিমেন্ট বা অ্যালায়েন্স। যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে এ জোট গঠনের কাজ স্থগিত করবেন বলে মনে হয় না। সে কারণে বাংলাদেশকে এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাগ্রিমেন্ট বা অ্যালায়েন্সে যুক্ত হতে হবে।

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ : সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

বিজ্ঞাপন

এ জাতীয় আরো খবর