1. [email protected] : admi2017 :
  2. [email protected] : Daily Khabor : Daily Khabor
  3. [email protected] : rubel :
  4. [email protected] : shaker :
  5. [email protected] : shamim :
মঙ্গলবার, ০৪ অক্টোবর ২০২২, ১২:৪৭ অপরাহ্ন

পুলিশ কর্মকর্তার পোস্ট, ‘একটি মৃত্যুর রহস্য : বাবা কেন আসামি’

ডেইলি খবর নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ২ আগস্ট, ২০২২
  • ৩৭ বার পড়া হয়েছে

রংপুরের পীরগাছায় একটি ক্লুলেস হত্যার রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ। নানা প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে টানা সাত দিনের প্রচেষ্টায় কীভাবে একটি ক্লুলেস হত্যার রহস্য উদঘাটন সম্ভব হয়েছে, তা ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন রংপুর জেলার সহকারী পুলিশ সুপার (সি সার্কেল) আশরাফুল আলম পলাশ।

জানা গেছে, রংপুরের পীরগাছায় গত ২৫ জুলাই বৈদ্যুতিক খুঁটির মাটি খুঁড়ে অজ্ঞাত এক তরুণীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তালুক ঈশাদ নয়াটারি গ্রাম থেকে উদ্ধার হওয়া লাশটি শুরুতে অজ্ঞাত পরিচয়ের হলেও পরে নাম- পরিচয় শনাক্ত হয়।

নিহতের নাম লিপি বেগম (২৫)। তিনি একই উপজেলার অনন্তরাম বড়বাড়ী গ্রামের রফিকুল ইসলামের মেয়ে। তিনি ঢাকায় থাকতেন এবং মাঝে-মধ্যে গ্রামের বাড়িতে আসতেন। ঘটনার কিছু দিন আগে (ঈদুল আজহার সময়ে) ঢাকা থেকে একেবারে চলে আসেন। এরপর গত ২৫ জুলাই সোমবার বাড়ি থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে একটি খেতে থাকা বৈদ্যুতিক খুঁটির মাটি খুঁড়ে তার পুঁতে রাখা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ওই তরুণীর বাবা রফিকুল ইসলাম লাশ শনাক্তের পর নিজে বাদী হয়ে পীরগাছা থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।

ক্লুলেস এই হত্যার রোমহর্ষক রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। যে বাবা নিজেই বাদী হয়ে মেয়ে হত্যার বিচার দাবি করে মামলা করেছিলেন, পুলিশের তদন্তে এখন তিনিই আসামি। ঘটনার দীর্ঘ সাত দিন পর হত্যার নেপথ্যের কারণ উন্মোচনে সফল হয়েছে রংপুর জেলা পুলিশ।

রোদ-বৃষ্টি ও নানা সমীকরণে টানা সাত দিনের প্রচেষ্টায় কীভাবে ক্লুলেস এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন সম্ভব হয়েছে, তা জানিয়েছেন রংপুর জেলার সহকারী পুলিশ সুপার (সি সার্কেল) আশরাফুল আলম পলাশ।

সোমবার (১ আগস্ট) দিবাগত রাত ১২টা ১৮ মিনিটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের আইডিতে ‘আলহামদুলিল্লাহ, টানা ৭ দিনের পরিশ্রম স্বার্থক’ শিরোনামে তিনটি ছবিসহ একটি পোস্ট দিয়েছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।

ফেসবুকে দেওয়া তার পোস্টটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

‘গত সপ্তাহের কথা। বউকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছি, এমন সময় খবর এলো পীরগাছায় ধানখেতে পুঁতে রাখা একটি অজ্ঞাতনামা অর্ধগলিত তরুণীর লাশ পাওয়া গেছে। বাধ্য হয়ে অসুস্থ স্ত্রীকে রেখেই পীরগাছার উদ্দেশে রওনা হলাম।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি লাশ অনেকটা পচে গেছে, দুর্গন্ধে চারপাশ ভারী হয়ে গেছে। কিন্তু পুলিশের কাজ এসব নিয়েই। সবাই যখন লাশের গন্ধে দূরে নাক সিটকায়, তখন আমরা লাশের কাছে গিয়ে আলামত খুঁজি, মৃত্যুর কারণ খুঁজি।

যাই হোক ইতোমধ্যে সিআইডির টিম এসেছে। সিআইডির টিমের সহায়তায় আঙুলের ছাপ নেওয়ার চেষ্টা করেও ছাপ নেওয়া গেল না। চ্যালেঞ্জ হলো ভিকটিমের পরিচয় শনাক্ত করা। স্থানীয় সোর্স, মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহায়তায় কিছুক্ষণের মধ্যেই লাশের পরিচিতি মিলল। বিভিন্ন আলামত মিলিয়ে আমরা আইডেন্টিটি কনফার্ম করলাম। এবার খুনের কারণ ও রহস্য উদঘাটনের পালা।

তরুণীর বাবা বাদী হয়ে মামলা করলেন। একেবারেই ক্লুলেস মামলা। আত্মীয়-স্বজন কেউই মৃত্যুর কোনো কারণ বলতে পারলেন না। তবে পুলিশের কাজ হলো ক্লু খুঁজে বেড়ানো। ঘটনাস্থলের আশপাশে পানি ও কাঁদা, একেবারে ধানখেত। সেই কাঁদা মাটিতে পুলিশের টিম ভাগ হয়ে গরু খোঁজা শুরু করলেন। এভাবে চারপাশ চষে একটু দূরে একটা ক্লু পাওয়া গেল। এবার সেই ক্লু নিয়ে আগানোর পালা। কিন্তু এই ক্লু দুই দিকে যায়, তাই দুটি প্ল্যান তৈরি করা হলো।

তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় টানা দুদিন ‘প্ল্যান এ’ এক্সিকিউট করা হলো। কিন্তু রেজাল্ট এলো নেগেটিভ। তবে সেখান থেকে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলল। সেগুলো ‘প্ল্যান বি’ কে স্ট্রং সাপোর্ট দিলো। কিন্তু প্ল্যান বি অনেক সেনসেটিভ, হুট করেই সেদিকে এগোনো যায় না।

তিনি লিখেছেন, কিছু দিন আগে তিস্তা নদীর পাশে এক আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে গিয়ে জাল দিয়ে মাছ ধরা শিখেছিলাম। জাল ফেলে চুপচাপ থাকতে হয়, মাছের ঝাঁক এলেই হ্যাচকা টানে ওপরে জাল তুলতে হয়। এক্ষেত্রে টাইমিং একটা অনেক বড় ফ্যাক্ট। আমরাও ‘প্ল্যান বি’র জন্য জাল বিছিয়ে রেখেছি। শুধু অপেক্ষার পালা কখন সে ভুল করে জালে পা দেয়। টিম পীরগাছা ও ডিবির সদস্যদের নিয়ে যৌথভাবে লেগে আছি এই অপেক্ষায়। খুব সেনসেটিভ কেস, সিনিয়র স্যাররা ক্লোজ মনিটর করছেন, গাইডলাইন দিচ্ছেন। আর আমরা মাঠে।

খুনি জালের আশপাশে হাঁটে, কিন্তু ধরা দেয় না। আমরাও হাল ছাড়ি না। আকাশে মেঘ ডাকে, বৃষ্টি হয়, বজ্রপাত হয়, এমনকি ভূমিকম্পও হয়, তবু আমরা অপেক্ষায় থাকি। দুই একবার জাল ফসকেও যায়। চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়ে, আবার জাল বিছানো হয়। অবশেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। জালে ধরা দেয় খুনি। চলে নিবিড় জিজ্ঞাবাসাদ। মুখ খোলেন খুনি। বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। খুনির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধার হয় আলামত। ইতোমধ্যে বেশ কিছু পারিপার্শ্বিক এভিডেন্সও কালেক্ট করা হয়। সব মিলে আদালতে পাঠানো হলে সেখানে খুনি স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

ওই পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সব গল্প সুখের থাকে না, যেমন এই গল্পটা। এই গল্পে খুনি বাবা, হত্যার শিকার তরুণী মেয়ে। মামলার বাদী বাবা হয়ে যায় আসামি। মেয়ের অস্বাভাবিক জীবন থামাতে, সমাজের কলঙ্ক থেকে বাঁচতে, বাবার দায় মেটাতে, কখনো বাবার হাতে কন্যার প্রাণ দিতে হয়। এমন ট্র্যাজেডি কী শুনতে ভালো লাগে? তাই ওই বাবা যখন নিজের মেয়েকে খুনের কথা কাঁদতে কাঁদতে বর্ণনা করেছিলেন, আমাদের চোখেও জল আসে, গল্প শুনে সারা শরীরের লোম কাটা দিয়ে ওঠে।
আমরাও মানুষ। পেশার খাতিরে হয়তো আমাদের এমন ট্র্যাজেডির অংশ হতে হয়, তবে আমাদেরও কষ্ট হয়। তাই এমন খুন আর খুনির গল্প আর শুনতে চাই না, আপনাদেরও শোনাতে চাই না।

ধন্যবাদ টিম পীরগাছা ও টিম ডিবিকে টানা ৭ দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে এরকম একটি ক্লুলেস চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন, আলামত উদ্ধার, আসামি গ্রেপ্তার ও আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের জন্য। ধন্যবাদ এসপি স্যার ও আলফা-২ স্যারকে সারাক্ষণ মনিটরিং করার জন্য, প্রেরণা দেওয়ার জন্য ও গাইডলাইন দেওয়ার জন্য। বিশেষ কৃতজ্ঞতা মা ও স্ত্রীকে, যাদের অসুস্থতা থাকা সত্ত্বেও পাশে থাকতে পারিনি, কিন্তু এরপরও সাপোর্ট দিয়ে গেছে নিরন্তর।

এএসপি আশরাফুল আলম পলাশ বলেন, মেয়ের অসামাজিক কার্যকলাপে অতিষ্ঠ হয়ে তাকে খুন করে লাশ পুঁতে রাখেন বাবা রফিকুল। মে বিবাহ বিচ্ছেদের পর অস্বাভাবিক জীবন শুরু করে। নেশা ও অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে গ্রামে অনেক সালিস ও বিচার হয়। সর্বশেষ গত ঈদুল আজহায় মেয়ে ঢাকা থেকে বাড়িতে এলে রফিকুল জানতে পারে, মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা।

এরপর দিশেহারা হয়ে গত ২২ জুলাই শুক্রবার রাত ১টার দিকে লিপিকে ঘুমন্ত অবস্থায় গলায় পা দিয়ে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলেন। তারপর পাশের ধানখেতে পুঁতে রাখেন। কিন্তু দুদিন পর রফিকুল ভয় পান যে লাশ যদি কেউ দেখে ফেলে, তাই সেই লাশ টেনে নিয়ে আরও দূরে গিয়ে পুঁতে রাখেন।

মেয়ের অসামাজিক কাজে অতিষ্ঠ হয়ে এই কাজ করেছেন বলে আদালতে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বাবা। বিচারক সবকিছু শুনে রফিকুলকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

বিজ্ঞাপন

এ জাতীয় আরো খবর