1. [email protected] : admi2017 :
  2. [email protected] : Daily Khabor : Daily Khabor
  3. [email protected] : shaker :
  4. [email protected] : shamim :
বুধবার, ২৭ অক্টোবর ২০২১, ০৯:৩৬ পূর্বাহ্ন

বরিশালের ৩১ গণকবর স্বীকৃতি পায়নি আজও

ডেইলি খবর নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় বুধবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ৬৮ বার পড়া হয়েছে

স্বাধীনতার ৪৯ বছরেও স্বীকৃতি পায়নি বরিশালের ৩১টি গণকবর। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী জেলার বিভিন্ন প্রান্তে হত্যাযজ্ঞ চালায়। এখানে রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তিবাহিনীর সহায়তায় হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।

তাদের মরদেহ ফেলে দেয়া হয়েছিল নদী, খাল থেকে শুরু করে কুয়া ও ভাগাড়ে। কোথাও কোথাও গণহত্যার পর মরদেহ মাটি চাপা দেয়া হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট তথ্যানুযায়ী, জেলার দশ উপজেলায় ৩১টি বধ্যভূমি রয়েছে। অধিকাংশ স্থানেই করা হয়নি স্মৃতিস্তম্ভ। এসব বধ্যভূমিতে ৫০ হাজারের অধিক লোক গণহত্যার শিকার হন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশাল জেলা সদরে ২টি, গৌরনদীতে ৪টি, আগৈলঝাড়ায় ৬টি, বাকেরগঞ্জে ৩টি, বানারীপাড়ায় ৪টি, বাবুগঞ্জে ২টি, উজিরপুরে ৫টি, মুলাদীতে ২টি ও মেহেন্দীগঞ্জে ৩টি বধ্যভূমির সন্ধান পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি বরিশাল সদরের পানি উন্নয়ন বোর্ডের এলাকার ভেতরে থাকা বধ্যভূমিটি সংরক্ষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বানারীপাড়ার নরেরকাঠিও স্মৃতিস্তম্ভ করা হয়েছে। গৌরনদী উপজেলার কেতনার বিল এবং উজিরপুর উপজেলার দরগাহ বাড়ি বধ্যভূমিতে নির্মিত হচ্ছে স্মৃতিস্তম্ভ।

বরিশাল জেলা মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার কেএসএ মহিউদ্দিন মানিক (বীর প্রতীক) বলেন, বরিশালে পাক হানাদার বাহিনী আসে ২৫ এপ্রিল। ওই দিন গানবোট ও হেলিকপ্টারে হানাদার বাহিনীর একাধিক গ্রুপ নগরীর স্টিমারঘাট, বিসিক ও চরবাড়িয়া এলাকা থেকে শহরে প্রবেশ করে।

২৯ এপ্রিল পাকবাহিনী শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিপরীতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওয়াপদা কলোনি দখল করে একাধিক ভবনে ক্যাম্প ও টর্চার সেল স্থাপন করে।

ওই ক্যাম্প থেকেই ঝালকাঠি, পটুয়াখালী ও ভোলায় অপারেশন চালাত পাকবাহিনী। ওয়াপদা ক্যাম্পে কত বাঙালি মুক্তিকামী নারী-পুরুষকে হত্যা ও নির্যাতন চালানো হয়েছে তার সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই কারও কাছে। বর্তমানে বধ্যভূমিটি সংরক্ষণের কাজ চলছে। এছাড়া সদর উপজেলার তালতলী ও চরকাউয়া মোসলেম মিয়ার বাড়িসংলগ্ন খালের পাড় বধ্যভূমি সংরক্ষণে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

তালতলী বধ্যভূমিতে শুধু একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করে কোনোভাবে দায়িত্ব শেষ করা হয়। চরকাউয়ায় কিছুই করা হয়নি। তবে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে একটি স্মৃতিস্তম্ভ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

আগৈলঝাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার ও উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুর রইচ সেরনিয়াবাত বলেন, ১৯৭১ সালের ১৫ মে সেনাবাহিনী আসার খবরে গৌরনদী-আগৈলঝাড়ার কয়েক হাজার নারী-পুরুষ ও শিশু-কিশোর কেতনার বিলে আশ্রয় নেয়।

ওইদিন তিনি তার বাবার সঙ্গে ওই বিলে আশ্রয় নেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পাকসেনারা সেখানে পৌঁছে মেশিনগান দিয়ে ব্রাশফায়ার করে পাখির মতো মানুষ মারতে থাকে। তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও তার বাবার শরীরে ৫টি গুলি লাগে, তিনি মারা যান।

আগৈলঝাড়া উপজেলার মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, কেতনার বিল বধ্যভূমিতে ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ কাজ চলছে। অন্যদিকে আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ফ্রান্সিস হালদারের বাড়ি, পতিহার, দক্ষিণ শিহিপাশা উপজেলার কাঠিরা ব্যাপ্টিস্ট চার্চসংলগ্ন রাজিহার রাংতা বিল বধ্যভূমি অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। গৌরনদীর একাধিক মুক্তিযোদ্ধা জানান, ’৭১ সালের ১৫ মে পাকসেনাদের আসার খবর পেয়ে বাটাজোর ইউনিয়নের হরহর মৌজার (নন্দীপাড়ার) বাড়ৈ বাড়ির পার্শ্ববর্তী জলাভূমিতে প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছিল শত শত নারী-পুরুষ ও শিশু।

কিন্তু নরপশুদের কবল থেকে সেদিন কেউই রেহাই পাননি। এছাড়া উপজেলার সহকারী পুলিশ সুপার অফিসের সামনে, গয়নাঘাটাপুল সরকারি গৌরনদী কলেজসংলগ্ন হাতেম পিয়নের বাড়ির সামনের ঘাটলা বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত হলেও আজও ওইসব স্থান সংরক্ষণে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

বাকেরগঞ্জের কলসকাঠীতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ১৪ মে ২৮০ জনকে পাশবিক অত্যাচারের মাধ্যমে হত্যা, বহু নারীর ইজ্জত হরণ এবং কয়েকজনকে ধরে নিয়ে যায়। শত শত বাড়ি ঘরে অগ্নিসংযোগ করে।

সবশেষ পাক হানাদার বাহিনী আক্রমণ করে শ্যামপুর মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে ক্যাপ্টেন নাসিরের ঘাঁটিতে। ১৫ নভেম্বর যাত্রীবাহী লঞ্চে করে বরিশাল থেকে অতিরিক্ত পাকবাহিনীর দল আসে। এরপর শ্যামপুর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প আক্রমণে হানাদার বাহিনীর অনেক সদস্য মারা যায় এবং ১২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

এছাড়া বেবাজ এলাকায় পাক হানাদার বাহিনীর আক্রমণে অনেকেই শহীদ হন। কলসকাঠীতে ব্যক্তি উদ্যোগে স্মৃতিফলক নির্মিত হলেও আর দুই জায়গা রয়েছে অরক্ষিত। ওই সময় কলসকাঠী বধ্যভূমিতে ৪ শতাধিক, বেবাজ বধ্যভূমিতে ২ শতাধিক এবং শ্যামপুর বধ্যভূমিতে ৩০ থেকে ৪০ জনকে হত্যা করা হয় বলে জানা গেছে।

বাবুগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ১৯৭১ সালে বরিশাল ক্যাডেট কলেজে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের ঘাঁটি স্থাপন করে। ক্যাডেট কলেজে তৎকালীন ওই আর্মি ক্যাম্পের পেছন দিকে প্রতাবপুর এলাকায় ছিল তাদের টর্চার সেল। সেখানে ৯ মাসের যুদ্ধের সময়ে বাবুগঞ্জ ও আশপাশের উপজেলা থেকে বিপুলসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধাসহ তাদের সহায়তাকারী ও বুদ্ধিজীবীদের ধরে এনে নির্মম নির্যাতনের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হতো। প্রতাবপুর বধ্যভূমিতে মুক্তিযোদ্ধা ও বুদ্ধিজীবীসহ বহু নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়।

অক্টোবরের একদিনেই ধরে আনা শতাধিক মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে প্রথমে ব্রাশফায়ার এবং পরে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ওই বধ্যভূমি আজও সংরক্ষণ হয়নি। এ উপজেলার রামপট্টিতে আরেকটি বধ্যভূমি রয়েছে। সেটিও সংরক্ষণ হয়নি।

বানারীপাড়ায় ২০১০ সালে সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ গাভা-নরেরকাঠি ও সৈয়দকাঠি ইউনিয়নের তালা প্রসাদ গ্রামে দুটি বধ্যভূমির সন্ধান পাওয়া যায়। এ দুটি গণকবরে রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নৃশংসভাবে নিহত ৯৮ শিশু, নারী ও পুরুষের মরদেহ মাটিচাপা দেয়া হয়। যার মধ্যে বধ্যভূমি অনুসন্ধানে নিয়োজিত তদন্তকারী পুলিশ প্রশাসন এ পর্যন্ত ৪৫ জনের নাম-পরিচয় শনাক্ত করা গেছে।

জঙ্গলঘেরা ঝোপঝাড়ের মধ্যে বধ্যভূমি দুটি অযত্ন-অবহেলায় অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। উপজেলার সদর ইউনিয়নের দুর্গম গ্রাম গাভা ও নরেরকাঠির সীমান্তবর্তী খালের উত্তরপাড়ে রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নিহত শতাধিক লাশের মধ্যে ৯৫টি মরদেহ মাটিচাপা দেয়া হয়। উজিরপুর উপজেলার বড়াকোঠা দরগাবাড়ি বধ্যভূমিতে শতাধিক মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে পাকিবাহিনী।

উত্তর বড়াকোঠা মল্লিক বাড়ি বধ্যভূমিতে চলে গণহত্যা। বড়াকোঠা মুক্তিযুদ্ধের মিলন কেন্দ্রসংলগ্ন বধ্যভূমিতে গণহত্যার শিকার হন অর্ধশত ব্যক্তি। খাটিয়ালপাড়া বধ্যভূমিতে গণহত্যার শিকার হন ১৫ থেকে ২০ জন। বড়াকোঠা চন্দ্র কান্ত হালদার বাড়ি বধ্যভূমিতে পাক হানাদার বাহিনী ১০ জনকে হত্যা করে। নারায়ণপুর বধ্যভূমিতে গণহত্যার শিকার হন অর্ধশতাধিক ব্যক্তি।

মুলাদী উপজেলার মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, পাতারচর গ্রাম বধ্যভূমিতে অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। মুলাদী নদীর দক্ষিণপাড় বেলতলা বধ্যভূমিতে কমপক্ষে ২০ জনকে হত্যা করে পাকি সেনারা। মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার মুক্তিযোদ্ধারা জানিয়েছেন, থানাসংলগ্ন বধ্যভূমিতে তিন শতাধিক ব্যক্তিকে একসঙ্গে হত্যা করা হয়।

পাতারহাট গার্লস স্কুলের দক্ষিণপাড়ের খলিল মোল্লার বাড়ির বধ্যভূমিতে ১০ থেকে ১২ জন মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করা হয়। পাতারহাট গার্লস স্কুলসংলগ্ন ব্রিজের গোড়ার বধ্যভূমিতে গণহত্যার শিকার হন শতাধিক ব্যক্তি।

এ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, এসব গণহত্যার জায়গার অনেকগুলোই এখন পর্যন্ত চিহ্নিত হয়নি। বরিশাল অঞ্চলের ‘জেনোসাইড স্টাডিজ’ প্রকল্পের গবেষক সুশান্ত ঘোষ বলেন, বরিশাল নগরী থেকে শুরু করে দশ উপজেলায় ৩৩ বধ্যভূমির সন্ধান পাওয়া গেছে। ওই সব বধ্যভূমিতে নিহতের সংখ্যা কত তা নিরূপণ করা মুশকিল।

তবে আমাদের পরিসংখ্যানে উঠেছে এসেছে ওই ৩৩ বধ্যভূমিতে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছেন। এ বিষয়ে বরিশাল জেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শেখ কুতুব উদ্দিন বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে কাজ চলছে। ইতোমধ্যে বরিশাল নগরীর পানি উন্নয়ন বোর্ডের এলাকার বধ্যভূমিটি সংস্কার করে সেখানকার আধুনিকায়নের কাজ করা হয়েছে।

জেলার উজিরপুর ও আগৈলঝাড়ায় বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে জেলার সব বধ্যভূমি সংস্কার করে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখা হবে। এ ব্যাপারে বরিশাল জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান বলেন, জেলায় যত গণকবর রয়েছে, সবক’টি স্মৃতিস্তম্ভ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে বেশ কয়েকটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের কবরও বাঁধাই করার কাজ চলছে।

বিজ্ঞাপন

এ জাতীয় আরো খবর