1. [email protected] : admi2017 :
  2. [email protected] : Daily Khabor : Daily Khabor
  3. [email protected] : rubel :
  4. [email protected] : shaker :
  5. [email protected] : shamim :
মঙ্গলবার, ০৪ অক্টোবর ২০২২, ০১:০১ অপরাহ্ন

ভেতরে সিরিয়াল বাইরে দালাল

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২২
  • ৩১ বার পড়া হয়েছে
ভুক্তভোগী দুই তরুণ

জুন ২৪, সকাল ৯টা। পুরান ঢাকা থেকে রাজধানীর আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে এসেছেন রাসেল পাঠান ও শিপন খান টুটুল। এর আগের মাসে তারা নিয়মমাফিক অনলাইনে ফরম পূরণ করেছেন। এরপর সেই তারিখ থেকে এক মাস পর ডেট পড়ে। খুব সকালে এসে লাইনে দাঁড়ায় তারা। যখন অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো, তখনই যেন কপাল পুড়লো। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাদের পেপারে সিল মেরে বলা হলো, ‘নিজ জেলায় যান’। হুট করে কী করবে, ভেবে না পেয়ে দালালের শরণাপন্ন হলেন। কী আশ্চর্য, সব মুশকিল আসান। ঘণ্টাখানেকের ভেতরেই তাদের সব সমস্যার সমাধান। গুণতে হলো শুধুমাত্র বেশতি টাকা। এভাবেই দালালের আখড়ায় পরিণত হয়েছে আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিস।

৩০ আগস্ট, মঙ্গলবার বেলা ১১টা। পাসপোর্ট অফিসে কলেজপড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে এসেছেন বাবা রুহুল আমিন। মূল সড়ক থেকে ভেতরে ঢুকতেই ৫-৬ জন তাদের অনুসরণ করে ডাকতে থাকেন। দ্রুত পাসপোর্ট করিয়ে দেওয়াসহ যেকোনও সমস্যার দ্রুত সমাধান করে দেবেন তারা। দুই-তিন হাজার টাকা অতিরিক্ত দিলেই মিলবে এ সেবা। শুধু রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নয়, ঢাকার অন্যান্য কেন্দ্রসহ দেশের পাসপোর্টের আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোর চিত্রও একই রকম। দালালদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের সেবা পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে।

সেবাগ্রহীতারা বলছেন, ই-পাসপোর্ট সেবাসহ জেলা শহরে আঞ্চলিক কেন্দ্র চালু করা হলেও আগের মতোই ভোগান্তি রয়ে গেছে। দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য ছাড়াও দীর্ঘসময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা, ছোটখাটো অসঙ্গতির কারণে পাসপোর্ট না পাওয়া, নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় লাগা ও নতুন পাসপোর্টে ভুল থাকার কথাও বলছেন গ্রহীতারা।

বুধবার (৩১ আগস্ট) বেলা ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত আগারগাঁওয়ের পাসপোর্ট অফিস ও আশপাশের এলাকার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।

গত ২৪ আগস্ট ঘুষ ও হয়রানির অভিযোগে কুষ্টিয়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযান চালালে সহকারী পরিচালক জাহিদুল ইসলামের সম্পৃক্ততা পায়। এসময় ভ্রাম্যমাণ আদালত তিন জনকে কারাদণ্ড দেয় ও জরিমানা করে।

এর আগে ২৩ আগস্ট সিরাজগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সামনে থেকে এক ও ৯ আগস্ট চার দালালকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত ৮ আগস্ট রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবীর মিলন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পাসপোর্ট ইস্যুতে নানা বিড়ম্বনার কথা তুলে ধরে দালালমুক্ত পাসপোর্ট সেবার কথা বলেন।

আগারগাঁওয়ে পাসপোর্ট অফিসে ঢোকার শুরুতেই বাম পাশে ই-পাসপোর্ট সংক্রান্ত তথ্যকেন্দ্র। সেখানে অনেক মানুষের লাইন। বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ঢাকা ও বিভিন্ন এলাকা থেকে এসেছেন তারা। ছোট বোনকে সঙ্গে নিয়ে পাবনা থেকে আসা দুলাল বলেন, ‘নতুন পাসপোর্ট করাতে গেলে আগের পাসপোর্টের তথ্যের সঙ্গে মিল নেই বলে জানায় পাবনা অফিস। বিষয়টি ঢাকা থেকে ঠিক হয়ে এলে মিলবে নতুন পাসপোর্ট। এ কারণে ঢাকা অফিসে খোঁজ নিতে এসেছেন।’

মূল গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখা গেল দীর্ঘ লাইন। সিরিয়াল ধরে ভেতরে ঢুকছিলেন পাসপোর্ট করতে আসা লোকজন।

বিভিন্ন কর্মকর্তার রুমের সামনে গিয়েও দেখা মেলে দীর্ঘ সিরিয়াল। লাইনে দাঁড়ানো কয়েকজনের সঙ্গে পরিচয় গোপন করে আলাপ করলে উঠে আসে ভোগান্তির চিত্র। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বৈধভাবে পাসপোর্ট করাতে গিয়ে দীর্ঘসময় লাইন দাঁড়িয়ে থেকে ও বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিলেও যথাসময়ে পাসপোর্ট পাওয়া যায় না। আবার দালাল ধরলে তথ্যের বড় ভুল থাকলেও ভোগান্তি ছাড়া মেলে পাসপোর্ট। মূলত দালাল ও অভ্যন্তরীণ অসাধু কর্মকর্তাদের একটি সিন্ডিকেট অনিয়মে জড়িত বলে তাদের অভিযোগ।

ঢাকার একটি উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষিকা রুবিনা ফেরদৌস বলেন, ‘যারা নিয়ম মেনে পাসপোর্ট করাতে এসেছে তাদের ভোগান্তি সব থেকে বেশি। কাগজপত্রে সামান্য ত্রুটি থাকলেই ঠিক করে নিয়ে আসতে বলে কাগজ ফিরিয়ে দেয়। সেটি নিয়ে পরদিন গেলে আবার নতুন সমস্যার কথা বলে। অন্যদিকে, কাগজপত্র ঠিক থাকলেও সার্ভার না থাকার অজুহাত দেখিয়ে ছবি তোলার জন্য পরদিন আসতে বলে। এভাবে এক দিনের কাজ কয়েকদিনেও করা যায় না।’

                      ভেতরের সিরিয়াল

তার পাশে পাঁচ বছরের ছেলেকে নিয়ে অপেক্ষমাণ কলেজ শিক্ষক শাহিন বলেন, ‘কয়েকদিন আগে আমার স্ত্রী এসেছিলেন। ওইদিন সার্ভার না থাকায় ছবি তুলতে পারেননি। মঙ্গলবার স্ত্রীর অফিস থাকায় আমি এসেছি।’ এই শিক্ষক আরও বলেন, ‘সব জায়গায় লাইন। তবে দালালদের মাধ্যমে করালে জন্মনিবন্ধনের ত্রুটি এমনকি পুলিশ ভেরিফিকেশনসহ কোনো ধরনের ঝামেলা পোহাতে হয় না। কয়েক হাজার টাকা বাড়িয়ে দিলেই দালালরা সব কাজ ঝামেলা ছাড়াই করে দিচ্ছে।

দুপুর ১টার দিকে তার ছেলের ছবি তোলার সিরিয়াল ছিল ৯০ নম্বরের পরে। ওই সময় সর্বশেষ অপেক্ষমাণ সিরিয়াল ছিল ১২২। নিচ থেকে ষষ্ঠতলা পর্যন্ত প্রতিটি কক্ষের সামনে দেখা গেছে লম্বা লাইন। কোনো কোনো রুমের সামনের লাইন এক ফ্লোর থেকে ওপরের ফ্লোর ছাড়িয়ে যায়। এমনকি নিচে থাকা প্রতিবন্ধীদের কক্ষেও অনেক সেবাগ্রহীতাকে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, গাড়ি থেকে নেমে পাসপোর্ট অফিসের দিকে ঢুকলেই দালালরা এই প্রতিবেদককে পেছন থেকে অনুসরণ করতে শুরু করে। কেউ পাসপোর্ট অফিসের গেট এমনকি ভেতরে পর্যন্ত ঢুকে পড়ে। সহজে পাসপোর্ট করিয়ে দেওয়াসহ নানা ধরনের প্রস্তাব দেয় তারা। তাদের কথায় রাজি না হওয়ায় চলে যায়। তবে যারা রাজি হন তাদের পাসপোর্ট অফিসের সামনের ফুটপাথে থাকা বিভিন্ন দোকানে নিয়ে ফরম ফিলাপ করিয়ে দিচ্ছিলেন দালালরা। টাকা ও মোবাইল নম্বর রেখে দিয়ে কয়েকদিন পর যোগাযোগ করতে বলেন। এ সময় আশপাশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দেখা গেলেও দালালদের বিষয়ে তাদের কোনও তৎপরতা দেখা যায়নি।

পাসপোর্ট অফিসের সামনের ফুটপাথে অপেক্ষমান সৌদিপ্রবাসী হালিম বলেন, ‘এতদিন এমআরপি পাসপোর্ট ছিল। আগেরটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় এখন ই-পাসপোর্ট করাতে এসেছেন। নিজে নিজে করতে গেলে অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হয়, তাই এক দালালকে করতে দিয়েছেন।’ এ প্রবাসী বলেন, ‘দালাল তাদের পূর্বপরিচিত হওয়ায় কোনো ঝামেলা হয় না। দুই-তিন হাজার টাকা বাড়তি দিলেই ঠিকভাবে পাসপোর্ট করে দেয়।’

পাসপোর্ট দালাল চক্রের সদস্য হেলাল, হিরা, রবিন, রুহুল ও সেলিম নামে পরিচয় দেওয়া কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেন এ প্রতিবেদক। তাদের ভাষ্য, নিয়ম মেনে কাজ করাতে গেলে কাগজপত্র ঠিক থাকলেও ভোগান্তিতে পড়বেন। এর চেয়ে কিছু টাকা বাড়তি দিলে ঝামেলা ছাড়া মিলবে পাসপোর্ট। দালালরা বলেন, অতিরিক্ত এসব টাকা তারা একাকী ভোগ করেন না। এ টাকার ভাগ পৌঁছে যায় অফিসের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত। ভেতরে ঢুকে তাদের কথার প্রমাণও মিলল বেশ কয়েকটি কক্ষের সামনে। দেখা গেল কারও অনলাইন জন্মনিবন্ধনের সঙ্গে মা-বাবার জন্মনিবন্ধনের তথ্যের মিল না থাকায় কাজ হচ্ছে না। ক্ষেত্রভেদে পাসপোর্টের পৃষ্ঠা ও সময়ের ওপর অতিরিক্ত টাকার পরিমাণ ওঠানামা করে।

নাজমুল লিখন নামে একজন বলেন, ‘ভাতিজার নিজের জন্মনিবন্ধনে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মায়ের জন্মনিবন্ধনের তথ্যের মিল না থাকায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে দালালদের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে কোনো ভোগান্তি ছাড়াই কাজটি করতে পেরেছেন। এর বাইরে ছবি তোলাসহ কাগজপত্র দ্রুত স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়ার জন্য গেটে থাকা আনসার সদস্যদের কিছু টাকা দিলে তারাও কাজ করে দিচ্ছিলেন।

এ বিষয়ে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল আইয়ুব চৌধুরী বলেন, ‘কে দালাল সেটি বোঝা যায় না, তাদের ধরিয়ে দিলে বা ছবি তুলে কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হলে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।’

তিনি বলেন, ‘জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সঙ্গে তথ্যের মিল না থাকলে সরকারিভাবে পাসপোর্ট দেওয়ার নিয়ম নেই। যারা নতুন করে বয়স কমাতে চায় তাদের ক্ষেত্রেই ঝামেলা হয়।’

বিজ্ঞাপন

এ জাতীয় আরো খবর