1. [email protected] : admi2017 :
  2. [email protected] : Daily Khabor : Daily Khabor
  3. [email protected] : shaker :
  4. [email protected] : shamim :
শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৮:৪৪ অপরাহ্ন

মেজর সিনহা হত্যার এক বছর, করোনায় আটকে আছে বিচার কার্যক্রম

ডেইলি খবর নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় শনিবার, ৩১ জুলাই, ২০২১
  • ২২ বার পড়া হয়েছে

বহু আলোচিত মেজর (অব.) সিনহা মুহাম্মদ রাশেদ খান হত্যার এক বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০২০ সালের ৩১ জুলাই শুক্রবার রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর এলাকায় চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিনি।

মামলার অভিযোগপত্র অনুযায়ী, তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার ঘটনায় মামলা দায়েরের পর দ্রুত তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দিলেও করোনায় থমকে গেছে বিচার কার্যক্রম। তবে সিনহার পরিবারের আশা দ্রুত এ মামলার বিচার শেষ করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হবে।

মামলার বাদী ও সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বলেন, ‘দ্রুত সময়ে মামলার অভিযোগপত্র দেওয়ায় বিচার নিয়ে আশাবাদি হয়েছি। কিন্তু লকডাউনে মামলার বিচার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এখন ভয় কাজ করে—৮৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া যাবে কি না। কারণ সাক্ষীদের সব সময় পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। তবু আমরা আশাবাদী দ্রুত সময়ে সাক্ষ্য নিয়ে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

মামলার প্রধান সাক্ষী বাহারছড়ার আব্দুল হামিদ জানান, একজন মানুষকে প্রকাশ্যে বিনা দোষে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তাই তিনি বিবেকের তাড়নায় জীবনের ঝুঁকি জেনেও শারমিন ফেরদৌসের করা মামলায় সাক্ষী হয়েছেন। পুলিশের হয়রানি ও নানাভাবে চাপে থাকলেও খুনিদের শাস্তি চান তিনি।

তার মতে, মেজর সিনহাকে পরিকল্পিকভাবে হত্যার পর মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে চালিয়ে দিতে চেষ্টা করেছিলেন, টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ ও বাহারছড়ার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ লিয়াকত আলী।

কী ঘটেছিল সেদিন

মামলার তদন্ত সংস্থা র্যাবের দেয়া মামলার চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়, ২০২০ সালের ৭ জুলাই সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান ও তার সহকর্মী শিপ্রা দেবনাথ, সাহেদুল ইসলাম সিফাত ও তাহসিন রিফাত নূর কক্সবাজারের নীলিমা রিসোর্টে অবস্থান করেন। ইউটিউবে একটি ভিডিও চ্যানেল নিয়ে কাজ করার সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা হয়। সাধারণ মানুষ পুলিশের মাধ্যমে তাদের জিম্মি দশা, অত্যাচারের ঘটনা মেজর সিনহাকে জানায়। এসব জানতে পেরে সিনহা পীড়িত হন। ঘটনার দিন নীলিমা রিসোর্ট থেকে টেকনাফের উদ্দেশে রওনা হন মেজর (অব.) সিনহা ও তার সহকর্মী সাহেদুল ইসলাম সিফাত।

এরপর সন্ধ্যার দিকে মারিশবুনিয়া গ্রামের টুইন্যা পাহাড়ে উঠেছিলেন মেজর সিনহা। পরে একটি মসজিদ থেকে মাইকে ‘এলাকায় ডাকাত পড়েছে’বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। এ ঘোষণার নেপথ্যে ছিলেন স্থানীয় আয়াজ উদ্দিন ও নুরুল আমিন। তারা দুজনই পুলিশের সোর্স হিসেবে পরিচিত। ওইদিন সকাল থেকেই সিনহার গতিবিধি নজরে রাখা হয়। ওইদিন একটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘বৃক্ষরোপণ’ অনুষ্ঠান শেষে ওসি প্রদীপকে জানানো হয়, মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ প্রাইভেটকার নিয়ে টেকনাফের শামলাপুর পাহাড়ে গেছেন।

এ সময় সোর্সের মাধ্যমে বাহারছড়া ক্যাম্পের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী সিনহার প্রতি নজর রাখতে থাকেন। শামলাপুর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ান (এপিবিএন) চেকপোস্টে তল্লাশির নামে গাড়ি থেকে নামিয়ে মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদকে খুব কাছ থেকে চারটি গুলি করেন ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী।

এর কিছুক্ষণ পরেই প্রদীপ কুমার দাশ যখন ঘটনাস্থলে যান, তখনো মেজর সিনহা জীবিত ছিলেন। এ সময় ওসি প্রদীপ সিনহার ‘মুখমণ্ডল ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পায়ের জুতা দিয়ে আঘাত করে বিকৃত করার চেষ্টা করেন। এর পরই সিনহার মৃত্যু হয়। পরে লোক দেখানোভাবে তাকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।

তদন্ত ও মামলা

হত্যাকাণ্ডের দুদিন পর অর্থাৎ ২০২০ সালের ২ আগস্ট মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে প্রধান করে চার সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই কমিটি সরেজমিনে তদন্ত করে ঘটনার কারণ ও উৎস অনুসন্ধানের প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সুপারিশসহ জমা দেন।

অপরদিকে হত্যারকাণ্ডের পাঁচদিনের মাথায় অর্থাৎ ৫ আগস্ট পুলিশের গুলিতে নিহত সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস বাদী হয়ে শামলাপুর পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের বরখাস্ত হওয়া সাবেক এসআই লিয়াকত আলী ও টেকনাফ থানার বরখাস্ত হওয়া সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ৯ জনকে আসামি করে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে টেকনাফ থানাকে নিয়মিত মামলা হিসেবে রুজু এবং র্যাব-১৫ কক্সবাজারকে মামলটি তদন্তের নির্দেশ দেন।

ওই সময়ে আলোচিত এই মামলাটি র্যাব-১৫ কক্সবাজারে দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারি পুলিশ সুপার জামিল আহমদকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হলেও পরে আদালত ওই কর্মকর্তার পরিবর্তে সহকারী পরিচালক ও সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার খায়রুল ইসলামকে তদন্তের দায়িত্ব দেন। যার মামলা নম্বর: এসটি-৪৯৩/২০২১ ইংরেজি, জিআর মামলা নম্বর : ৭০৩/২০২০ ইংরেজি, টেকনাফ মডেল থানা মামলা নম্বর: ৯/২০২০ ইংরেজি।

আত্মসমর্পণ ও জবানবন্দি

মামলার পরপরই ২০২০ সালের ৬ আগস্ট প্রধান আসামি লিয়াকত আলী ও টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ৭ পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। একইভাবে পুলিশের পক্ষে সাক্ষী দেয়া শামলাপুর এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আরও তিন আসামি আদালতে আত্মসমর্পণ করেন।

পর্যায়ক্রমে আদালত আসামিদের কারাগারে পাঠানোর পর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খায়রুল ইসলাম আসামিদের আদালতের মাধ্যমে দফায় দফায় রিমান্ডে নেয়। রিমান্ডের আসামিদের স্বীকারোক্তি মতে আরও চার আসামি মামলায় যুক্ত করা হয়। মোট ১৪ আসামিকে র্যাবের তদন্তকারী কর্মকর্তা বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এদের মধ্যে টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও কনস্টেবল রুবেল শর্মা ছাড়া ১২ জন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

পরে দীর্ঘ তদন্ত শেষে ওই মামলায় ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর ১নং আসামি বরখাস্তকৃত এসআই লিয়াকত আলী ও বরখাস্তকৃত সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাসসহ ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে এবং ৮৩ জন সাক্ষীসহ আলোচিত মামলাটির চার্জশিসীট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন র্যাব-১৫ এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম।

১৫ জনকে আসামি করে দায়ের করা অভিযোগপত্রে সিনহা হত্যাকাণ্ডকে একটি ‘পরিকল্পিত ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। পরে ২০২১ সালের ২৪জুন চার্জশিটভুক্ত আরেক আসামি কনস্টেবল সাগর দেব আদালতে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে আলোচিত এই মামলার ১৫ আসামির সবাই আইনের আওতায় আসে।

মামলায় কারাগারে থাকা ১৫ আসামি হলো- বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন পরিদর্শক লিয়াকত আলী, টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, রুবেল শর্মা, টেকনাফ থানার এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, এএসআই লিটন মিয়া, কনস্টেবল সাগর দেব, এপিবিএনের এসআই মো. শাহজাহান, কনস্টেবল মো. রাজীব ও মো. আবদুল্লাহ, পুলিশের করা মামলার সাক্ষী টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুরের মারিশবুনিয়া গ্রামের নুরুল আমিন, মো. নিজামুদ্দিন ও আয়াজ উদ্দিন।

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি ফরিদুল আলম চৌধুরী বলেন, গত ২৭ জুন কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এরপর ২৬, ২৭ ও ২৮ জুলাই একটানা তিন দিন বাদীসহ ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের দিন নির্ধারণ করেন। কিন্তু করোনার কারণে লকডাউনে আদালতের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সাক্ষ্যগ্রহণ হচ্ছে না। এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের পরবর্তী নতুন দিন ধার্য করা হবে।

শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস বলেন, সারা দেশের মানুষ তাকিয়ে আছে আমার ভাই মেজর সিনহা হত্যায় জড়িতদের কী শাস্তি হয়, তা দেখার জন্য। আমরা চাই দ্রুত সময়ের মধ্যে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি যেন হয়।

এদিকে সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে কক্সবাজার জেলা পুলিশ। ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে মামলার চলাকালিন গত বছরের ২৭ জুন ফৌজদারী দণ্ডবিধির ৩০২/২০১/১০৯/ ১১৪/১২০-খ/ ৩৪ ধারায় সব আসামির উপস্থিতিতে কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইলের আদালত মামলার অভিযোগ গঠন করেন। এর আগে মামলা তদন্তকালীন সময়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কক্সবাজার জেলা পুলিশ প্রশাসনের পুলিশ সুপার ও কনস্টেবলসহ পুলিশের ১ হাজার ৫০৫ সদস্যকে কক্সবাজার থেকে একযোগে অন্যত্রে বদলি করা হয়।

বিজ্ঞাপন

এ জাতীয় আরো খবর