1. successrony@gmail.com : admi2017 :
  2. editor@dailykhabor24.com : Daily Khabor : Daily Khabor
  3. shaker@dailykhabor24.com : shaker :
মঙ্গলবার, ০২ মার্চ ২০২১, ০৬:৪০ পূর্বাহ্ন

কয়লা-পাথরে শুল্ক ফাঁকিতে আ. লীগ-বিএনপি দোস্তি!

ডেইলি খবর নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ১৫ বার পড়া হয়েছে

ময়মনসিংহ আর শেরপুরের চারটি শুল্ক স্টেশনেই রাজস্ব ফাঁকির মহোৎসব চলছে। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার গোবড়াকুড়া ও কড়াইতলী শুল্ক স্টেশন এবং শেরপুরের নালিতাবাড়ীর নাকুগাঁও ও কামালপুর শুল্ক স্টেশন দিয়ে কয়লা ও পাথর আমদানির ক্ষেত্রে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে হালুয়াঘাটের গোবড়াকুড়া ও কড়াইতলী শুল্ক স্টেশনে ওজন মাপার যন্ত্র না থাকায় ট্রাকে এলসির চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণ কয়লা দেশে আনা হচ্ছে। এই বাড়তি কয়লার কোনো শুল্কই দেওয়া হচ্ছে না। স্টেশনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা আর অসাধু আমদানিকারকদের আঁতাতেই চলছে এই শুল্ক ফাঁকি। আর তাঁদের পেছনের শক্তি হিসেবে আছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই নেতা। একজন হালুয়াঘাটের আওয়ামী লীগের এমপি জুয়েল আরেং, অন্যজন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলী আজগর।

সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, সারা দেশের চেয়ে ভিন্ন চিত্র এখানে। হালুয়াঘাটে শুল্ক ফাঁকির খেলায় আওয়ামী লীগ-বিএনপি যেন একাকার! দুজনই নিয়ন্ত্রণ করছেন হালুয়াঘাটের দুই শুল্ক স্টেশন।

ময়মনসিংহ-১ আসনের সাবেক এমপি ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী, প্রয়াত প্রমোদ মানকিনের ছেলে জুয়েল আরেং। ২০১৬ সালে বাবার মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে তিনি এমপি নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও নৌকার টিকিটে এমপি হয়েছেন জুয়েল আরেং। তাঁর বাবা প্রমোদ মানকিন ছিলেন হালুয়াঘাটের গোবড়াকুড়া শুল্ক বন্দরের কয়লা-পাথর আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি। বাবার মৃত্যুর পর এমপি হওয়া জুয়েল আরেং যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যের পাশাপাশি আছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য হিসেবেও! আর ‘উত্তরাধিকার সূত্রে’ হয়েছেন গোবড়াকুড়া শুল্ক বন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি।

অন্যদিকে গোবড়াকুড়া শুল্ক স্টেশনের আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলী আজগর, যিনি হালুয়াঘাট উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক। আলী আজগরের বাবা প্রয়াত আব্দুল জলিলও ছিলেন একই আসনে বিএনপির এমপি। আলী আজগর বর্তমানে করোনায় আক্রান্ত হয়ে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এ দুই নেতার সিন্ডিকেটের কাছেই গোবড়াকুড়া স্টেশনের কয়লা আমদানির চাবি। কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে প্রতিদিন শত শত টন কয়লাবাহী ট্রাক এই স্টেশন দিয়ে ভারত থেকে দেশে প্রবেশ করছে। ওজন পরিমাপের যন্ত্র না থাকায় হাতের কারসাজিতেই ট্রাকের কয়লার হিসাব হচ্ছে।

হালুয়াঘাটের দুটি শুল্ক স্টেশনের পাশাপাশি শেরপুরের একটি স্টেশনেও নেই ওজন পরিমাপের যন্ত্র। হালুয়াঘাটের দুই স্টেশন দিয়ে শুধু কয়লা আমদানি হলেও শেরপুর জেলার নাকুগাঁও স্টেশন দিয়ে আমদানি হচ্ছে শুধু পাথর। তবে কামালপুর শুল্ক স্টেশন দিয়ে কয়লা ও পাথর দুই-ই আমদানি হচ্ছে।

ময়মনসিংহের দুটি স্টেশনে ওজন পরিমাপের যন্ত্র না থাকার সুযোগ নিচ্ছে কয়লা ও পাথর আমদানিকারকদের সিন্ডিকেট। অতিরিক্ত কয়লা ও পাথরের জন্য দিতে হচ্ছে না বাড়তি কোনো শুল্ক। ব্যাংকে এলসিতে উল্লেখ করার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ কয়লা ও পাথর প্রতিদিন দেশে আনা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতি ট্রাকে ১২ টন কয়লা-পাথর আনার অনুমোদন থাকলেও গোবড়াকুড়া, কড়াইতলী, নাকুগাঁও, কামালপুর শুল্ক স্টেশন দিয়ে প্রতি ট্রাকে ১৮ থেকে ২২ টন পর্যন্ত কয়লা ও পাথর আনা হচ্ছে। অভিযোগ আছে, এ ব্যাপারে আমদানিকারকদের সঙ্গে বোঝাপড়া আছে স্টেশনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ভারত থেকে আসা ট্রাকের স্লিপ দেখেই ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, করোনা মহামারি এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে দীর্ঘদিন কয়লা আমদানি বন্ধ থাকার পর চার মাস ধরে গোবড়াকুড়া ও কড়াইতলী স্টেশন দিয়ে কয়লা ও পাথরও আসছে। এই দুটিসহ নাকুগাঁও ও কামালপুর—এই চার সীমান্তপথ দিয়ে প্রতিদিন কয়লা আমদানি হচ্ছে আড়াই থেকে তিন শ ট্রাক। গড়ে একটি ট্রাকে ২০ টন কয়লা আমদানি হলে দিনে আসছে সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার টন। এর মধ্যে প্রায় দুই হাজার টন কয়লাই শুল্ক না দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আমদানিকারক সমিতির সভাপতি জুয়েল আরেং এবং সাধারণ সম্পাদক আলী আজগর সিন্ডিকেটের সদস্যরা এভাবে দিনের পর দিন শুল্ক ফাঁকি দিয়ে টাকার পাহাড় গড়ছেন।

গোবড়াকুড়া ও কড়াইতলী—দুটি শুল্ক স্টেশনে একজনই রাজস্ব কর্মকর্তা দায়িত্বে থাকেন। এখান থেকে সদ্য বদলি হয়ে যাওয়া রাজস্ব কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেখুন, আমি বদলি হয়ে রংপুর স্থলবন্দরে চলে এসেছি। সেই বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারব না।’ নতুন রাজস্ব কর্মকর্তা হুমায়ুন কবীর মিনা বলেন, ‘আমাদের এখানে নির্দিষ্ট করা আছে প্রতি ট্রাকে ১২ টন মাল আসবে, আমরা ১২ টনের শুল্ক আদায় করে থাকি।’ কিন্তু ট্রাকে বেশি কিংবা কম কয়লা এলে কিভাবে যাচাই করেন—এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ভারত থেকে ওজন লেখা কাগজের ওপর ভিত্তি করেই আমরা শুল্ক নিয়ে থাকি। আমাদের এখানে ওজন পরিমাপের কোনো সুযোগ নেই। গত বছর গাড়িপ্রতি ৯ টন নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। এখন ১২ টন ধরে শুল্ক নিয়ে থাকি। এর অতিরিক্ত কয়লাবোঝাই ট্রাক দেশে এলেও করার কিছুই নেই। ওজন পরিমাপের যন্ত্র না আসা পর্যন্ত ঠেকানো কঠিন।’

নালিতাবাড়ীর নাকুগাঁও শুল্ক স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, ভারত থেকে আসা পাথরবোঝাই ট্রাকগুলো লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে ওজন পরিমাপের ডিজিটাল যন্ত্র থাকলেও অটোমেশনের মাধ্যমে কম্পিউটার থেকে কাগজ বের করা হচ্ছে না। কাগজে ওজন লিখে রাখছেন অফিস সহায়ক শাহাদাত হোসেন। এখানে দায়িত্বে থাকার কথা আব্দুল হামিদ ও লিয়াকত হোসেনের, কিন্তু কর্মস্থলে দেখা যায়নি তাঁদের। প্রতিটি ট্রাক ওজন পরিমাপের স্কেলে ওঠানোর পর পরিমাপ খাতায় লেখা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ট্রাকে অনেক বেশি পাথর এলেও গড়ে লেখা হয় ১২ টন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে নাকুগাঁও স্টেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা জুবায়ের হোসেন বলেন, ‘ওজন পরিমাপের যন্ত্র পুরোপুরি আধুনিক হয়নি, তাই হাতে লিখে রাখতে হচ্ছে।’

নাকুগাঁও পাথর-কয়লা আমদানিকারক সমিতির সভাপতি মুস্তাফিজুর রহমান মুকুল বলেন, ‘বছরে ছয় মাস পাথর-কয়লা আমদানি করা হয়। ৭০ থেকে ৮০ জন ব্যবসায়ী পাথর আমদানি করেন। ওজনের অতিরিক্ত পাথর আমদানি করা হয় না বলে তিনি দাবি করেন। তবে বেশ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এলসির চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণ পাথর নিয়ে আসেন ব্যবসায়ীরা।

গোবড়াকুড়া শুল্ক স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, শাপলা বাজার থেকে শুল্ক স্টেশনের দিকে সড়কের দুই পাশে সারি সারি কয়লার স্তূপ। আমদানিকারকরা ট্রাকের পর ট্রাক কয়লা আমদানি করে বিশাল স্তূপ করে রেখেছেন। ওই সব স্তূপ থেকে এরপর ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়লা নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে। তিন শতাধিক আমদানিকারক এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। শুধু এই স্টেশন দিয়েই মাসে গড়ে সাত থেকে আট হাজার টন কয়লা আমদানি হয়।

গোবড়াকুড়া শুল্ক স্টেশনে কয়লাবোঝাই কোনো ট্রাকই ওজন করতে দেখা যায়নি। বিজিবির একটি টহল টাওয়ারের নিচে বসে ট্রাকের স্লিপ দেখেই ট্রাকগুলো ছেড়ে দেওয়া হচ্ছিল। টাওয়ারের পেছনেই আব্দুল ওয়াদুদের দোকানে বসে কয়লা শ্রমিক রফিকুল ইসলাম বলেন, ৬ ফেব্রুয়ারি শুধু গোবড়াকুড়া দিয়েই আড়াই শতাধিক কয়লাবোঝাই ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

গোবড়াকুড়া শুল্ক স্টেশনের আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি ও স্থানীয় এমপি জুয়েল আরেংয়ের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাম আরেং ইন্টারন্যাশনাল। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাগজে-কলমে অল্প কিছু মাল আমদানি হলেও বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখেছেন সমিতির সভাপতি।

অন্য আমদানিকারকদের মধ্যে ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার শাহজাহান হোসেন বলেন, ‘শুল্ক বন্দর থেকে আধা কিলোমিটার দূরে রাজস্ব কর্মকর্তাদের কার্যালয়। বিজিবির টহল টাওয়ারের নিচে বসে ভারত থেকে আসা ট্রাকের স্লিপ চেক করা হয়। কিন্তু কোন ওজন মাপা হয় না। ভারত থেকে যা মেপে দেয় তা-ই আমরা নিয়ে থাকি। এখন কম এলেও করার কিছু নেই, বেশি এলেও উপায় নেই। মাপের যন্ত্র না থাকলে যা হয় আর কি।’ রোজামনি এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার সোহেল হোসেন বলেন, ‘ওজনে একটু-আধটু বেশি এলেও আমাদের লোকসান হয়, কারণ কয়লার সঙ্গে অনেক বালুও চলে আসে।’

অন্যদিকে কড়াইতলী স্টেশন দিয়েও মাসে প্রায় চার হাজার টন কয়লা আমদানি হয়। এই স্টেশন দিয়ে সুরুজ আলীর নেতৃত্বে চলে শুল্ক ফাঁকির কারবার। সুরুজ আলী কড়াইতলী শুল্ক স্টেশনের কয়লা আমদানিকারক সমিতির সভাপতি। তিনি ভুবনকুড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ইউনয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। তাঁর সিন্ডিকেট এমপি জুয়েল আরেংয়ের প্রশ্রয়ে কয়লা আমদানিতে নির্বিঘ্নে শুল্ক ফাঁকির কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।

শুল্ক স্টেশনের কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চার স্টেশন দিয়ে মাসে গড়ে ১২ হাজার ট্রাক বোঝাই কয়লা ও পাথর আমদানি হয়। সেই হিসাবে মাসে আমদানি হওয়ার কথা দুই থেকে আড়াই লাখ টন। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, কয়লা-পাথর আসে এর চেয়ে দ্বিগুণ। ভারতে এক টন কয়লার এলসি মূল্য ৭০ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ছয় হাজার ৯০ টাকা। কয়লা আমদানি করা হলে মূল্যের ২৫ শতাংশ রাজস্ব পায় সরকার। সেই হিসাবে এক টন কয়লায় সরকার রাজস্ব পায় এক হাজার ৭৩৪ টাকা। একজন আমদানিকারক আট ট্রাক অর্থাৎ ৯৬ টনের কম আমদানি করতে পারেন না। হিসাব কষে দেখা গেছে, এই পরিমাণ কয়লা আমদানি করতে রাজস্ব দিতে হয় ১৩ হাজার ৭৭২ টাকা। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের সঙ্গে স্টেশনের অসাধু কর্মকর্তাদের আঁতাতে একই পরিমাণ রাজস্বে আটটি ট্রাকে ৯৬ টনের পরিবর্তে নিয়ে আসা হয় ১৯০ থেকে ২০০ টনের বেশি কয়লা।

আমদানিকারকরা শুল্ক ফাঁকি দিতে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কয়লার মূল্যও কম দেখান। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এলসিতে মূল্য টনপ্রতি ৭০ ডলার দেখানো হলেও প্রকৃত মূল্য ১১০ থেকে ১২০ ডলার। এলসির বাইরে ওই অতিরিক্ত মূল্য হুন্ডির মাধ্যমে মেটানোর অভিযোগ রয়েছে। দাম কম দেখানোর কারণে এখানেও রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।

এ বিষয়ে জানতে গোবড়াকুড়া স্টেশনের আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলী আজগরের মোবাইলে ফোন করা হলে তাঁর ছেলে বলেন, ‘বাবা অসুস্থ হয়ে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি আছেন। এখন বাবার জন্য কথা বলা সমস্যা।’

গোবড়াকুড়া আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি এমপি জুয়েল আরেংয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে কয়েকবার তাঁর মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি ধরেননি। এসএমএস করা হলেও তার জবাব দেননি

এ জাতীয় আরো খবর