1. [email protected] : admi2017 :
  2. [email protected] : Daily Khabor : Daily Khabor
  3. [email protected] : shaker :
  4. [email protected] : shamim :
রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৭:৪৭ পূর্বাহ্ন

সংঘবদ্ধ নিপীড়নের পেছনে বড় মদদ

ডেইলি খবর নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২০
  • ৭০ বার পড়া হয়েছে

ভালো কলেজে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দিয়ে এক কিশোরীকে কৌশলে বাসায় নিয়ে ধর্ষণ করেন শহর শ্রমিক লীগ শাখার আহ্বায়ক তুফান সরকার। ঘটনার ১০ দিন পর তুফানের স্ত্রী ও তাঁর বড় বোন পৌর কাউন্সিলরের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী কিশোরী ও তার মাকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর মা-মেয়ের মাথা ন্যাড়া করে বেধড়ক পেটানো হয়। ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই বগুড়ার এই বহুল আলোচিত ‘তুফানকাণ্ডের’ অনুসন্ধানে দেখা যায়, বড় ভাই যুবলীগ নেতা মতিন সরকারের ক্ষমতার বলয়ে নিজস্ব একটি গ্যাং গ্রুপ তৈরি করে এলাকায় ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছিলেন তুফান। তাঁর গ্যাংয়ের হোন্ডা বাহিনী মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, মাদক বাণিজ্যসহ সব ধরনের অপকর্মে জড়িত ছিল।
গত বছরের ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজীতে মাদরাসায় পরীক্ষার কেন্দ্রে শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার পর আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। দেশব্যাপী তোলপাড় করা এই ঘটনারও সরেজমিন অনুসন্ধান এবং পরবর্তী তদন্তে জানা যায়, মাদরাসার অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ দৌলা তাঁর অপকর্ম ঢাকতে কিছু বখাটে ছাত্রকে দিয়ে গ্যাং গড়ে তোলেন। এরা ছাত্রীদের নিপীড়ন করে চলছিল দাপটে। এদের পেছনে ছিলেন পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ আলম, উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা রুহুল আমিনসহ কয়েকজন।
এমন নারী নির্যাতন-নিপীড়ন এবং ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেই এর সঙ্গে স্থানীয় মাস্তান গ্যাং গ্রুপের সংশ্লিষ্টতার তথ্য মিলছে। সম্প্রতি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নারীকে বিবস্ত্র করে চরম বর্বরতা চালানোর ঘটনা, সিলেটের এমসি কলেজে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণসহ আলোচিত ঘটনায় দেখা গেছে একই চিত্র। স্থানীয় পর্যায়ের এসব অপরাধীর পেছনে থাকছে ক্ষমতাধর প্রভাবশালী মহল, যারা প্রভাব বিস্তারে এসব অপরাধীকে ব্যবহার করছে। শহরের পাড়া-মহল্লা বা প্রত্যন্ত গ্রামে, পাড়ায় এরা ব্যাপক ক্ষমতাধর; মূর্তিমান আতঙ্ক। তবে পুলিশের খাতায় অপরাধী হিসেবে নাম না থাকায় নজরদারির বাইরে এরা। প্রচলিত সংঘবদ্ধ অপরাধী হিসেবে তাদের চিহ্নিতও করা হয় না। এসব সন্ত্রাসী সাধারণ অপরাধের পাশাপাশি এখন নারী নিপীড়নে জড়িয়ে পড়ছে। কখনো নিছক ফুর্তি, কখনো দাপট দেখানোর জন্য এরা ঘৃণ্য অপরাধ করছে নির্বিঘ্নে। এতে দেশে দলবদ্ধ ধর্ষণসহ নারী নিপীড়নের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।

মানবাধিকারকর্মী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষমতার বলয়ে থেকে অপরাধ কর্মকাণ্ড চালানোর ওপর নজরদারি করতে হবে। পাশাপাশি ধর্ষণ, নারী নিপীড়নের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনায় দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেশে আইনের শাসন আছে বলেই আমরা অপরাধীদের ধরতে সক্ষম হয়েছি এবং আইন অনুযায়ী তাদের ব্যবস্থা করার জন্য বিচারকের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। যদি এমন হতো, আমরা ও আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী চুপচাপ বসে আছে, তাহলে বলতে পারতেন আইনের শাসন নেই। স্থানীয় প্রশাসন, ইউএনও, ডিসি, এসপি সবাই একসঙ্গে কাজ করছে এসব ধর্ষক ও সমাজবিরোধীর বিরুদ্ধে। এই সমাজবিরোধীরা মানুষ নয়, অমানুষ।’ নোয়াখালীর ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা ঘটলে সাধারণত যারা ভিকটিম তারা ছাপিয়ে, লুকিয়ে যায়, প্রকাশ করতে চায় না। সেখানে কি এ ধরনের কিছু হয়েছে কি না, আমি জানি না। যখনই আমাদের নজরে এসেছে তখন থেকেই আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী কাজ শুরু করেছে এবং দ্রুততার সঙ্গে আপরাধীদের ধরে ফেলেছে।’
গত ২ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার এখলাসপুরে একদল লম্পট ঘরে ঢুকে এক গৃহবধূকে (৩৫) বিবস্ত্র করে নির্যাতন চালায়। তাঁর স্বামীকে বেঁধে রেখে দুর্বৃত্তরা নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করেছিল। ওই নারী তাঁর সম্ভ্রম রক্ষায় অনুনয়-বিনয় করেন, তাদের ‘বাবা’ ডেকেও বাঁচার চেষ্টা করেন, কিন্তু আট-দশজনের দলটি নিবৃত্ত না হয়ে মহা-উল্লাসে বীভৎস কাণ্ড চালিয়ে যায়। বাধা পেয়ে ওই নারীকে মারধরও করে তারা। পরে ওই ভিডিও ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বারবার ওই নারীকে অশোভন প্রস্তাব দেয় চক্রটি। টাকা দাবি করে। ওই নারী রাজি না হওয়ায় প্রায় এক মাস পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিওটি ফাঁস করে দেয় তারা। ওই ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ার পর ক্ষোভে-ঘৃণায় তোলপাড় শুরু হয়েছে সারা দেশে। ভয়ে চুপসে থাকা নারী ও তাঁর পরিবার ৩৩ দিন পরে পুলিশের কথায় মামলা করার সাহস পায়। এই চক্রের হোতা গ্যাং গ্রুপটির প্রধান দেলোয়ারকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত দেলোয়ার বেগমগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতাদের হাত ধরে আওয়ামী রাজনীতিতে ঢুকে পড়েন। দলে কোনো পদ-পদবি না থাকলেও বেগমগঞ্জের আরেক ক্যাডার সুমন বাহিনীর সঙ্গে মিশে সন্ত্রাসী ও ইয়াবাসেবী হয়ে পড়েন। নিজ এলাকা এখলাসপুরের মানুষ তাঁকে ব্যাপক ভয় পায়। একটি বাহিনী গড়ে তুলে তিনি এখলাসপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের ক্যাডার পরিচয়ে অস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করতেন। ২০১৮ সালে পুলিশ তাঁকে অস্ত্রসহ আটক করলেও পরে তিনি ছাড়া পেয়ে যান। স্থানীয় সংসদ সদস্য মামুনুর রশিদ কিরণ এখলাসপুর গ্রামে এলে তাঁর হাতে ফুল দিয়ে সবার নজরে আসেন দেলোয়ার। তাঁর সহযোগী, প্রধান আসামি নূর হোসেন বাদল এবং অন্য আসামি স্থানীয় ইউপি মেম্বার মোজাম্মেল হোসেন সোহাগও এলাকার আতঙ্ক। গ্যাংয়ে থাকা অন্য যুবকরাও ইয়াবার নেশায় বুঁদ হয়ে বেপরোয়া। ক্ষমতার দাপটে তাঁরা অপকর্ম করেও পার পেয়ে যাবেন ভেবেছিলেন। গ্রেপ্তারকৃতরা এমনটাই দাবি করেন।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে এক নববধূকে ধর্ষণ করে কয়েকজন তরুণ। এই দলবদ্ধ ধর্ষণের আলোচিত ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত সাইফুর রহমানসহ ছয়জন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তারেক ও অর্জুন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক রনজিত সরকারের অনুসারী বলে জানা গেছে। তদন্তকারীরা ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বিকৃত মানসিকতার চর্চায় থাকা গ্যাং গ্রুপটি এই দলবদ্ধ ধর্ষণকে ‘ফুর্তি’ হিসেবে নিয়েছে। তারা ঘটনার পর ফেসবুকে লাইভে এসে আনন্দ প্রকাশ করে। তারাও ভেবেছিল, ঘটনায় তাদের কিছুই হবে না।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার জেরে দেশব্যাপী তোলপাড়ের মধ্যেই পাশের জেলা লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে গত শনিবার দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হলেন এক বিধবা। এ ঘটনায় সোমবার মামলা হলে পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করে। প্রায় প্রতিদিনই দেশে সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে নারী ও শিশুর দলবদ্ধ ধর্ষণের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ৯৭৫ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যেখানে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনাই ঘটেছে ২০৮টি। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার ৪৩ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ১২ জন নারী আর ১৬১ জন নারী হয়েছেন যৌন হয়রানির শিকার। যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদ করতে গিয়ে অপরাধীদের হাতে ১২ জন খুন হয়েছেন (তিনজন নারী ও ৯ জন পুরুষ)।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য মতে, গত বছর ধর্ষণের শিকার হয়েছে মোট এক হাজার ৬০৭ জন। এর মধ্যে একক ধর্ষণের শিকার হয়েছে এক হাজার ৩৭০ জন এবং দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২৩৭ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৭ জনকে। ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছে ১৯ জন।

প্রতিবছর বাড়ছে ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা। আসকের তথ্য মতে, গত বছর এক হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ওই সময় ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৬ জন নারী-শিশুকে এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে ১০ জন নারী-শিশু। এই পরিসংখ্যান ২০১৮ সালের তুলনায় দ্বিগুণ। ওই বছর ধর্ষণের শিকার হয়েছিল ৭৩২ জন। ২০১৭ সালে ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৮১৮টি।

গত বছর যৌন হয়রানিরর শিকার হয়েছে ২৫৮ জন নারী। আগের বছর ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৭০। ২০১৯ সালে যৌন হয়রানির শিকার ১৮ জন নারী আত্মহত্যা করেছে। প্রতিবাদ করতে গিয়ে চারজন নারীসহ ১৭ জন হত্যার শিকার হয়েছে। চলতি বছর শেষে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা গত বছরের সংখ্যাকে স্পর্শ করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য মতে, গত তিন মাসে দেশে ১৮২টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২১টি শিশু। যৌন নির্যাতন ও নিপীড়ন চালানো হয়েছে ৭৭টি শিশুর ওপর।

হিউম্যান রাইট সাপোর্ট সোসাইটির উপদেষ্টা ও আসকের সাবেক প্রধান নির্বাহী নূর খান লিটন বলেন, ‘পেশিশক্তি, অর্থ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে গেছে স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক ক্ষমতা। এখন ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এলাকাভিত্তিক দুর্বৃত্ত দল তৈরি হচ্ছে। ধর্ষণের মতো অনেক অপরাধ গোপন করে এরা রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। কোনো ঘটনা জানাজানি হচ্ছে। এর থেকে বের হতে হলে সবার জন্য সামাজিক শক্তির বিকাশ দরকার। সবার জন্য সমানভাবে আইনের প্রয়োগ করতে হবে। ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা দিয়ে আস্থায় আনতে হবে রাষ্ট্রকে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন্স অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. তানিয়া হক কালের কণ্ঠকে বলেন, সিলেটের এমসি কলেজের ঘটনাটিতেই দেখা যায় যে ধর্ষক বা লাঞ্ছনাকারী কিভাবে উল্লাস করছে। আইন আছে, এর পরও কেন এমন হচ্ছে? কাদের কারণে নারীরা নিরাপদ নয়? মূলত বিচারহীনতা এবং ক্ষমতার প্রভাবে একদল নারীদের আদিম মানসিকতায়ই দেখছে। এদের চিহ্নিত করতে হবে। যেহেতু তাদের সেই বোধ নেই, সেহেতু শক্ত বা দৃষ্টান্তমূলক বিচারের ভয় দেখাতে হবে তাদের।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, ‘অপরাধীচক্র গড়ে উঠে যেন অপরাধ সংঘটিত করতে না পারে, সে জন্য আমরা সব সময়ই কাজ করি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে লোকবল কম থাকায় আমাদের নজরদারি কম, এটা ঠিক। তবে অভিযোগ পেলে আমরা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করি। ঘটনা প্রতিরোধে গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিগত কাজও করে যাচ্ছি আমরা।’

বিজ্ঞাপন

এ জাতীয় আরো খবর