1. [email protected] : admi2017 :
  2. [email protected] : Daily Khabor : Daily Khabor
  3. [email protected] : shaker :
  4. [email protected] : shamim :
রবিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ০৯:৩৯ পূর্বাহ্ন

২৫১ কোটি টাকা আত্মসাতের আসামি এবার গমের টাকা

ডেইলি খবর নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২১
  • ৩৫০ বার পড়া হয়েছে

ডেইলি খবর ডেস্ক: জনতা ব্যাংকের ২৫১ কোট টাকা আত্মসাতের মামলার আসামি এবার গম কেনার টাকা আত্মসাত করেছে। তিনি রাষ্ট্রীয় মনোগ্রাম ও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের প্যাড চুরি করে কর্মকর্তাদের সই-স্বাক্ষর জাল করে প্রতারণাও করছেন। প্রতারনা করে বিভিন্ন ব্যাংক থেকেও কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। তার নাম মো: টিপু সুলতান। তিনি ঢাকা ট্রেড হাউজিং নামে একটি প্রতিষ্ঠানেরও মালিক। পরিবহন জগতে সুপরিচিত টিআর ট্রাভেলসের মালিক তিনি। একাধিক সূত্র জানায় টিপু সুলতানের বাড়ি বগুড়ায় হলেও তিনি ছিলেন খুলনার কুখ্যাত এরশাদ শিকদারের সহযোগী। প্রথমে পাট ও গম ব্যবসায়ী হিসেবে এরশাদ শিকদারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা। পরে এরশাদ শিকদারের ফাঁসির পর তার স্ত্রীকে বিয়ে করে সেই আলোচিত স্বর্ণ কমলের দখল নেন টিপু সুলতান। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও কয়েকটি সরকারি-বেসকারি ব্যাংক টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের বেশ কয়েকটি মামলা করেছে। জনতা ব্যাংকের ২৫১ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় তিনি খুলনার দৌলতপুর থেকে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিলেন।

অভিযোগ উঠেছে, তিনি রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামযুক্ত প্যাড চুরি করে তাতে খাদ্য কর্মকর্তাদের সিল-স্বাক্ষর জাল করে আত্মসাৎ করেন বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (বিডিবিএল) সাড়ে ২২ কোটি টাকা। দুদকের তদন্তে জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ার পর এই মামলায় টিপু সুলতান ও বিডিবিএলের তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চার্জশিটের সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিল করেছেন দুদকের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান।

দুদকের কর্মকর্তারা জানান, বিডিবিএলের ৩০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে টিপু সুলতান ও তিন ব্যাংক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।

দুদকের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার তার প্রতিবেদনে বলেন, ঢাকা ট্রেডিং হাউজ একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। যার স্বত্বাধিকারী মো. টিপু সুলতান। প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে ২০১২ সালের ৩ এপ্রিল খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের মহাপরিচালকের একটি মঞ্জুরিপত্র ইস্যু দেখানো হয়। চুক্তি অনুযায়ী তিনি স্থানীয় বাজার থেকে ১৫ হাজার মেট্রিক টন গম ক্রয়ের আদেশ পান। তিনি এলটিআর (লোন এগেইনস্ট ট্রাস্ট রিসিপ্ট) ফ্যাসিলিটির ওপর অতিরিক্ত ৫ শতাংশ জামানত হিসেবে সমপরিমাণ অর্থের এফডিআর লিয়েন রাখার শর্তে ১৫ শতাংশ সুদে অতিরিক্ত ৩০ কোটি টাকার লোকাল এলসি লিমিট অনুমোদন করতে শাহজালাল ব্যাংকে আবেদন করেন। ২০১২ সালের ২১ মে শাহজালাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৬৭তম সভায় তার আবেদনের বিপরীতে সবোর্চ্চ ৮৫ শতাংশ বাবদ ২৫ দশমিক ৫০ কোটি টাকার এলটিআর ঋণ মঞ্জুর করা হয়। ২০১২ সালের ৪ জুন মঞ্জুরিপত্র ইস্যু করা হলে তার পরদিনই অর্থাৎ ৫ জুন বিডিবিএলে একটি এলসি খোলা হয়। গ্রাহক এলসি নেগোসিয়েশন ব্যাংক হিসেবে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের বিজয়নগর শাখায় ২০১২ সালের ৬ জুন ফরওয়ার্ডিং শিডিউলসহ শিপিং ডকুমেন্টস দাখিল করেন। শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ওই দিনই তা বিডিবিএলে পাঠায়। বিডিবিএলের নোটে বলা হয়, ঢাকা ট্রেডিং হাউজ ২০১২ সালের ৬ জুন পত্রের মাধ্যমে এলসিতে উল্লিখিত মালামাল বুঝে পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে নথি ছাড় করার অনুরোধ করেছে।

দুদকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আগের দিন খোলা এলসিতে পরের দিনই ১৫ হাজার মেট্রিক টন গম বুঝে পাওয়ার বিষয়টি ছিল সন্দেহজনক। পরবর্তী সময়ে বিডিবিএল র্কর্তৃক নিয়োগকৃত অডিট ফার্ম জি. কিবরিয়া অ্যান্ড কোং র্কর্তৃক বিডিবিএলের প্রিন্সিপাল শাখার গ্রাহক মেসার্স ঢাকা ট্রেডিং হাউজের ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যাংকিং পদক্ষেপ নেওয়া এবং সরবরাহকৃত ডকুমেন্টের সত্যতা যাচাই-বাছাই করে। এ লক্ষ্যে ২০১৫ সালের ২০ নভেম্বর পর্যন্ত নিরীক্ষা সম্পন্ন করে খসড়া প্রতিবেদন দাখিল করে সিএ ফার্ম। তাদের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্যাংকে যেসব চুক্তিপত্র ও নথি দাখিল করা হয়েছে তার সবই মনগড়া ও ভুয়া।

দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ঋণ মঞ্জুরির ক্ষেত্রে গ্রাহকের হালনাগাদ আয়করের সনদ দাখিল করা হয়নি। গ্রাহক পরিচিতিতে ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিন) সংযোজন করা হয়নি। কেওয়াসির পরিচয়দানকারী তথ্যও সঠিক নয়। ব্যাংকের তথ্যে গ্রাহক টিপু সুলতানের বাবার নাম এবং জাতীয় পরিচয়পত্রে উল্লেখ করা টিপু সুলতানের বাবার নাম এক নয়। ২০১২ সালের ৩ এপ্রিল ঢাকা ট্রেডিং হাউজ একটি এলটিআর অ্যাকাউন্ট খোলে এবং ৯ এপ্রিল ওই ঋণসংক্রান্তে ২৫ কোটি টাকা অনুমোদন হয় এবং একই দিন সাড়ে ২২ কোটি টাকা ছাড় দেওয়া হয়। ২৫ কোটি টাকার ঋণ দ্রুততার সঙ্গে অনুমোদন দেওয়া হয়। ঋণ অনুমোদনের আগে গ্রাহকের পরিশোধ প্রক্রিয়া, দক্ষতা ও সক্ষমতা যাচাই করা হয়নি। যে সমঝোতা স্মারকের জন্য ঋণটি দেওয়া হয়, তা পরবর্তী সময়ে জাল ও ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। ১৫ হাজার মেট্রিক টন পণ্য এক দিনে একটি ট্রাকে পরিবহন দেখানো হয়েছে, যা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ওই এলটিআরের বিপরীতে কোনো টাকা পরিশোধ হয়নি এবং ঋণটি বর্তমানে শ্রেণিকৃত অবস্থায় আছে, যার বিপরীতে মর্টগেজ নেই বললেই চলে। ফলে এই ঋণ পরিশোধ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

দুদকের প্রতিবেদন মতে, ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রকিউরমেন্ট) মো. বদরুল হাসানের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তিনি টিপু সুলতান বা ঢাকা ট্রেডিং হাউজের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতা স্মারক সই করেননি। এ ছাড়া ২০১৫ সালের ২৬ জানুয়ারি অধিপ্তরের জে. কিবরিয়া অ্যান্ড কোম্পানির চার্টার্ড অ্যাকাউন্টসের বিশেষ অডিট রিপোর্ট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ওই ঋণটি প্রতারণা এবং জালিয়াতির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। এর সঙ্গে ওই ব্যাংকের কর্মকর্তারা সরাসরি জড়িত। এ ছাড়া তারা খাদ্য অধিদপ্তর ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’ লিখিত ছাপানো মনোগ্রামযুক্ত প্যাডের পাতা গোপনে ও সুকৌশলে চুরি করে তাতে ভুয়া সই-স্বাক্ষর দেন।

দুদক সরেজমিন পরিদর্শনকালে ঢাকা ট্রেডিং হাউজকে কথিত ১৫ হাজার মেট্রিক টন গম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এসপিএস করপোরেশনের ঠিকানায় এই নামে কোনো প্রতিষ্ঠান খুঁজে পায়নি। যে বিশাল দানব আকৃতির ট্রাক দিয়ে ১৫ হাজার মেট্রিক টন গম এক দিনেই পরিবহন দেখিয়েছেন, সেই ট্রাক কোম্পানির কোনো অফিসও খুঁজে পাওয়া যায়নি। হিলি ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি নামের কোনো পরিবহন সংস্থা কখনোই হিলিতে ছিল না মর্মে সেখানকার পৌরসভা মেয়র লিখিতভাবে জানিয়েছেন। এ ছাড়া বিডিবিএলের তিন সদস্যের একটি টিম এসপিএস করপোরেশন ও হিলি ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির যে ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে তার কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই ঋণের বিপরীতে কোনো জামানতও পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় তদন্ত কর্মকর্তা টিপু সুলতান, বিডিবিএলের প্রিন্সিপাল শাখার সাবেক এসপিও দীনেশ চন্দ্র সাহা, এজিএম দেওয়ান মোহাম্মদ ইসহাক ও অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার সৈয়দ নুরুর রহমান কাদরীর বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন চেয়ে প্রিিতবেদন দিয়েছেন।

দুদক কর্মকর্তারা জানান, ২০১৬ সালে জনতা ব্যাংক থেকে চাল-ডাল আমদানির নামে ২৫১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন টিপু সুলতান। তিনি ২০১০ সালের ১ মার্চ জনতা ব্যাংকের দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকা শাখায় চলতি হিসাব খোলেন। চিনি, ক্রিস্টাল চিনি ও ডাল আমদানির জন্য একই শাখায় পাঁচটি এলসি খুলে মাত্র ১৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা জামানত রেখে এবং ২৬৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ঋণ নেন। এ ঘটনায় দুদক তার বিরুদ্ধে মামলা দেয় এবং তাকে গ্রেপ্তার করে।

কে এই টিপু সুলতান : টিপু সুলতান খুলনায় থাকলেও তিনি বগুড়া শহরের দক্ষিণ চেলোপাড়া এলাকার বাসিন্দা। অনুন্ধানে নেমে তার সম্পর্কে পাওয়া গেছে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। বিডিবিএলের একাধিক কর্মকর্তা জানান, তিনি ছিলেন বিডিবিএলের সাবেক এমডি জিল্লুর রহমানের বন্ধু। সেই সুবাদে বিডিবিএল থেকে অবারিত সুধিবা পান টিপু। তার গ্রামের বাড়ি বগুড়ায় হলেও তিনি থাকতেন খুলনায়। একসময় খুলনার আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন এরশাদ শিকদারের ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ শুরু করেন টিপু। এরশাদ শিকদারের টাকায় তিনি টিআর ট্রাভেলস নামে দেশের বিভিন্ন রুটে বাস নামান। টিপুর বিরুদ্ধে নানা অপরাধমূলক কাজে জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে দুদক। এরশাদ শিকদারের ফাঁসির পর তার স্ত্রী শোভাকে বিয়ে করেন টিপু। তার দখলে চলে আসে এরশাদ শিকদারের সেই আলোচিত প্রাসাদ ‘স্বর্ণকমল’। এখনো তিনি সেই বাড়িতেই শোভাকে নিয়ে থাকেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

দুদক কর্মকর্তারা আলাপকালে জানান, টিপু সুলতান টিআর ট্রাভেলসের মালিক। এই পরিবহন ঢাকা থেকে খুলনা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বগুড়া রুটসহ দেশের বিভিন্ন রুটে চলাচল করে। বিডিবিএলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে তিনি টিআর ট্রাভেলসে বিনিয়োগ করেন।বর্তমানে বিডিবিএলে শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায় তার নাম। এই ব্যাংক তার কাছে পাবে ৭৫ কোটি টাকা। ব্যাংকের ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের দ্বিতীয় ও পঞ্চম নামটি টিপু সুলতানের প্রতিষ্ঠান। ঢাকা ট্রেডিং হাউজের নামে ২০১২ সালে বিতরণ করা এ ঋণের বর্তমান স্থিতি ৪২ কোটি টাকা। টিপু সুলতানের বাড়ি বিডিবিএলের সাবেক এমডি জিল্লুর রহমানের এলাকায় হওয়ার সুবাদে অবাধে ঋণসুবিধা পেয়েছে এ প্রতিষ্ঠান। রাজধানীর পল্টনের আল-রাজী কমপ্লেক্সে প্রতিষ্ঠানটির দাপ্তরিক কার্যালয়। টিপু সুলতানের মালিকানাধীন আরেক প্রতিষ্ঠান টিআর স্পেশালাইজড কোল্ড স্টোরেজ ব্যাংকের পঞ্চম শীর্ষ খেলাপি। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকের পাওনা ১৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। এই প্রতিষ্ঠানটি বগুড়ায়। নিজ জেলায় বিশিষ্ট পাট ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিতি তার।

টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর মামলা করেছে এবি ব্যাংক। বুধবার বগুড়ার অর্থঋণ আদালতে এবি ব্যাংক বগুড়া শাখার অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আবুল কালাম আজাদের করা মামলায় বলা হয়, ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এবি ব্যাংক লিমিটেড বগুড়া শাখা থেকে প্রায় ৭৬ কোটি টাকা ঋণ নেন পরিবহন ব্যবসায়ী টিপু সুলতান। গম আমদানির জন্য তার নিজ প্রতিষ্ঠান মেসার্স আব্দুল মালেক মন্ডল অ্যান্ড সন্সের নামে ওই ঋণ নেন তিনি। এবি ব্যাংকের বগুড়া শাখায় ৭০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা খেলাপি ঋণ ছিল তার। এসব বিষয়ে টিপু সুলতানের বক্তব্য নেওয়ার জন্য বগুড়া ও খুলনায় যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য জানা যায়নি।

বিজ্ঞাপন

এ জাতীয় আরো খবর