শনিবার, ২১ মার্চ, ২০২৬, ৬ চৈত্র ১৪৩২

সাংবাদিকতার দুরবস্থা

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: মার্চ ২০, ২০২৬, ০১:৪০ পিএম

সাংবাদিকতার দুরবস্থা

শংকর মৈত্র: বেশ আগে সাংবাদিকদের এক আড্ডায়, বড় একটা মিডিয়া হাউজের একজন বড় সাংবাদিক কি কি নিউজ করা হচ্ছে না, রিপোর্টাররা কেনো খাটতে চায় না, অনুসন্ধান করতে চায় না এমন নানা জ্ঞানমিশ্রিত ক্ষোভমিশ্রিত বাক্য বর্ষণ করতে থাকলেন। 
আমি উনার নিউজ আইডিয়া, মেধার প্রশংসা করে বললাম ভাই সবকিছুই ঠিক আছে। রিপোর্টারদের দোষ দিয়ে কি লাভ? তারা তো ভালো ভালো রিপোর্ট নিয়ে আসে। কিন্তু প্রচার বা প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। নিউজ ম্যানেজমেন্ট তা করতে দেয় না। আপনিই প্রচার করবেন না। করলে আপনারও চাকরি থাকবে না রিপোর্টারেরটাতো নগদ শেষ হয়ে যাবে।
তিনি বেশ বিরক্তির সুরে বললেন সেটা আবার কেমন কথা!
বললাম সেটাই সত্য কথা। উদাহরণ দিয়ে বললাম আপনার মালিক শীর্ষ ঋণ খেলাপি। ব্যাংক লুটেরা। দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম তসরুফকারি। ব্যাংক খাতের দুর্নীতি নিয়ে রিপোর্ট করতে চাইলে প্রথমেই আপনার মালিকের নাম আসবে। এই রিপোর্ট যদি অনুসন্ধান করে রিপোর্টার দেয়, আপনি কি তা প্রচার করবেন?
আমার প্রশ্নে তিনি চুপসে গেলেন। বললেন, সবতো আর প্রচার করা যায় না। মালিক আর প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ তো থাকবেই। তাই বলে কি অন্য রিপোর্ট হবে না!
বললাম, ধীরে বড় ভাই। "আপনি আচরি ধর্ম, পরেরে শেখাও।" যেটা নিজে করতে পারবেন না সেটা অন্যের ওপর ফলাতে যাবেন কেনো?
দুর্নীতির নিউজ চাইবেন,রিপোর্টার এনে দেবে আর নিজের স্বার্থের বাইরে গেলেই সেটা প্রচার করবেন না, তা তো হতে পারে না। সেটা তো সাংবাদিকতা না। 
অন্য রিপোর্টের সঙ্গেও তো অন্য মালিকের স্বার্থ থাকতে পারে। আপনি যেমন ব্যাংক খাত নিয়ে রিপোর্ট করতে দেবেন না আরেক মিডিয়া ওষুধ ব্যবসার জালিয়াতি, করফাঁকি নিয়ে রিপোর্ট করতে দেবে না। 
বললাম আমি এমন টেলিভিশন মিডিয়ায় কাজ করে এসেছি যেখানে প্লাস্টিক পণ্যের গুণগান গেয়ে প্রতি সপ্তাহে  রিপোর্ট করতে হতো। অথচ প্লাস্টিক মাটির জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু আমাকে রিপের্ট প্রচার করতে হয়েছে ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্তে। কারণ মিডিয়ার মালিক প্লাস্টিক ব্যবসায়ি।
কাজেই রিপোর্টার, সাংবাদিককে দোষে লাভ নেই। আমাদের অনেক মেধাবী রিপোর্টার আছে,সাংবাদিক আছে। অনেক অনুসন্ধানি রিপোর্টার আছে। যারা ভালো ভালো রিপোর্ট করতে চায়। মেধা যোগ্যতার প্রমাণ রাখতে চায়। অনেক তথ্য প্রমাণ তারা যোগাড় করে। কিন্তু তাদের কাজের সুযোগ নেই। কাজে লাগানো যাচ্ছে না।  এই দোষ তো সাংবাদিকের না, রিপোর্টারের না। এটার দায় মিডিয়া কর্তৃপক্ষের, রাষ্ট্রের। 
মিডিয়াকে কেউ স্বাধীনতা দেবে না। কারণ 
বড় বড় সব মিডিয়াই নিজেদের স্বার্থ নিয়ন্ত্রিত। সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় না। সবারই কোনো না কোনো ভাবে ব্যাবসায়িক স্বার্থ রয়েছে। কেউ গার্মেন্ট ব্যবসায়ি,কেউ ওষুধ ব্যবসায়ী, কেউ লোহা লক্করের ব্যবসায়ি, কেউ প্লাস্টিক ব্যবসায়ি। বড় বড় সব মিডিয়ার মালিক ব্যবসায়ি। আর বাংলাদেশের ব্যবসার মূল ধরন হলো রাষ্ট্রের কর ফাঁকি দেয়া। এ ক্ষেত্রে তাদের প্রধান সহায়ক সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা। কাজেই মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারকে সাংবাদিকদের ওপর প্রভাব বিস্তার করার দরকার পরে না। মিডিয়ার মালিকদের বলে দিলেই হয়। আর মালিকদেরও বলতে হয় না, বরং মালিকদের মিডিয়া কর্মীরা চেনে।  কে কি ব্যবসা করেন, সরকারের কোন কোন দপ্তরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সবই জানা। নিউজে অটো সেন্সর চলে আসে। 
এ জন্য বলি নিউজ হয়," পিক এন্ড চুজের ভিত্তিতে।"  সাংবাদিক চাইলেই তার স্বাধীন সত্ত্বায়, পেশাদারিত্বের সঙ্গে কোনো নিউজ করতে পারেন না। লিখতে পারেন না।
সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান বলতে যা ভাবা হতো তার কি অবস্থা সেটা তো মানুষ দেখছেই। বাঘা বাঘা বাংলা, ইংরেজির সম্পাদকরা কি ভাবে ক্ষমতাসীন নেতাদের তোষামোদি করেন, তেল মারেন সেটা দেখা হয়েছে। 
যে সরকার যখন ক্ষমতায় থাকে তখন সেই সরকারকে তোষামোদি করেই মিডিয়ার চলতে হয়। এটার কারণ মিডিয়ার "ব্যবসায়ি মালিক।" স্বাধীন সাংবাদিকতা বলতে কিছু নেই। আর দশজনের মতো সাংবাদিকরাও এখন চাকরি করে। 
বড় বড় অনিয়ম দুর্নীতি নিয়ে নিউজ করা যায় না বলেই দারোগার ঘুষের নিউজ, ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজি নিউজ, ইউএনওপর পরকীয়ার নিউজ এসব ছাপা হয়, ভাইরাল হয়। মানুষ এসব নিয়েই মজে থাকে।
এ অবস্থার অবসান হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখছি না। রাষ্ট্রের সব অর্গানের মতো মিডিয়ারও একই অবস্থা। অনুসরণ করার মতো সাহসী কোনো সম্পাদক দেখছি না। চেনাজানা সবাই খয়ের খাঁ।
মিডিয়ার মালিকানা পেশাদার সাংবাদিকদের হাতে না আসা পর্যন্ত এই সেক্টরের পরিবর্তন আসবে না। বরং আমি আতঙ্কিত আগের আমলের চেয়ে এখন আরো ভয়াবহ দলদাস সাংবাদিকতার সৃষ্টি হচ্ছে।  আগে যাও রয়ে সয়ে বলা হতো এখন সরাসরি অ্যক্টিভিজম চলছে । সম্পাদক,হেড অব নিউজ এমন পদে এমন লোকজন জড়ো হয়েছেন তারা দলীয় অ্যক্টিভিষ্টের মতো আচরণ করছেন।  প্রতিষ্ঠানে, সোস্যাল মিডিয়ায় সর্বত্র এটা পরিলক্ষিত হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতারাও এসব দেখে লজ্জিত হন, বিরক্ত হন। আর সাধারণ মানুষতো গালমন্দ করেই।পৃথিবীর আর কোনো দেশে এমন সাংবাদিকতা,এমন মিডিয়া মালিক আছে কী না আমি জানিনা। #

(শংকর মৈত্র: সাংবাদিক, কলামিস্ট)।

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!