বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল, ২০২৬, ২৫ চৈত্র ১৪৩২

বিশ্লেষণ: ট্রাম্পের আদেশ অমান্য নাকি যুদ্ধাপরাধ, দ্বিধায় মার্কিন কর্মকর্তারা/ দ্য গার্ডিয়ান

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: এপ্রিল ৮, ২০২৬, ১০:০৩ এএম

বিশ্লেষণ: ট্রাম্পের আদেশ অমান্য নাকি যুদ্ধাপরাধ, দ্বিধায় মার্কিন কর্মকর্তারা/ দ্য গার্ডিয়ান

ডেইলি খবর ডেস্ক: ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি মার্কিন কর্মকর্তাদেরকে এক জটিল পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে। তারা প্রেসিডেন্টের আদেশ পালনের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধে সহায়তা করবেন নাকি অমান্যের পথ বেছে নেবেন- সে দ্বিধা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ড কাঠামোর কাছে এটি এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আক্রমণাত্মক ভাষায় দেওয়া হুমকিতে ট্রাম্প ইরানের জন্য মঙ্গলবার রাত ৮টাকে (বাংলাদেশ বুধবার ভোর ৬টা) সময়সীমার শেষ মুহূর্ত হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ সেতু উড়িয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। 
প্রায় ৯ কোটি মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষতি করা হলে তা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও কোনো দ্বিমত নেই। তারা বলছেন, অলঙ্কারিক হুমকি যদি কার্যকর করা হয় তবে সেটি হবে সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধ। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি স্কুল অব ল-এর অলাভজনক সংস্থা জাস্ট সিকিউরিটির ওয়েবসাইটে সোমবার সাবেক দুই সামরিক আইনজীবী মার্গারেট ডোনোভান ও র‌্যাচেল ভ্যানল্যান্ডিংহাম লিখেছেন, প্রেসিডেন্টের বক্তব্য সামরিক বাহিনীর সদস্যদের এক জটিল পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া এই দুই সাবেক আইনজীবী লিখেছেন, সামরিক সদস্যদের আইনি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিন্তু প্রেসিডেন্ট যেসব কথা বলছেন তা ওই প্রশিক্ষণের নীতির পরিপন্থী। কয়েক দশকের চর্চিত নীতি লঙ্ঘন হলে সৈন্যদের আগের আদর্শিক জায়গায় ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব।
সাবেক সামরিক আইনজীবীরা আরও লিখেছেন, বোমা মেরে ইরানকে প্রস্তর যুগে পাঠানোর বিষয়ে প্রেসিডেন্টের দম্ভোক্তি এবং কাউকে ছাড় না দেওয়ার বিষয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের নির্দেশ শুধু অবৈধ নয়, এটি সামরিক নৈতিকতা ও আইনি নীতিগুলোর চরম লঙ্ঘন।
যুদ্ধাপরাধ থামানো সম্ভব? ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস আমহার্স্টের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক চার্লি কার্পেন্টার বলছেন, আদেশ নিয়ে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের প্রশ্ন তোলা বা অমান্য করার অনেক উদাহরণ ইতিহাসে আছে। এসব ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে অবাধ্যতা প্রদর্শন অথবা যুদ্ধাপরাধ ঠেকাতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। 
১৯৬৮ সালে ভিয়েতনামের ‘মাই লাই’ হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ টেনে চার্লি কার্পেন্টার জানান, অনেক মার্কিন সেনা তখন গণহত্যায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। ভিয়েতনামের শত শত গ্রামবাসীকে গুলি করে হত্যার নির্দেশ দেওয়া সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট উইলিয়াম ক্যালি কোর্ট মার্শালে (সামরিক আদালত) যুক্তি দিয়েছিলেন, তিনি কেবল আদেশ পালন করেছেন। কিন্তু আদালত সেই যুক্তি খারিজ করে রায়ে বলেন, আদেশটি অবৈধ হওয়ায় এটি কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের পথ হতে পারে না।
এখন প্রশ্ন হলো, যেসব সামরিক কর্মকর্তা ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সেতুগুলোতে বোমা হামলার আদেশ বা নির্দেশ পালন করবেন, তারা কি ক্যালির মতো একই যুক্তি দিতে পারবেন? গত নভেম্বরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা। এতে বলা হয়, ‘আপনারা অবৈধ আদেশ প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। আপনাদের অবশ্যই অবৈধ আদেশ প্রত্যাখ্যান করতে হবে।’ এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ডেমোক্র্যাট সদস্যদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক আচরণের অভিযোগ আনেন। পাশাপাশি বলেন, ‘এটি মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ।’
অধ্যাপক কার্পেন্টার বলছেন, যুদ্ধাপরাধ থামানোর জন্য ‘না’ বলা বা রুখে দাঁড়ানো অনেক কারণেই কঠিন হয়ে যায়। বিশেষ করে যখন আইনের ক্ষেত্রে কিছু ‘গ্রে এরিয়া’ বা অস্পষ্টতা থাকে।
পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার কে ঠেকাবে? যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ট্রাম্পের মরিয়াভাব ও ক্রমবর্ধমান হুমকি ভিন্ন এক আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে। সেটি হলো- অস্থিরচিত্তের এই প্রেসিডেন্ট হয়তো পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের চেষ্টা করতে পারেন।

মার্কিন ব্যবস্থা অনুযায়ী, পারমাণবিক হামলার নির্দেশ দেওয়ার একক ক্ষমতা কেবল প্রেসিডেন্টের হাতে। এই নির্দেশ দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্টকে ‘ন্যাশনাল মিলিটারি কমান্ড সেন্টার’-এর জরুরি নিরাপত্তা বৈঠক ডাকতে হয়। সেখানে সাধারণত প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানের মতো শীর্ষ কর্মকর্তারা যোগ দেন। 
রীতি অনুযায়ী, বৈঠকে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে থাকা একজন সামরিক সহকারী ‘নিউক্লিয়ার ফুটবল’ নামের ব্রিফকেস খোলেন। এতে সাধারণত পারমাণবিক হামলার বিভিন্ন বিকল্প এবং প্রেসিডেন্টের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় কোড বা সংকেত থাকে। হামলার জন্য প্রেসিডেন্টের আদেশ ঠেকানোর একমাত্র উপায় হলো- কমান্ড চেইনে থাকা কর্মকর্তাদের দ্বারা সেই আদেশটিকে ‘অবৈধ’ বলে গণ্য করা।
২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ছিলেন জেনারেল মার্ক মিলি। তিনি ট্রাম্পের অস্থিরতা নিয়ে প্রায়ই উদ্বেগের মধ্যে থাকতেন। এই উদ্বেগ থেকে সে বছরের জানুয়ারিতে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বলেছিলেন- যেকোনো পারমাণবিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাঁকে যেন অবশ্যই বৈঠকে রাখা হয়।
ক্যালিফোর্নিয়ার মন্টেরি মিডলবারি ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞ জেফ্রি লুইস বলেন, ‘ট্রাম্প আগে পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতাকে গুরুত্ব দিতেন বা শ্রদ্ধা করতেন। কিন্তু এখন তিনি যুদ্ধ ও মানসিক ভারসাম্য উভয়ই হারাচ্ছেন। এ অবস্থায় পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতার প্রতি শ্রদ্ধা কতটুকু টিকে থাকবে- তা নিয়ে সন্দেহ আছে।’ 
‘দ্য টোয়েন্টি টোয়েন্টি কমিশন রিপোর্ট অন দ্য নর্থ কোরিয়ান নিউক্লিয়ার অ্যাটাকস অ্যাগেইন্সট দ্য ইউনাইটেড স্টেটস’ নামে ২০১৮ সালে জেফ্রি লুইসের একটি বই প্রকাশ হয়। সেখানে তিনি ট্রাম্পের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে যুদ্ধ শুরুর মতো একটি কাল্পনিক পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন। 
বইটির এক পর্যায়ে দেখা যায়, প্রেসিডেন্টকে নিউক্লিয়ার ফুটবলে হাত দিতে এক সামরিক সহকারী বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছেন এবং পরে এ কারণে তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এ প্রসঙ্গ ধরে লুইসের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল- বর্তমান কমান্ড চেইনে ট্রাম্পকে থামানোর মতো কেউ কি আছেন? জবাবে লুইস বলেন, ‘একদমই না। তিনি (ট্রাম্প) পরিকল্পিতভাবে সামরিক বাহিনী থেকে বাধা দেওয়ার মতো প্রত্যেককে সরিয়ে দিয়েছেন।’

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!