শনিবার, ০৫ এপ্রিল, ২০২৫, ২২ চৈত্র ১৪৩১

ট্রাম্পের শুল্ক মোকাবিলায় বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর পথ খোঁজছে বাংলাদেশ-বাণিজ্য উপদেষ্টা

ব্যবসা-বাণিজ্য ডেস্ক

প্রকাশিত: এপ্রিল ৫, ২০২৫, ০১:২৩ পিএম

ট্রাম্পের শুল্ক মোকাবিলায় বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর পথ খোঁজছে বাংলাদেশ-বাণিজ্য উপদেষ্টা

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের ৪০ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি শিল্পে বড় ধরনের আঘাত আসতে পারে। এই ধাক্কা সামলাতে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চাইছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর পথ খোঁজা হচ্ছে।বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তারা মার্কিন সংবাদমাধ্যম বøুমবার্গকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে ধার্য হওয়া শুল্ক কমাতে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত কমানোর উপায় খুঁজছে বাংলাদেশ। ট্রাম্প প্রশাসন যে কয়েকটি দেশের ওপর সর্বোচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করেছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ একটি। এই পদক্ষেপ বস্ত্র রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিতে পারে।এক সাক্ষাৎকারে বøুমবার্গকে অন্তর্র্বতী সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন বলেন, ‘আমরা ঘাটতি কমানোর সুযোগগুলো সক্রিয়ভাবে খতিয়ে দেখছি।’
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই তৈরি পোশাক। একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পোশাক ক্রেতা। ফলে এই শিল্পের ওপর আঘাত লাগলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। গত বছর ছাত্র–জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে দেশ।
যুক্তরাষ্ট্র আরোপিত নতুন শুল্ক পণ্যভিত্তিক মানদন্ডের পরিবর্তে দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতির ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়েছে। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, এই পদ্ধতি বাংলাদেশের মতো বাণিজ্য উদ্বৃত্ত থাকা অনেক ছোট অর্থনীতির দেশের জন্য অন্যায্য।শুল্কের প্রভাব মূল্যায়ন করতে বাংলাদেশ সরকার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোসহ মূল অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর উপায়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলাসহ অন্যান্য পণ্য আমদানি বাড়ানো।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি বিজিএমইএর প্রশাসক আনোয়ার হোসেন ব্লুমবার্গকে বলেন,আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি বাড়াতে পারি, তবে আমেরিকান তুলার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।এর আগে গত ১৭ মার্চ পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন জানান, কৌশলগত কারণে বাংলাদেশের অন্তর্র্বতী সরকার যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানির পরিকল্পনা করছে। তিনি বলেন,ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করেছে। বাংলাদেশ আগেই শুল্কের আওতায় রপ্তানি করলেও অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঝুঁকি সব সময় থাকে। আমরা যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি করি এবং সেই তুলা দিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি করি, তাহলে তারা আমাদের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করতে দ্বিধাগ্রস্থহবে।’
গত ২৭ মার্চ দেশীয় সুতাশিল্পের সুরক্ষায় স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।ওয়ালমার্ট এবং গ্যাপ ইনকরপোরেটেডের মতো বড় মার্কিন খুচরা বিক্রেতারা প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে বিলিয়ন ডলার মূল্যের পোশাক কেনে। আনোয়ার হোসেনের মতে, শুল্ক বৃদ্ধি তাদের ক্রয় কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে।যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেনটেটিভ তথা বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী,২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে দেশটির রপ্তানি দেড় শতাংশ কমে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
মুম্বাইয়ে বøুমবার্গ ইকোনমিকসের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক অর্থনীতিবিদ অঙ্কুর শুক্লা মনে করেন,এই শুল্কের কারণে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য আইএমএফ নির্ধারিত ঋণ কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি লিখেছেন,এটি এই দেশগুলোতে তহবিলের ঋণকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, যা প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেবে।’তবে বাংলাদেশের জন্য কিছুটা ইতিবাচক দিকও রয়েছে। পোশাক খাতে দেশের প্রতিদ্ব›দ্বী শ্রীলঙ্কা (৪৪ শতাংশ) এবং ভিয়েতনামের (৪৬ শতাংশ) তুলনায় বাংলাদেশের শুল্কের হার কম (৩৭ শতাংশ)। এ বিষয়ে অঙ্কুর শুক্লা বলেন, এটি ‘বাংলাদেশকে একটি তুলনামূলক সুবিধা দিতে পারে এবং কিছু বাজারের হিস্যা দখল করতে সাহায্য করতে পারে।কর্মকর্তারা বলছেন,পারস্পরিক বাণিজ্য আলোচনার অংশ হিসেবে শুল্ক সমন্বয়ের সুযোগ থাকতে পারে। তবে নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বতী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য বশির উদ্দিনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে ‘মেঘ জমেছে’। তিনি আরও বলেন,এটি আর দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়, এটি একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সুনামি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!