মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩

সারাদেশে গরম বাড়ার সাথে ফের বেড়েছে লোডশেডিং

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৬, ০৯:৩৬ এএম

সারাদেশে গরম বাড়ার সাথে ফের বেড়েছে লোডশেডিং

ডেইলি খবর ডেস্ক: দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কয়েক দিন সহনীয় থাকার পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবারও বেড়েছে লোডশেডিং। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবনে নেমে এসেছে দুর্ভোগ। গ্যাস সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। শিশু, বৃদ্ধ ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি। বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়ছে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও। কারখানার উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয় কমেছে।

চলতি গরমে বিদ্যুতের চাহিদা এক পর্যায়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। তখন গড় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার থেকে সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াট। বিপরীতে গড়ে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। গত ১০ আগস্ট স্মরণকালের সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়।

চলতি মাসের শুরুতে তাপমাত্রা কিছুটা কমায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াটে নেমে আসে। ফলে লোডশেডিংও কিছুটা কমেছিল। তবে গরম আবার বাড়তে শুরু করায় বিদ্যুতের চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লোডশেডিংও বাড়ছে।

গতকাল সোমবার দুপুর ৩টায় লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২১৬ মেগাওয়াট। ওই সময় বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। সারাদিন গড়ে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে।
এর আগের দিন রোববার সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ১২২ মেগাওয়াট। শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৮০৬ মেগাওয়াট। ওই সময় লোডশেডিং হয় ২ হাজার ২০২ মেগাওয়াট।

শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কোনো লোডশেডিং ছিল না। ওই সময়ে বিদ্যুতের গড় চাহিদা ছিল ১২ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি। তবে এর আগে ও পরে লোডশেডিং হয়েছে। ওই দিন রাত ১টায় লোডশেডিং ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়।

কমেছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন-দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা প্রায় সাড়ে ছয় হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু কয়লা সংকট ও বিভিন্ন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে ৪ হাজার ৬০০ থেকে ৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট।

১ হাজার ২৩৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কয়লা সংকটের কারণে বর্তমানে মাত্র ৪৫০ থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
একই কারণে ১ হাজার ১৭০ মেগাওয়াট সক্ষমতার পটুয়াখালী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রেও প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট কম উৎপাদন হচ্ছে। কেন্দ্রটির এক কর্মকর্তা জানান, কয়লা আমদানিতে বড় কোনো সংকট নেই। তবে পর্যাপ্ত কয়লা মজুত করার আগেই বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে কেন্দ্রটি চালু করা হয়েছে। ফলে কোনো কারণে কয়লা আসতে কিছুটা দেরি হলেই সংকট তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে, সময়মতো সংস্কার (ওভারহোলিং) না করার কারণে ১ হাজার ১৬৩ মেগাওয়াট সক্ষমতার পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন নেমে এসেছে ৫৭০ মেগাওয়াটে। কেন্দ্রটির দুটি ইউনিটের রক্ষণাবেক্ষণ শেষ করতে প্রায় ২০ দিন বন্ধ রাখতে হবে। গরমে তীব্র চাহিদার কারণে কেন্দ্রটি বন্ধ করা হয়নি। এ মাসের শেষ পর্যায় ক্রমে দুই ইউনিট ওভারহোলিং করা হবে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দীর্ঘদিন ধরে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।

এদিকে, ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আদানি পাওয়ার থেকে সাধারণত প্রায় ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও বর্তমানে দৈনিক গড়ে মিলছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট। তাদেরও কয়লা সংগ্রহে জটিলতার কারণে উৎপাদন কম হচ্ছে বলে জানা গেছে। পাহাড়ি ঢলের কারণে নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বন্ধ রয়েছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, রামপালের কয়লা সংকট চলতি সপ্তাহের মধ্যে দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর জন্য নিয়মিত তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। তবে অতিবৃষ্টি ও কয়লা পরিবহনের রেলপথে সংকটের কারণে তারা চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ বাড়াতে পারছে না।

গ্যাস সংকটেও বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে-বিদ্যুৎ সংকটের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়া। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে দেশে দৈনিক মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ৩১৬ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাস সরবরাহ ছিল ২৫৭ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট। বর্তমানে দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ নেমে এসেছে ১৬২ কোটি ঘনফুটে।

দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা ১২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট। এসব কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে দৈনিক প্রায় ২৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু সংকটের কারণে গ্রীষ্মে কমবেশি ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল। এতে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয়। বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ আরও কমে প্রায় ৮৫ কোটি ঘনফুটে নেমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের নিচে চলে গেছে।

চলতি মাসে কার্গোর জটিলতা কমতে পারে-দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে দৈনিক ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা থাকলেও সময়মতো কার্গো না আসায় কয়েক দিন ধরে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ৭০ থেকে ৭১ কোটি ঘনফুট। দেশীয় গ্যাস ও এলএনজি মিলিয়ে বর্তমানে মোট সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২৩২ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে সরকারি হিসাবে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। বাস্তবে এ চাহিদা প্রায় ৫০০ কোটি ঘনফুটের ওপরে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় প্রয়োজন অনুযায়ী এলএনজি কার্গো আমদানি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানির ব্যয়ও দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।

চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশে ৬৮টি এলএনজি কার্গো এসেছে। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ৭১টি। জুলাই ও আগস্টে এসেছে ১৫টি, যেখানে গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ২১টি কার্গো। এর মধ্যে একটি এলএনজি টার্মিনাল অগ্নিকাণ্ডের কারণে ১৬ দিন বন্ধ থাকায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে গরম অব্যাহত থাকলে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকার আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এ দুই মাসে অন্তত ২০টি এলএনজি কার্গো প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী কার্গো নিশ্চিত করাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী ১৩-১৪ সেপ্টেম্বর থেকে এলএনজি সরবরাহ বাড়িয়ে দৈনিক গড়ে ৯৫ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুটে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বর্তমানের তুলনায় প্রায় ২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস বেশি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। চলতি মাসে সাতটি এলএনজি কার্গোর নিশ্চয়তাও পাওয়া গেছে। পেট্রোবাংলার পরিচালক প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানান, চলতি মাসের কার্গো নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো জটিলতা নেই। অক্টোবরের কার্গোগুলোও যাতে সময়মতো দেশে আসে, সে চেষ্টা চলছে।ফাইল ছবি

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!