পর্যটকের উপস্থিতিতে গিজ গিজ করছে সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার। বিশে^ও বৃহতম সমুদ্রসৈকতের কক্্রবাজারের লাবণী পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্টের দূরত্ব আনুমানিক দেড় কিলোমিটার। এ দূরত্বের মধ্যে সৈকতের সি গাল, সুগন্ধা নামের আরো দুই পয়েন্ট রয়েছে। সব জায়গায়ই পর্যটকের উপস্থিতিতে মুখরিত সমুদ্র বিলাসী মানুষের আনাগোনায়।গত তিন দিন সকাল থেকে টানা সন্ধ্যা পর্যন্ত এ দেড় কিলোমিটার এলাকা মুখরিত ছিল পর্যটকের উচ্ছ্বাসে। দুপুরে একটু গরম থাকলেও ওই গরম কোনো পর্যটকের ক্লান্তির কারণ হতে পারেনি। সৈকতের শীতল হাওয়া আর নীল জলরাশিতে শরীর ভিজিয়ে যেন মুছে নিচ্ছে যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি।
এদিকে প্রতি বছরের মতো এবারের ঈদের ছুটিতেও বান্দরবানের প্রাকৃতিক অপূর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্যের টানে জেলার বিভিন্ন পর্যটন স্পটে পর্যটকরা আসতে শুরু করেছেন দলে দলে। কক্সবাজারে সাগরে স্নান ছাড়াও পর্যটকরা নিজেদের মতো আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে ছিল। কিটকটে (বিচ ছাতা) বসে দিগন্তবিহীন সাগরের জলের খেলা আর হাওয়া উপভোগ করেছে যেমন। তেমনি সৈকতের বালিয়াড়িতে ছোটাছুটি, বিচ বাইক, ওয়াটার বাইক, ঘোড়ায় চড়ে মুঠোফোনে ছবি তুলে স্মৃতির বাঁধনে রেখেছে অনেকেই।
ঈদের তৃতীয় দিন বুধবার সৈকতে দেখা মিলেছে পর্যটকের এমন উচ্ছ্বাস। সবক’টি পয়েন্ট পর্যটকের উপস্থিতিতে ছিল লোকারণ্য। আর এ উচ্ছ্বাসে পর্যটকের ভোগান্তি বা বিরক্তের কারণ ছিল আবাসিক প্রতিষ্ঠানের কক্ষ ভাড়া, অভ্যন্তরীণ যাতায়াত, বিভিন্ন খাবার দোকানে অতিরিক্ত অর্থ আদায়।পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ঈদেও প্রথম দিন ৩১ মার্চ সোমবার ৩০-৪০ হাজার পর্যটকের দেখা মিলেছে। কিন্তু ঈদের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার এ পর্যটকের সংখ্যা লাখ অতিক্রম করেছে। আর গতকাল তৃতীয় দিনে এসে ১ লাখ ৬০ থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার পর্যটক এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কক্সবাজার আবাসিক হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, কক্সবাজার শহরের আবাসিক হোটেল, গেস্ট হাউজ, রিসোর্টের সংখ্যা সাড়ে পাঁচ শতাধিক। যেখানে কক্ষ বিবেচনায় প্রতিদিন গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি পর্যটক অবস্থান করার সুযোগ রয়েছে। বুধবার এসব প্রতিষ্ঠানের শতভাগ কক্ষই বুকিং রয়েছে। যেখানে অনুমানিক পর্যটকের সংখ্যা ১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি। আগামী ৫ এপ্রিল পর্যন্ত পর্যটকরা আসবে। আর এ পাঁচদিনে অনুমানিক সাড়ে সাত লাখ পর্যটক কক্সবাজার ভ্রমণে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অতিরিক্ত পর্যটক বাড়লে কিছু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেন স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করেছি। হোটেল মালিকদের বলা আছে যেন প্রতি হোটেলের কক্ষভাড়ার তালিকা টাঙানো থাকে। তালিকা দেখে কক্ষভাড়া পরিশোধের নির্দেশনা দেয়া থাকে। যদি এমন নির্দেশনা না মানার অভিযোগ থাকে, তদন্ত করে প্রশাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
পর্যটকের বেশির ভাগই ব্যস্ত সমুদ্রস্নানে। তাই সমুদ্রে নেমে কেউ যেন বিপদাপন্ন পরিস্থিতিতে না পড়েন সেজন্য সতর্ক দৃষ্টি রেখেছেন লাইফগার্ড সদস্যরা। আর গোসলে জন্য পর্যটকদের নির্দেশনা মেনে সাগরে নামার পরামর্শ তাদের। এমনটাই জানিয়েছেন সি সেইফ লাইফ গার্ডের সুপারভাইজার ওসমান গনি।তিনি জানান, সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত কম হলে লাখ পর্যটক সমুদ্রসৈকতে এসেছে, যারা বেশির ভাগই পানিতে নেমে স্নান করেছেন।
পর্যটক হয়রানি রোধে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পরিদর্শক মোহাম্মদ সোহেল। তিনি জানান, সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি বিশ্বের দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ, হিমছড়ি ঝরনা, ইনানী ও পাটুয়ারটেকের পাথুরে সৈকত, শহরের বার্মিজ মার্কেট, মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির, ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক এবং রামুর বৌদ্ধবিহারসহ কক্সবাজারের বিনোদন কেন্দ্রগুলো পর্যটকদের আনাগোনায় মুখরিত হয়ে উঠেছে। সবখানেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নিয়মিত টহলের পাশাপাশি জেলা পুলিশের টহলও রয়েছে। বসানো হয়েছে অভিযোগ কেন্দ্র। পর্যটকের কোনো অভিযোগ পেলে পুলিশ ও জেলা প্রশাসন মিলে দ্রæত সমাধান করা হচ্ছে।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) জসিম উদ্দিন চৌধুরী জানান, পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তায় কাজ করছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। চুরি-ছিনতাই রোধে শহরের অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি যানজট নিরসন ও পর্যটকের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে পুলিশ তৎপর রয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ সালাহ উদ্দিন জানান, ঈদের ছুটিতে ভ্রমণে আসা পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত হোটেল ভাড়া এবং রেস্তোরাঁগুলোয় খাবারের দাম যেন বেশি আদায় করা না হয়, সেসব তদারকির জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে নামানো হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
এদিকে, বান্দরবানে গতকাল থেকে টানা চারদিন অর্থাৎ আগামী শনিবার পর্যন্ত আবাসিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্টগুলোয় প্রায় শতভাগ বুকিং হয়ে গেছে। একই সঙ্গে পর্যটন স্পটগুলোতেও পর্যটকের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। গতকাল বেলা সোয়া ১টার মধ্যে জেলার একটি সমিতির ৩৪০ গাড়ির মধ্যে ৩২২টি গাড়ি পর্যটকরা ভাড়া নিয়ে বিভিন্ন পর্যটন স্পটে বেড়াতে যান। বিকালের মধ্যে বাকি গাড়িগুলোও ভাড়া হয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে সারা দিনে ৩ হাজার ১২২টি টিকিট বিক্রি হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসন পরিচালিত মেঘলা পর্যটন কেন্দ্রের দায়িত্বরত সুকুমার তঞ্চঙ্গ্যা। স্থানীয় সুত্রগুলো জানায় এবার কক্্রবাজার সমুদ;্র সৈকতে পর্যটকরা স্বস্থিতে নিরাপদে ঈদ আনন্দ উপভোগ করছে।
আপনার মতামত লিখুন :