শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬, ২৬ চৈত্র ১৪৩২

অবৈধ ক্ষমতার দাপটে সম্পদের পাহাড় গড়েন সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: এপ্রিল ১০, ২০২৬, ১২:৪৫ এএম

অবৈধ ক্ষমতার দাপটে সম্পদের পাহাড় গড়েন সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল

আইন-অপরাধ ডেস্ক: সাবেক আওয়ামী লীগের শাসনামলে ক্ষমতার অপব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় জমি দখল, নির্যাতন এবং বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মোহাম্মদ মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জনগণের নিরাপত্তা রক্ষার শপথ নিয়ে দায়িত্বে থাকা এই পুলিশ কর্মকর্তা সাধারণ মানুষকে উচ্ছেদ করতে সেই ক্ষমতাকেই ব্যবহার করেছেন। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, কুমিল্লার মেঘনা, সুনামগঞ্জের হাওর ও বান্দরবানের পাহাড়সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তার প্রভাব বিস্তৃত ছিল। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ভয়ভীতি, রিমান্ডের হুমকি এবং প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় জমি দখল ছিল মোজাম্মেল হকের একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া।অভিযোগ রয়েছে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সম্পত্তিও তার দখল প্রক্রিয়া থেকে রেহাই পায়নি। সম্প্রতি নিউজ২৪-এর এক অনুসন্ধানে তার এসব দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রূপগঞ্জের বাসিন্দা জাহের আলীর ৬২ বিঘা জমির ওপর নজর পড়ে তৎকালীন অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মোজাম্মেল হকের। ক্ষমতার অপব্যবহারের এক নির্মম উদাহরণ হিসেবে উঠে আসে এই ঘটনা।অভিযোগ রয়েছে, জমি দখলের উদ্দেশ্যে জাহের আলীকে টানা ১৩ দিন ডিবি কার্যালয়ে আটক রেখে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়।
ভুক্তভোগীর বর্ণনায় উঠে আসে ভয়াবহ সেই নির্যাতনের চিত্র। পরিবারের সদস্যদের সামনে তাকে মারধর করা হয়। তিনি বলেন, আমার ছেলের সামনে আমাকে মারা হয়েছে, মেয়ের জামাইয়ের সামনেও মারধর করেছে।
এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল, যাতে আমি ভেঙে পড়ি। এরপর রিমান্ডের ভয় দেখিয়ে তাকে জোরপূর্বক জমি লিখে দিতে বাধ্য করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, আরো কয়েক দিন আটক ও নির্যাতনের হুমকি দিয়ে তাকে কাগজে সই করানো হয়। অসহায় অবস্থায় নিজের জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে শেষ পর্যন্ত জমি হস্তান্তরে সম্মত হতে বাধ্য হন জাহের আলী।
মোজাম্মেল হকের সিগনেচার স্টাইল শুধু জাহের আলী নন রূপগঞ্জের এমন অসংখ্য ভুক্তভোগী আছেন, যারা তার ভূমি দখলের শিকার হয়েছেন।
এক ভুক্তভোগী জানান, তার প্রায় চার বিঘা জমি ছিল, যেখানে মাছের একটি বড় প্রকল্প করেছিলেন। বছরে ছয় থেকে সাত টন মাছ উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকলেও সেই প্রকল্প ধ্বংস হয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, গভীর রাতে লোকজন নিয়ে গিয়ে তাকে জোর করে জমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। এভাবে অনেককেই পথে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, মোজাম্মেল হকের প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের মধ্যে তার নিজস্ব লোকজন ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরাও যুক্ত ছিলেন। তার এই দখলদারিত্ব থেকে রেহাই পাননি সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনও। অভিযোগ রয়েছে, তাদের জমি জোরপূর্বক দখল বা নামমাত্র মূল্যে দলিল করে নেওয়া হয়েছে। একাধিক পরিবারের দাবি, তাদের আত্মীয়-স্বজনের জমিও একইভাবে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
পূর্বাচল সংলগ্ন রূপগঞ্জের বিভিন্ন মৌজায় প্রায় ৬৫ হাজার বিঘা জমির ওপর গড়ে উঠেছে ‘আনন্দ হাউজিং’ নামে একটি বিশাল প্রকল্প, যার বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা। শুরুতে ‘আনন্দ পুলিশ হাউজিং’ নামে পরিচিত হলেও পরে তদন্তে উঠে আসে, এটি মূলত মোজাম্মেল হক ও তার স্ত্রীর ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক প্রকল্প। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অধিকাংশ জমিই জোরপূর্বক দখল করা বা অতি কম দামে কিনে নেওয়া হয়েছে।
এই দখল প্রক্রিয়ায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও একটি শক্তিশালী বাহিনীর সহযোগিতা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রভাব খাটাতে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখা হতো। অভিযোগ অনুযায়ী, সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদ-কে ১১ বিঘা জমিসহ একটি বাংলো উপহার দেওয়া হয়, যেখানে বসেই বিভিন্ন পরিকল্পনা করা হতো। পরবর্তীতে তার দুর্নীতির বিষয় সামনে এলে প্রকল্পের নাম থেকে ‘পুলিশ’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়।
আনন্দ হাউজিংয়ের পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে একটি বিলাসবহুল ব্যক্তিগত এলাকা, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া, ভেতরে রাজকীয় স্থাপনাসব মিলিয়ে ক্ষমতা ও সম্পদের এক প্রদর্শনী। নিজেকে আড়াল করতে মোজাম্মেল হক তার অধিকাংশ সম্পদ স্ত্রীর নামে গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আনন্দ হাউজিংয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ শেয়ারই তার স্ত্রীর নামে। ঢাকার উপকণ্ঠ ডেমরা এলাকায় ৩১ শতাংশ জমির ওপর ‘ব্রিজ ফার্মাসিউটিক্যালস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানও স্ত্রীর নামে গড়ে তোলা হয়েছে, যদিও স্থানীয়দের দাবি এর প্রকৃত মালিক তিনিই।
তার নিজ জেলা কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার হরিপুর গ্রামেও গড়ে তুলেছেন প্রায় ২০০ বিঘা জমির ‘মেঘনা রিসোর্ট’, যা স্থানীয়দের কাছে ‘ডিআইজি প্রজেক্ট’ নামে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে এবং কৃষিজমি নষ্ট করে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এছাড়া সুনামগঞ্জের হাসাউড়ায় প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে বাগানবাড়ি এবং বান্দরবানে ১৭৫ বিঘা জমিতে আতর বাগান। এসব সম্পদের বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকারও বেশি।
অভিযোগ রয়েছে, দেশের বাইরে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরেও তার সম্পদের বিস্তার রয়েছে এবং হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারের সন্দেহও করা হচ্ছে।
এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে তার নিজের নামে প্রায় ১২ কোটি টাকা এবং স্ত্রীর নামে প্রায় ৩ কোটি টাকার অসংগতিপূর্ণ সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। তাকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে যাচাই-বাছাই চলছে।
২৬ বছরের চাকরিজীবনের বড় একটি সময় তিনি দাপ্তরিক দায়িত্বে থাকলেও মাঠ পর্যায়ে তার ভূমিকা নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক। কক্সবাজারে কর্মরত থাকাকালে সাধারণ মানুষকে সেবা না দিয়ে উল্টো হয়রানির অভিযোগে স্থানীয়দের ক্ষোভের মুখেও পড়তে হয়েছিল তাকে। অসংখ্য অভিযোগের ভার নিয়েই ২০২৫ সালে অবসরে যান গাজী মোজাম্মেল হক। অবসরের পর নিজেকে আড়ালে রাখার চেষ্টা করলেও তার আবাসন প্রকল্পসহ অন্যান্য ব্যবসায়িক কার্যক্রম এখনো স্বাভাবিকভাবে চলছে।অভিযোগ রয়েছে মোজাম্মেলের এসব অপকর্ম অপরাধ দুর্নীতি ঢাকতে তার ছোট ভাইয়ের মাধ্যমে দৈনিক সবুজ বাংলা নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। এতেও বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেন।
এ ধরনের দখলদারি ও ক্ষমতার অপব্যবহারকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। প্রশ্ন উঠছে—আইনের রক্ষক যখন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তখন সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার কোথায়? প্রভাবশালী এই সিন্ডিকেট ভেঙে আদৌ কি ভুক্তভোগীরা বিচার পাবেনএমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে অসংখ্য পরিবার।ছবি-সংগৃহীত

 

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!