ডেইলি খবর ডেস্ক: জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে এবার যুক্ত হতে যাচ্ছে ইউরোপের শীর্ষ উড়োজাহাজ প্রস্তুতকারক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ। সরকারের মিশ্র-বহর (মিক্সড-ফ্লিট) কৌশলের অংশ হিসেবে এসব কেনা হচ্ছে। ২০৩১ সাল থেকে এসব উড়োজাহাজ বিমানের বহরে যুক্ত হতে শুরু করবে।
এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো জাতীয় এয়ারলাইন্সটি পূর্ণাঙ্গ মিশ্র বহর (মিক্সড ফ্লিট) বা বোয়িং ও এয়ারবাস—দুই নির্মাতার উড়োজাহাজ নিয়ে পরিচালিত হবে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বিষয়টি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসকে নিশ্চিত করেছেন ।তিনি বলেন, ‘আমরা ৩১ আগস্টের মধ্যে এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করব। দাম এবং অন্যান্য শর্তাবলীসহ কেনাকাটার বিস্তারিত তথ্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রকাশ করা হবে ‘
তিনি জানান, বাংলাদেশের জাতীয় ও বাণিজ্যিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে রেখেই সরকার এই চুক্তির জন্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের অ্যাভিয়েশন খাতের অন্যতম আলোচিত উড়োজাহাজ সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় এই সিদ্ধান্তকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর কিছুদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উড়োজাহাজ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘বোয়িং’ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিমান।
বোয়িংয়ের চুক্তির আওতায় আনুমানিক ৩.৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ উড়োজাহাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের একটি উড়োজাহাজ। ছবি বোয়িংয়ের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এই প্রেক্ষাপটে এয়ারবাস সম্প্রতি বিমানের বহরে যুক্ত হওয়ার কার্যক্রম জোরদার করে। তারা বিমানের কারিগরি-অর্থনৈতিক কমিটির কাছে চারটি ‘এ৩৫০-৯০০’ ওয়াইড বডি এবং ছয়টি ‘এ৩২১নিও’ ন্যারো বডি উড়োজাহাজ বিক্রির একটি প্রস্তাব জমা দেয়।
এই প্রস্তাবের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে এয়ারবাসের ভাইস প্রেসিডেন্ট এডওয়ার্ড ডেলাহায়ে সম্প্রতি ঢাকায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম, প্রতিমন্ত্রী মিল্লাত এবং বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
মিল্লাত জানান, দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর সরকার এখন ১০টি এয়ারবাস উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্যিক পরিবেশ বজায় রাখা এই কেনাকাটার পেছনে অন্যতম বিবেচ্য একটি বিষয় বলে তিনি জানান। একইসঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘বিমানকে মিশ্র-বহরের এয়ারলাইন্সে রূপান্তরিত করার একটি সমন্বিত সরকারি নীতির অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে বিশ্বের দুই বৃহৎ বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং ও এয়ারবাসের উড়োজাহাজ একই বহরে পরিচালনা করবে বিমান। এটি বিমানের বহর ব্যবস্থাপনায় একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হবে।
এ সিদ্ধান্ত এমন সময় এলো, যখন সরকার ২০৩৪-৩৫ অর্থবছরের মধ্যে বিমানের বহর ৪৭টি উড়োজাহাজে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ পর্যালোচনা করছে। এর লক্ষ্য জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটিকে আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক যাত্রী ও কার্গো বিমান চলাচলের কেন্দ্রে পরিণত করা।
বিমানের ভবিষ্যৎ বহরে জায়গা পেতে এয়ারবাস ও বোয়িং বেশ কয়েক বছর ধরেই তীব্র প্রতিযোগিতা করে আসছিল। এ প্রতিযোগিতাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক আগ্রহও দেখা গেছে।
২০২৩ সালে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর বাংলাদেশ সফরের সময় এয়ারবাস নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালায়। সে সময় কার্গো উড়োজাহাজসহ ১০টি এয়ারবাস কেনার সম্ভাব্য বিষয়টি ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
পরবর্তীতে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ‘রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ চুক্তিসহ সামগ্রিক বাণিজ্য আলোচনার প্রেক্ষাপটে বোয়িং ১৪টি উড়োজাহাজের চুক্তিটি চূড়ান্ত করে।
তবে এয়ারবাসও পিছিয়ে না থেকে ওয়াইড বডি ও ন্যারো বডির সংমিশ্রণে নতুন অফার দেয়। ‘এ৩৫০-৯০০’ উড়োজাহাজ দিয়ে মূলত দূরপাল্লার রুট পরিচালনা করা হবে। অন্যদিকে বিমানের নেটওয়ার্ক চাহিদা অনুযায়ী ‘এ৩২১নিও’ আঞ্চলিক, গালফ ও এশিয়ার মাঝারি দূরত্বের রুটে ব্যবহার করা যাবে ।
সরকারের এই মিশ্র-বহর নীতির বিষয়টি স্পষ্ট করে গত সপ্তাহে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের উভয় প্রস্তুতকারকের উড়োজাহাজই প্রয়োজন।’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের বোয়িং ও এয়ারবাস দুটোই প্রয়োজন। আমরা দুটো কোম্পানির থেকেই কিনব।’
বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত এয়ারবাসের প্রতি বাংলাদেশের আগ্রহের পরিপন্থী বা কোনো বাহ্যিক চাপের ফল- এমন ধারণা নাকচ করে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘দেশের যা প্রয়োজন, সরকার তা-ই কিনবে এবং একইসঙ্গে বিচক্ষণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাও বজায় রাখবে।’
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী (পূর্ববর্তী সরকারগুলো থেকে) একটি নাজুক অর্থনীতি পেয়েছেন। অর্থনীতিকে শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড় করাতে একদিকে আমাদের সাশ্রয়ী হতে হবে, অন্যদিকে দেশের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোও কিনতে হবে। আমাদের বোয়িং ও এয়ারবাস দুটোই প্রয়োজন। আমরা দুটো থেকেই কিনব।’
তিনি আরও বলেন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট দেশকে অগ্রাধিকার দেয় না।
বিনিয়োগের প্রশ্নে সব সময় বাংলাদেশের স্বার্থকেই সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয়।
সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম এবং প্রতিমন্ত্রী মিল্লাতের সাথে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, স্পেন, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত ও জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকদের এক বৈঠকেও এয়ারবাসের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় আসে।
ওই বৈঠকে সরকার জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি বিমানের দীর্ঘমেয়াদি বহর সম্প্রসারণ কর্মসূচিতে এয়ারবাস যুক্ত করার অভিপ্রায় তুলে ধরে।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম বাসস’কে বলেন, ‘মিশ্র-বহর কৌশল প্রয়োগ করলে কার্যক্রমে আরও বেশি সক্ষমতা ও নমনীয়তা আসবে, রুটের উপযোগী উড়োজাহাজ ব্যবহার করা যাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্যিক দক্ষতা বাড়বে।’
তিনি বলেন, ‘নতুন উড়োজাহাজগুলো যদি পুরনো উড়োজাহাজ প্রতিস্থাপনের জন্য কেনা হয় তবে এই বাড়তি কেনাকাটা বাণিজ্যিকভাবে যুক্তিসঙ্গত হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি রুট পরিকল্পনা ও লাভজনকতার বিষয়টি মাথায় রেখে বহর সম্প্রসারণ করা হচ্ছে কি-না তা সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা উচিত।’
নজরুল ইসলাম বলেন, ‘মিশ্র বহর থাকলে যাত্রী চাহিদা, রুটের কার্যকারিতা ও ব্যয় কাঠামো বিবেচনায় একটি এয়ারলাইন্স সবচেয়ে উপযোগী উড়োজাহাজ ব্যবহার করতে পারে।সংগৃহীত ছবি

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :