মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

মানবতাবিরোধী অপরাধ: ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ জনের রায় আজ, সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি প্রসিকিউশনের

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬, ১২:১৬ এএম

মানবতাবিরোধী অপরাধ: ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ জনের রায় আজ, সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি প্রসিকিউশনের

আইন-অপরাধ ডেস্ক: কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ যুবলীগ-ছাত্রলীগের শীর্ষ সাত নেতার বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় আজ মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ঘোষণা করা হবে। মামলায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রলীগকে দিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার নির্দেশনা, আন্দোলনের ঘটনা টিভিতে দেখানো হলে টিভি বন্ধ করে দেওয়া, ডিবি হারুনকে নির্দেশনা, ইন্টারনেট বন্ধে জুনাইন আহমদে পলককে নির্দেশনাসহ হত্যাযজ্ঞে উস্কানির অভিযোগ রয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল রায় ঘোষণা করবেন।

এটি হবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী ট্রাইব্যুনালের ৭ম রায়। এর আগে শেখ হাসিনা, চাঁনখারপুল হত্যা, আশুলিয়া হত্যা, ইনুর হত্যাকাণ্ড, রামপুরায় কার্ণিশে গুলিসহ মোট ৬টি হত্যার রায় দিয়েছিল দুটি ট্রাইব্যুনাল।

এ মামলায় সাত আসামির সবাই পলাতক রয়েছে। তবে রায়ে সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে গত ১৭ আগস্ট যুক্তিতর্ক শেষ করলে ট্রাইব্যুনাল রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখে। এ মামলার সব আসামি পলাতক থাকায় তাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন।

মামলায় ওবায়দুল কাদের ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন— কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।

আসামিদের বিরুদ্ধে যে ৪টি আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বিচার

সমন্বিত নির্দেশনা ও উসকানি : জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনে আসামিরা একত্রিত হয়ে সমন্বিত নির্দেশনা, উসকানিমূলক ও প্ররোচনামূলক বক্তব্য দিয়েছেন।

সহিংসতার পরিকল্পনা : বিভিন্ন গোপন বৈঠকে নেতাকর্মীদের রাজপথে নেমে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ এবং সহিংসতার পরিকল্পনা করা হয়।

প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ ও হামলা : আন্দোলনকারীদের দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহার, ইন্টারনেট সেবা সীমিত করার চেষ্টা এবং নির্বিচারে বলপ্রয়োগের মূল পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে যুক্ত ছিলেন তারা। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর সশস্ত্র হামলার সুনির্দিষ্ট অডিও প্রমাণ ও ফরেনসিক প্রতিবেদনের কথা ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেছে রাষ্ট্রপক্ষ।

হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ : আন্দোলন দমানোর এই কার্যক্রমে দেশব্যাপী ব্যাপক সহিংসতা, হত্যা ও হত্যার চেষ্টার ঘটনা ঘটে, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

এ বিষয়ে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, জুলাই আন্দোলন ঘিরে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বৈঠকে মানুষ মারার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করা হয়। এ মামলায় দাখিল করা বিভিন্ন অডিও-ভিডিওতে এসবের প্রমাণ উঠে এসেছে। এ ছাড়া আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। যার ফলশ্রুতিতে ৫ আগস্ট পর্যন্ত নির্বিচারে গুলি চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়।

অপরদিকে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী এম হাসান ইমাম যুক্তিতর্ক শুনানিতে বলেন, জনগণের জানমাল রক্ষায় শুট অ্যাট সাইট বা দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে আমার তিন মক্কেল কোনো ‘কমান্ডিং পজিশনে’ ছিলেন না। নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে একজনকেই আমি দায়ী করি। অতএব আমার মক্কেলরা কাউকে মারেননি বা মারার নির্দেশও দেননি।

এরপর ছাত্রলীগ সভাপতি-সম্পাদক ও যুবলীগ সভাপতি-সম্পাদকের পক্ষে যুক্তি খণ্ডন করেন ইশরাত জাহান। এই আইনজীবীর দাবি, চব্বিশের জুলাই আন্দোলন দমনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে তার চার মক্কেল তথা সাদ্দাম, ইনান, পরশ ও নিখিলের নাম আসেনি। নেতৃত্ব দিয়েছেন অন্যরা। এ ছাড়া অধীনস্ত নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ব্যর্থ হয়েছেন।

এ সময় কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চান ট্রাইব্যুনাল। জবাবে আইনজীবী ইশরাত জাহান বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শুরু থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত বিশৃঙ্খলা চলছিল। ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল না।

তিনি বলেন, বারবার নারীদের আহত হওয়ার কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু এ মামলায় কোনো নারী সাক্ষী আনা হয়নি। সাক্ষ্যপ্রমাণেও এমন কিছু দেখাতে পারেনি। এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেছে কিনা সন্দেহ রয়েছে।

নিজের চার মক্কেলের খালাস চেয়ে ইশরাত বলেন, শুধুমাত্র রাজনীতি করার কারণে আন্দোলন ঘিরে কিছু কথা উচ্চারণ করেছেন আমার মক্কেলরা। একইসঙ্গে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন। এছাড়া প্রসিকিউশনের দাখিলকৃত কোনো ভিডিওতেই তাদের হাতে লাঠিসোঁটা ছিল না। এককথায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের প্রমাণ দেখাতে পারেনি প্রসিকিউশন। এজন্য আমি চারজনেরই খালাস প্রার্থনা করছি।

আসামিপক্ষের যুক্তি শেষে পাল্টা যুক্তি খণ্ডন করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। তিনি ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজের’ ব্যাখ্যা দিয়ে এ মামলার আসামিদের অপরাধ তুলে ধরেন। আন্দোলন দমনে নেমে একজন লোক মারা গেলেও আসামিরা অপরাধী বলে গণ্য হবেন বলে আইনি যুক্তি দেখান তিনি।

এর আগে রাষ্ট্রপক্ষ মোট ২৯ জনের সাক্ষী ও জুলাই আন্দোলন চলাকালীন সময়ে ওবায়দুল কাদের বিভিন্ন কথোপকথনের রেকর্ড ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেন।

সাদ্দাম-ইনানকে ফোনে শিক্ষার্থীদের পেটানোর নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের

প্রসিকিউশন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে যুক্তিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কয়েকটি কল রেকর্ড দাখিল করে। এরমধ্যে একটি কল রেকর্ডে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ১১ জুলাই ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনানকে সরাসরি ফোন করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার নির্দেশ দেন তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কল রেকর্ডটি উপস্থাপন করা হয়। কল রেকর্ডের কথোপকথনে সাদ্দামের উদ্দেশে ওবায়দুল কাদেরকে বলতে শোনা যায়, ‘এদের মারো না কেন? এদের পেটাও না কেন? বাড়তে দেও কেন?’ প্রত্যুত্তরে সাদ্দাম বলেন, ‘পুলিশ মুখোমুখি হতে নিষেধ করেছে।’

কল রেকর্ডে আরও শোনা যায়, সাদ্দাম কাদেরকে বলেন, মানে আমরা তো গিয়ে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে চাই, তাহলে আমরা তো সেটা করতে পারব। স্যার যে আমাদের নিষেধ করল। শাহবাগের দিকে যেতে তো আমাদেরকে নিষেধ করল। বারবার ফোন দিয়ে বলল যে শাহবাগের দিকে বা অন্যদিকে আমরা যেন না যাই। ওদের মুখোমুখি যেন না হয়, এটাই তো বারবার বলতেছিল স্যার।

তখন ওবায়দুল কাদের জানতে চান, কে? জবাবে ইনান বলেন, আমাদের পুলিশ প্লাস বিপ্লব দা, ওনারা বলছিল। এর জবাবে কাদের বলেন, বিপ্লব তো এইটা বলার কথা না!

আওয়ামী লীগের এই সাধারণ সম্পাদকের এমন কথায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হন বলে দাবি প্রসিকিউশনের।

পলককে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ইন্টারনেটটা একটু স্লো করে দাও’

প্রসিকিউশনের আরও একটি কল রেকর্ডে দেখা যায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ইন্টারনেটের গতি ধীর করার নির্দেশ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সেই নির্দেশনা অনুমোদন করেছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তা কার্যকর করেন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। যুক্তিতর্কের প্রথম দিকে ওবায়দুল কাদের ও পলকের একটি কথোপকথন বাজিয়ে শোনানো হয় ট্রাইব্যুনালে। সেখানে ওবায়দুল কাদেরকে বলতে শোনা যায়, ‘ইন্টারনেটটা একটু স্লো করে দাও।’ জবাবে পলক বলেন, ‘একটু নেত্রীর পারমিশনটা নিয়ে নিই?’ তখন ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘নিয়ে নাও।‘ পলক বলেন, ‘বলা আছে তো যে উনি না বললে...।’ এরপর ওনাকে (শেখ হাসিনা) জিজ্ঞাসা করেই ইন্টারনেট স্লো করতে বলেন ওবায়দুল কাদের।

‘নেত্রী তোমার ওপর বিরক্ত হইছে’, হারুনকে বলেন ওবায়দুল কাদের

এ মামলায় আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি কল রেকর্ড উপস্থাপন করে প্রসিকিউশন। সেখানে বলা হয়, আন্দোলন তখন ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা দেশে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি ভণ্ডুল করতে চলছিল নানা তৎপরতা। হেফাজতে নেওয়া হয় প্রধান সমন্বয়কদেরও। তবে তাদের খাবার খাওয়ানোর একটি ছবি প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয় নানা আলোচনা। সেই ছবি প্রকাশ করা নিয়ে তৎকালীন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান হারুন অর রশিদের প্রতি ক্ষোভ ঝাড়েন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

ওবায়দুল কাদের ও হারুন অর রশীদের কথোপকথনটি পাঠকের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো—

কাদের : হ্যালো?

হারুন : হ্যালো। স্যার আসসালামু আলাইকুম, স্যার।

কাদের : ইয়ে, হারুন কি তুমি এত... নেত্রীও তো বিরক্ত হইছে।

হারুন : স্যার, নেত্রীরে...।

কাদের : আমি তো তোমারে প্রতিদিন বলতেছিলাম তুমি ভালো করতেছো।

হারুন : স্যার, স্যার, আমি... আমি...।

কাদের : ভালো করতে করতে আবার খাওয়াই ওই ছবি কেন তুললা?

হারুন : না, না, এ খাওয়ার ডিসিশনটা কে দিয়েছে স্যার? আমার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আমার এসবির চিফ— এরা দিছে খাওয়াইতে নেওয়ার জন্য। খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত তো আমি নেই নাই।

কাদের : না, না, উনি তো বলছে যে তোমাকে ছবি তুলে বাইরে পাঠাইতে বলছে?

হারুন : স্যার, জি স্যার। ছবি তোলা প্লাস হইলো যে বিবৃতিটা প্রকাশ করা...।

কাদের : ছবিটা নিজের কাছে রাইখা দিতা, এইটা তো...।

হারুন : না, না, উনারা তো বলছে প্রকাশ করার জন্য, স্যার। মনির স্যার, এসবি চিফ স্যারকে জিজ্ঞাসা করেন, স্যার। মনির স্যার বলছে কি না।

কাদের : কিন্তু প্রধান... প্রধানমন্ত্রী তো যখন এগুলো বলতেছিলেন।

হারুন : জি স্যার।

কাদের : তখন তো হোম মিনিস্টারও ওখানে ছিল।

হারুন : স্যার, অহন যদি উনারা শেল্টার না দেয় আমারে... অহন হোম মিনিস্টার, প্রধানমন্ত্রী বলতেছে হোম মিনিস্টার কোনো নির্দেশ দেয় নাই, হোম মিনিস্টার অহন আমারে বদলি করছে...।

কাদের : উনি তো ডিফেন্ড করছে ওরে।

হারুন : হ্যাঁ?

কাদের : উল্টো তো তুমি দোষারোপ হচ্ছো।

হারুন : স্যার, হোম মিনিস্টার বলছে, পিএম... পিএম নাকি বলছে...।

কাদের : আর ওদেরকে কী করলা?

হারুন : কোনটা?

কাদের : ওই ছয়জন?

হারুন : ছয়জন তো স্যার... এটা স্যার... স্যার, প্রতিদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় মিটিং হয়, প্রতিদিন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় মিটিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এখান থেকে যা নির্দেশ দেয়, সেটাই আমি করি। যা নির্দেশ দেয়, সেটাই আমি করি। একজন ডিবি প্রধান কী করবে স্যার?

কাদের : আমি বলছি যে, ওই তুমি যাদেরকে ওখানে হেফাজতে রাখছো।

হারুন : জি?

কাদের : তারা সেইফ কি?

হারুন : স্যার, এটা তো... এটা তো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার ওইহানের মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত যা দেয়, তাই করি। একা ডিবিপ্রধান কত... কতটুকু করবে না তো... করবে না তো স্যার।

কাদের : তো এরা ওখানেই আছে?

হারুন : অইখানেই আছে, স্যার। উনারা যা বলবে, সেটাই হবে, স্যার।

কাদের : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী না... সেটা তো...।

হারুন : স্যার, এখন... এখন, স্যার, এখন আমি যেটা বলি, স্যার। এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমারে, কমিশনাররে বলে দিছে, আমারে বদলি করার লাগে। তা আমি... আমারে বদলি করে দিচ্ছে, স্যার। আমার অপরাধটা কী, স্যার? আমার অপরাধ কী, স্যার?

কাদের : না, হয় তো নেত্রী যে নির্দেশ দিছে, সেখানে তো ‘হি ওয়াজ নট ডিফেন্ডিং ইউ’।

হারুন : হুম।

কাদের : সে তো এমনভাবে দেখা দিছে যে তুমি নিজেও...।

হারুন : স্যার, এরা এত বড় একটা...।

কাদের : এসব ছবি তো তুমি নিজেই করো।

হারুন : জি?

কাদের : নিজে নিজে করো।

হারুন : আমি... স্যার, আমরা যা করছি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপির নির্দেশে করছি। এর বাইরে একবিন্দু করি নাই। আপনি এর প্রমাণ নিয়েন।

কাদের : কিন্তু তারা তো এইটা এখন স্বীকার করে না।

হারুন : না, স্বীকার করে না... স্বীকার কেন করবে না? আপনি জিজ্ঞাসাবাদ করেন, যে স্বীকার করে কি না জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

কাদের : আচ্ছা, দেখি। দেখি, আমি হোম মিনিস্টারের সঙ্গে কথা বলি।

হারুন : স্যার, এটা যদি অহন স্যার না করেন, তাহলে কিন্তু অর্ডার অহন করে দিবে, স্যার। তা আমি... আমি নাই স্যার, ডিবিতে নাই স্যার। অর্ডার করে দিবে।

কাদের : ঠিক আছে।

সংঘাতের খবর দিলে টেলিভিশন বন্ধ করে দেওয়া হবে— কাদেরকে বলেন আরাফাত

গণঅভ্যুত্থানের সময় ওবায়দুল কাদের ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের মুঠোফোনের কথোপকথনে আরও একটি কল রেকর্ডে উঠে আসে কীভাবে পরিকল্পিতভাবে দেশে হত্যা ও নাশকতার পরিকল্পনা করেছিল তারা। তাদের একটি অডিও কথোপকথন ডকুমেন্ট হিসেবে উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন।

অডিও রেকর্ডে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতকে তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘আজকে যেন কোনো সংঘাতের খবর যেন না দেয়।’

জবাবে আরাফাত বলেন, ‘আজকে যদি কোনো ক্ল্যাশের (সংঘাত) বা মারামারির ভিডিও ফুটেজ বা ছবি দেখায় (টেলিভিশন চ্যানেলগুলো), ওদেরকে ‘এনিমি অব দ্য স্টেট’ (রাষ্ট্রের শত্রু) হিসেবে ডিক্লেয়ার (ঘোষণা) করা হবে এবং সারা জীবনের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হবে।’

কথোপকথনে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘এই যে যারা কথা শোনে না, তাদের টিভি চ্যানেলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জবাবে মোহাম্মদ আলী আরাফাত বলেন, ‘ওই যে অফ করে দিছি গতকাল দুই-একটাকে। আজকেও বলে রাখছি, যেগুলা শুনবে না, অফ করে দিবে সাথে সাথে।’

পরে কাদের বলেন, ‘আজকে যেন কোনো সংঘাতের খবর না দেয়।’ উত্তরে আরাফাত বলেন, ‘আজকেও ওদেরকে বলছি যে আজকে যদি কোনো ক্ল্যাশের বা মারামারির ভিডিও ফুটেজ বা ছবি দেখায়, ওদেরকে এনিমি অব দ্য স্টেট হিসেবে ডিক্লেয়ার করা হবে এবং সারা জীবনের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হবে। আমি থ্রেট করে রাখছি আজকে। আর ওই যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, উনাকে বসায় রাখছি যে আপনি কনস্ট্যান্টলি (একটানা) দেখবেন, যে টিভি ক্ল্যাসের ছবি দেখাবে, সাথে সাথে অফ করে দেবেন। আমার কোনো পারমিশনের জন্য মেসেজ পাঠাবেন না। আপনাকে ঢালাও পারমিশন দিয়ে রাখলাম। আর উইদাউট মাই পারমিশন ওটা অন করবেন না আর। এই ব্যবস্থা নিয়ে রাখছি কাদের ভাই আজকে।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলাপ করে কী বুঝেছেন, তা জানতে চান ওবায়দুল কাদের। জবাবে আরাফাত বলেন, ‘আলাপ করার পর নেত্রীকে এখন ব্রিফিং করার জন্য আসছি। নেত্রী ইনস্ট্রাকশন দিছেন। আলাপ করে আমার একটা ওপিনিয়ন আছে, ওইটা আপনাকে আমি ব্রিফ করব, কাদের ভাই।’

এখন কী অবস্থা, তা জানতে চান ওবায়দুল কাদের। উত্তরে আরাফাত বলেন, ‘এখন অবস্থাটা হচ্ছে এ রকম যে কোটা আন্দোলনকারী বলে যেটা বলা হচ্ছিল, এটা দুই ভাগ হয়ে গেছে। একভাগ হলো কোটা আন্দোলনকারী স্টুডেন্ট, যাদের সাথে আমরা আলাপ করছি। আর একটা হলো তৃতীয় পক্ষ, অর্থাৎ জামায়াত-বিএনপির সন্ত্রাসীরা যারা পোড়াচ্ছে। সো কারফিউর ডিসিশন হচ্ছে জামায়াত-বিএনপির সন্ত্রাসী, যারা পোড়াচ্ছে, তাদের বিপক্ষে। আর কোটা আন্দোলনকারী ছাত্রদের সাথে আমাদের ডিসিশন হচ্ছে, আলোচনা করে সফট সলিউশনে যাচ্ছি— এই হচ্ছে আমাদের ন্যারেটিভ এখন এবং এটা তো সুন্দর ভাগ হয়ে গেছে কারণ...।’

কাদের জবাব দেন, ‘এটা ঠিকই আছে। আজকে আলোচনা আছে?’ আরাফাত বলেন, ‘আপনি আসবেন কাদের ভাই ইয়েতে, গণভবনে?’ কাদের বলেন, ‘আজকে আলোচনা আছে? আমরা তো গণভবনে কালকে রাতে ২টা পর্যন্ত ছিলাম।’ আরাফাত বলেন, ‘জি, জি, কালকে তো আপনার ইয়েটা দেখলাম, ব্রিফিংটা দেখলাম জি। তো এখন আসছি ওই যে গতকালকের ডিসকাশনের (আলোচনা) পরে ওই ব্রিফিং করার জন্য আসছি আরকি।’

কাদের বলেন, ‘হ্যাঁ, ঠিক আছে, জানাও।’ তিনি বলেন, ‘কোনো নিডের (প্রয়োজন) দরকার হলে আমাকে ফোন দিয়ো। আমি এখন পার্টি অফিসে ছিলাম। ওখানে ছোট্ট একটা ব্রিফিং করছি। ...’

ওবায়দুল কাদেরের মামলায় ওসমান হাদির জবানবন্দি

জবানবন্দিতে সাত আসামির দায় নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন শরিফ ওসমান হাদি। তুলে ধরেছেন নিজের চোখে দেখা তাদের সব অপকর্মের কথা। আন্দোলনকারীদের ওপর কে, কখন, কোথায় হামলা কিংবা কারা গুলি চালিয়েছেন— সেসবের বিবরণও দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তার কাছে। এমনকি তাকে অসংখ্য নম্বর থেকে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছিলেন।

তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দিতে হাদি বলেছিলেন, আমাকে অসংখ্য নম্বর থেকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। এ নিয়ে শাহবাগ থানায় জিডিও করেছি। অতি দ্রুত তাদের বিচার করতে না পারলে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা ভবিষ্যতে কী পরিমাণ গণহত্যা চালাবে, তা অকল্পনীয়। তাদের বিচারের আওতায় না আনলে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে।

তিনি বলেন, এ আন্দোলনে আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া অর্থাৎ বিভিন্ন দেশ থেকে বহু সাংবাদিক, লেখকসহ বিভিন্ন অ্যাক্টিভিস্টরা অবদান রেখেছেন। যেহেতু আমি আইএলটিএসে পড়াতাম, সেহেতু আমার অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে ভালো ভালো জায়গায় আছে, তাদের থেকেও আমি বিভিন্ন তথ্য পেতাম।

জড়িতদের বিচার চেয়ে হাদি বলেছিলেন, সারা দেশে আন্দোলন দমনের নামে পরিকল্পিত গণহত্যাকাণ্ডসহ বর্বরোচিত হামলার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ এ আরাফাত, পরশ, নিখিল, সাদ্দাম, ইনানসহ জড়িত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও আওয়ামী লীগ দলীয় ক্যাডারদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।

এদিকে মৃত ব্যক্তির জবানবন্দি গ্রহণ প্রসঙ্গে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম বলেন, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে ছাত্র-জনতার মধ্যে অন্যতম সিপাহসালার ছিলেন শহীদ ওসমান হাদি। তিনি নিজে প্রত্যক্ষ করেছিলেন যে কিভাবে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে। কিভাবে তাদের ওপর গণহত্যা চালানো হয়েছে। জবানবন্দিতে এসবের বর্ণনা তিনি এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে দিয়েছিলেন। শহীদ হওয়ার কারণে ট্রাইব্যুনালে এসে তার সাক্ষ্য দেওয়া আর সম্ভব নয়। এ জন্য আইনানুযায়ী তার জবানবন্দিটি সাক্ষ্য হিসেবে নিতে আদালতে আবেদন করেছিলাম। শুনানি শেষে তা মঞ্জুর করেন আদালত।

তিনি বলেন, আমাদের আইনের একটি বিধান রাখা হয়েছে যে, যদি কোনো সাক্ষীর এমন বক্তব্য তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে দেওয়া থাকে, কিন্তু পরবর্তীতে তার পক্ষে আর কখনও সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আদালতে উপস্থিত হওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে আদালত তার সেই বক্তব্যকে সত্য বক্তব্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। আর এ ধারার অধীনেই আমরা আজ আবেদনটি দিয়েছিলাম।

এর আগে, ১২ আগস্ট সাত আসামিরই সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে যুক্তিতর্ক শেষ করে প্রসিকিউশন। এ মামলায় সব আসামির অপরাধ গুরুতর বলে ব্যাখ্যা দিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি ট্রাইব্যুনালকে জানান, তাদের বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগই প্রমাণ করতে পেরেছে প্রসিকিউশন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে বহু মানুষকে হত্যা ও আহত করার জন্য তারা দায়ী। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। কোনো অনুকম্পা না দেখিয়ে সাত আসামির সর্বোচ্চ সাজা চান তারা।

গত ৪ আগস্ট এ মামলায় প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শুরু হয়। প্রথম দিন মামলার সামগ্রিক পটভূমি তুলে ধরেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। এরপর টানা পাঁচ কার্যদিবসে সাত আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও যুক্তি উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ।

এর আগে গত ২ আগস্ট এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শেষ হয়। তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দেন মোট ২৯ জন সাক্ষী। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দেওয়া ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন একই আদালত।ছবি: সংগৃহীত
 

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!