শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

অসুস্থ হওয়ার পরই কি স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের ভাবনা শুরু হয়?

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৬, ২০২৬, ০২:৪৭ পিএম

অসুস্থ হওয়ার পরই কি স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের ভাবনা শুরু হয়?

মাহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন: আমরা সাধারণত স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবতে শুরু করি তখনই, যখন শরীর কোনো সংকেত দিতে শুরু করে। দীর্ঘদিনের ক্লান্তি, হঠাৎ অসুস্থতা, পরীক্ষার রিপোর্টে অস্বাভাবিক কিছু কিংবা পরিবারের কারও গুরুতর রোগ—এসব ঘটনা আমাদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করে তোলে।

কিন্তু তার আগে?

আমরা কি নিয়মিত নিজের স্বাস্থ্যের খোঁজ রাখি? প্রয়োজনীয় তথ্য জানার চেষ্টা করি? কোন অভ্যাস ভবিষ্যতে অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে, তা বোঝার চেষ্টা করি? নাকি অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসা খোঁজাকেই স্বাস্থ্যসচেতনতার প্রধান কাজ বলে মনে করি?

আমার কাছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা এখানেই। আমরা চিকিৎসার প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিই, কিন্তু সুস্থ থাকার প্রস্তুতিকে কি যথেষ্ট গুরুত্ব দিই?

চিকিৎসা প্রয়োজন, কিন্তু সচেতনতাও প্রয়োজন

একটি দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার বড় দায়িত্ব অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিত করা। দক্ষ চিকিৎসক, আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, হাসপাতালের সক্ষমতা, জরুরি সেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ—এসবের বিকল্প নেই।

কিন্তু মানুষের সুস্থতা নিয়ে ভাবনা যদি কেবল হাসপাতালমুখী হয়, তাহলে স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আড়ালে থেকে যায়।

অনেক স্বাস্থ্যসমস্যার ক্ষেত্রে জীবনযাপনের অভ্যাস, ঝুঁকির কারণ সম্পর্কে সচেতনতা, প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সব রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, আবার সবার জন্য একই ধরনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। বয়স, শারীরিক অবস্থা, পারিবারিক ইতিহাস ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

তবু একটি বিষয় স্পষ্ট স্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক সময়ে সঠিক ধারণা থাকলে মানুষ নিজের প্রয়োজন বুঝতে এবং যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে আরও প্রস্তুত হতে পারেন।

তথ্যের অভাব যেমন সমস্যা, ভুল তথ্যও তেমনি

ডিজিটাল যুগে স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য পাওয়া আগের চেয়ে অনেক সহজ। একটি সার্চ, একটি ভিডিও কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্ট থেকে মানুষ অসংখ্য তথ্য জানতে পারেন।

কিন্তু তথ্যের সহজলভ্যতা মানেই নির্ভরযোগ্য জ্ঞান নয়।

একটি উপসর্গের সঙ্গে বিভিন্ন রোগের মিল থাকতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কোনো পরামর্শ সবার জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। আবার কোনো পরীক্ষার ফল সম্পর্কে অসম্পূর্ণ ধারণা অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগও তৈরি করতে পারে।

এখানে আমাদের একটি মৌলিক পার্থক্য বুঝতে হবে—তথ্য পাওয়া আর তথ্য বুঝে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এক বিষয় নয়।

স্বাস্থ্যবিষয়ক যোগাযোগের উদ্দেশ্য তাই শুধু মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন এমন তথ্য দেওয়া, যা সহজবোধ্য, দায়িত্বশীল এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে কাজে লাগে।

স্বাস্থ্যসচেতনতা মানে সব রোগ সম্পর্কে ভয় পাওয়া নয়; নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে শেখা।

স্বাস্থ্যসেবা কি শুধু হাসপাতালের দায়িত্ব?

এই প্রশ্নের উত্তর এককভাবে দেওয়া যায় না। মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষায় ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, গণমাধ্যম, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র সবার ভূমিকা রয়েছে।

পরিবারে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা, শিশুদের পুষ্টি ও শারীরিক কার্যক্রমে গুরুত্ব দেওয়া, প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য জানাএসবের শুরু দৈনন্দিন জীবনেই।

একইভাবে, স্কুল-কলেজে স্বাস্থ্যশিক্ষা, কর্মক্ষেত্রে সুস্থ পরিবেশ, জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা এবং সহজে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ।

হাসপাতাল ও চিকিৎসকদেরও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রয়েছে। চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি তাঁরা সাধারণ মানুষের কাছে রোগ, ঝুঁকির কারণ এবং কখন চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন এসব বিষয়ে দায়িত্বশীল তথ্য পৌঁছে দিতে পারেন।

তবে এই দায়িত্ব পালনের সময় সতর্কতা জরুরি। মানুষকে অযথা ভয় দেখানো, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করা কিংবা সব সমস্যার সহজ সমাধান আছে এমন ধারণা দেওয়া উচিত নয়।

সচেতনতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষকে বাস্তবসম্মত ও উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার ধরন বদলানো দরকার

আমরা স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রচারণায় প্রায়ই রোগের নাম, লক্ষণ কিংবা চিকিৎসার সুবিধা নিয়ে কথা বলি। এগুলো প্রয়োজনীয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন প্রশ্নগুলোও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

কোন লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত? কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা কখন প্রয়োজন হতে পারে? দীর্ঘদিনের একটি সমস্যাকে কখন অবহেলা করা ঠিক নয়? অনলাইনে পাওয়া স্বাস্থ্যতথ্যের নির্ভরযোগ্যতা কীভাবে যাচাই করা যায়?

এসব প্রশ্নের উত্তর সহজ ভাষায় পৌঁছে দেওয়া গেলে মানুষ নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে আরও সচেতন হতে পারেন।

এখানে ডিজিটাল মাধ্যম একটি কার্যকর সুযোগ তৈরি করেছে। তবে কতজন মানুষ একটি পোস্ট দেখলেন, সেটিই একমাত্র সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। বরং দেখতে হবে, তথ্যটি মানুষের কোনো বাস্তব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে কি না এবং তাঁকে প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ বুঝতে সাহায্য করেছে কি না।

প্রতিরোধের কথা বললেই কি চিকিৎসার গুরুত্ব কমে যায়?

একটি ভুল ধারণা হতে পারে—স্বাস্থ্য প্রতিরোধ নিয়ে বেশি কথা বললে হাসপাতাল বা চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা কম গুরুত্ব পাবে।

বাস্তবতা এত সরল নয়।

প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ, স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং চিকিৎসাসেবা পরস্পরের বিকল্প নয়; বরং একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থায় তারা একে অপরের পরিপূরক।

কেউ অসুস্থ হলে তাঁর প্রয়োজন যথাযথ চিকিৎসা। আবার অসুস্থতার ঝুঁকি কমানো, প্রয়োজনীয় সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রে নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য তাই শুধু রোগ দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়। মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সুস্থ থাকা, ঝুঁকি বোঝা, অসুস্থ হলে সঠিক সময়ে চিকিৎসা নেওয়া এবং চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সুযোগ তৈরি করাও এর অংশ।

আমাদের চিন্তার কেন্দ্রে থাকা উচিত মানুষ

স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনায় আমরা অনেক সময় হাসপাতালের সংখ্যা, চিকিৎসা প্রযুক্তি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কিংবা সেবার সক্ষমতা নিয়ে কথা বলি। এসবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর পাশাপাশি একটি সাধারণ প্রশ্নও থাকা দরকারমানুষ কি নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য পাচ্ছেন? তিনি কি বুঝতে পারছেন কখন সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন? নির্ভরযোগ্য সেবায় পৌঁছানোর পথ কি তাঁর কাছে পরিষ্কার?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু হাসপাতাল দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন পরিবার, সমাজ, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদের সম্মিলিত উদ্যোগ।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবাকে আরও কার্যকর করতে হলে চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যসচেতনতা, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সময়মতো সেবা নেওয়ার সংস্কৃতিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

কারণ একজন মানুষ অসুস্থ হওয়ার পর তাঁর পাশে দাঁড়ানো যেমন জরুরি, তেমনি অসুস্থতার ঝুঁকি বুঝতে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে তাঁকে আগে থেকেই সাহায্য করাও গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের ভাবনা যদি শুধু অসুস্থতার দিনেই শুরু হয়, তাহলে আমরা সুস্থ থাকার প্রস্তুতির একটি বড় সুযোগ হারাই।

স্বাস্থ্যসচেতন সমাজ গড়ে তোলার শুরু তাই শুধু হাসপাতালের দরজায় নয়। শুরু হতে পারে পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে, নির্ভরযোগ্য তথ্যের মাধ্যমে এমনকি নিজের শরীরের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়ার একটি ছোট সিদ্ধান্ত থেকেও।

শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবার সাফল্য শুধু কতজন মানুষ চিকিৎসা পেলেন, তা দিয়ে বিচার করলে চলবে না। আমাদের এটিও ভাবতে হবে মানুষ কি নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে আরও সচেতন হতে পেরেছেন, প্রয়োজনের সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন এবং নির্ভরযোগ্য সেবায় পৌঁছানোর সুযোগ পেয়েছেন?

কারণ সুস্থ থাকার দায়িত্ব শুধু অসুস্থ হওয়ার পর শুরু হয় না; এর প্রস্তুতি শুরু হয় তারও আগে।

লেখক: মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন. হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর, এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম
 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!