ডেইলি খবর ডেস্ক: ইরানের সঙ্গে পাঁচ মাস ধরে চলা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী তাদের অত্যন্ত নির্ভুল দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের বড় অংশ ব্যবহার করে ফেলেছে বলে দাবি করেছেন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্র। তাদের মতে, এতে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলায় মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার (০৪ আগস্ট) আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক্সক্লুসিভ এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে সেনাবাহিনীর ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম (এটিএসিএমএস) এবং প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল (পিআরএসএম)। দুটি সূত্রের দাবি, এই দুই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় পুরো মজুত ব্যবহার করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এসব দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কতটা কমে গেছে, সে তথ্য আগে প্রকাশ্যে আসেনি। দূর থেকে নিরাপদ অবস্থানে থেকে নির্ভুল হামলা চালানোর সক্ষমতার কারণে এই অস্ত্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ভাণ্ডারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা এটিএসিএমএস ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেন যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, যার মাধ্যমে ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে, পিআরএসএম নতুন প্রজন্মের আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র, যা ধীরে ধীরে এটিএসিএমএসের জায়গা নিচ্ছে এবং এর পাল্লাও বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ১০ লাখ মার্কিন ডলারেরও বেশি এবং চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো সংঘাতে এসব অস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বর্তমানে কতটি ক্ষেপণাস্ত্র অবশিষ্ট আছে, সে বিষয়ে সূত্রগুলো কিছু জানায়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছিলেন। সে সময় তিনি যুদ্ধ স্বল্প সময়েই শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করেছিলেন।
কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায়, বিষয়টি জানা তিনটি সূত্রের মতে, ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে যাওয়ায় রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধ সক্ষমতা সীমিত হতে পারে।
আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর দায়িত্বে থাকা সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) যুদ্ধ শুরুর আগে তাদের হাতে থাকা প্রায় সব স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ফেললেও বিশ্বের অন্যান্য স্থানে থাকা মার্কিন সামরিক মজুত থেকে নতুন সরবরাহ পেয়েছে। বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে সব সূত্রই নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলেছেন।
মজুতসংক্রান্ত তথ্যের বিষয়ে মন্তব্য চাইলে হোয়াইট হাউস ট্রাম্পের একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। এতে তিনি বলেন, বিশ্বের অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় আমাদের কাছে অনেক বেশি গোলাবারুদ রয়েছে এবং প্রয়োজনের তুলনায়ও অনেক বেশি
ট্রাম্প আরও বলেন, আমাদের প্রতিরক্ষা শিল্প এখন ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গোলাবারুদ উৎপাদন করছে। একই সঙ্গে কারখানা ও উৎপাদন সক্ষমতাও রেকর্ড হারে বাড়ানো হচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা একমত যে, আর্টিলারি শেল ও বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বর্তমানে রেকর্ড পর্যায়ে রয়েছে। তবে তাদের সতর্কবার্তা, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালানোর জন্য এই উৎপাদন যথেষ্ট নাও হতে পারে।
এটিএসিএমএস, পিআরএসএম এবং টিএইচএএডি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নির্মাতা লকহিড মার্টিন ট্রাম্পের বক্তব্য বা অস্ত্রের মজুত নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। একইভাবে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর নির্মাতা রেথিয়নও এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
রয়টার্সের অনুরোধে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনী। প্রেসিডেন্ট যেখানেই ও যখনই প্রয়োজন মনে করবেন, অভিযান পরিচালনার জন্য যা দরকার সবই আমাদের রয়েছে। আমরা একাধিক কমব্যাট কমান্ড এলাকায় সফলভাবে অভিযান পরিচালনা করেছি এবং একই সঙ্গে দেশের জনগণ ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় অস্ত্রভাণ্ডারও ধরে রেখেছি।
সূত্রগুলোর দাবি, গত সপ্তাহে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে একাধিক বৈঠকে এই মজুতসংক্রান্ত তথ্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে প্রশ্ন উঠেছে, অস্ত্রের মজুত এতটা কমে গেলে যুক্তরাষ্ট্র আর কতদিন ইরানে হামলা অব্যাহত রাখতে পারবে, কারণ এতে বিশ্বের অন্য কোথাও সংকট দেখা দিলে সামরিক প্রতিক্রিয়া জানানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
একটি সূত্রের মতে, এটিএসিএমএস ও পিআরএসএমের মজুত দ্রুত কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্ত, যাতে ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে হামলায় পাইলটচালিত যুদ্ধবিমান ব্যবহার না করে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর বেশি নির্ভর করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা কোনো প্রতিপক্ষ, বিশেষ করে চীনের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধে এই অস্ত্রগুলো অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। মার্চে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইরানের অভ্যন্তরে লক্ষ্যবস্তুতে হামলায়ও এসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, পিআরএসএম তুলনামূলক নতুন হওয়ায় শুরু থেকেই এর মজুত সীমিত ছিল। তবে ২০২৭ সালের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী বিপুলসংখ্যক পিআরএসএমের অর্ডার দিয়েছে। একই সঙ্গে এটিএসিএমএস ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করে নতুন পিআরএসএম উৎপাদনে জোর দেওয়া হচ্ছে।
দুটি সূত্রের দাবি, সামরিক কর্মকর্তারা কয়েক সপ্তাহ ধরেই প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করে আসছিলেন যে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের মতো প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের মজুতও দ্রুত কমে যাচ্ছে। গত সপ্তাহে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানায়, সামরিক উপদেষ্টাদের এমন সতর্কবার্তার কারণেই ট্রাম্প ইরানে আরেকটি বড় ধরনের হামলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।
তবে একজন মার্কিন কর্মকর্তা এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর চাপের কারণেই ট্রাম্প নতুন হামলা থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেন।
ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার সাংবিধানিক ক্ষমতা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এখন পর্যন্ত যুদ্ধ ঘোষণা বা সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমোদনের জন্য কংগ্রেসে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানো হয়নি।
এদিকে গত সপ্তাহে প্রকাশিত সিএসআইএসের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের প্রায় ৬৫ শতাংশ ব্যবহার করেছে। একই সময়ে টিএইচএএডি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টরের মজুত যুদ্ধ শুরুর সময়ের তুলনায় অন্তত ৩৮ শতাংশ কমে গেছে। প্যাট্রিয়ট ও টিএইচএএডি; দুটি ব্যবস্থাই আগত ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও ধ্বংস করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে অন্যতম।
রয়টার্স এই পরিসংখ্যান স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। তবে দুটি সূত্র জানিয়েছে, সিএসআইএসের দেওয়া তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ উপাত্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
একটি সূত্র আরও দাবি করেছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বৈশ্বিক টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মোট মজুতের প্রায় অর্ধেকের কিছু কম ব্যবহার করেছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সাধারণত যুদ্ধজাহাজ থেকে নিক্ষেপ করা হয়।
টমাহক যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর প্রধান দূরপাল্লার হামলা সক্ষমতা। ডেস্ট্রয়ার, ক্রুজার ও সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য এই ক্ষেপণাস্ত্র পাইলটের ঝুঁকি ছাড়াই শক্তিশালী প্রতিরক্ষা থাকা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ব্যবহৃত হয়।
এদিকে আরটিএক্স জানিয়েছে, পেন্টাগনের সঙ্গে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি বহু-বছর মেয়াদি প্রাথমিক চুক্তিতে পৌঁছেছে তারা। একই সঙ্গে অন্যান্য গোলাবারুদের উৎপাদনও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত তাদের অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠন করতে পারে। সূত্র : রয়টার্স

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :