মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩

সৌদির আকাশে যুদ্ধের ছায়া, বাংলাদেশের ঘরে ঘরে অনিশ্চয়তা!

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৩, ২০২৬, ০১:৪২ পিএম

সৌদির আকাশে যুদ্ধের ছায়া, বাংলাদেশের ঘরে ঘরে অনিশ্চয়তা!

আহসান হাবিব: সম্প্রতি ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের অব্যাহত ও বেপরোয়া সামরিক আগ্রাসনে সৌদি আরবের আকাশসীমা ও অর্থনৈতিক মূল কেন্দ্রগুলো যে চরম নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়েছে, তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আঁচ এসে লাগছে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক এই উত্তাপ কেবল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল সমীকরণেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন বাংলাদেশের শ্রমবাজার, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মূল উৎস রেমিট্যান্স, জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা ও দ্রব্যমূল্যের অস্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে। যে সৌদি আরব আমাদের কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে ঘাম ঝরিয়ে আমাদের লাখ লাখ প্রবাসী কর্মী দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখেন, সেই ভূখণ্ডে যুদ্ধের এই কালো ছায়া আমাদের ঘরে ঘরে গভীর শঙ্কা ও চরম অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে।

ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা যেভাবে আন্তর্জাতিক নীতি-নৈতিকতা ও বেসামরিক নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করে একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকেই ধ্বংস করছে না, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যের সবচেয়ে সংবেদনশীল রুটগুলোকে এক চরম বিপজ্জনক মোহনায় এনে দাঁড় করিয়েছে। রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন কৌশলগত স্থাপনায় তাদের এই প্রাণঘাতী হামলা বৈশ্বিক বিমান চলাচল এবং বাণিজ্যিক সরবরাহশৃঙ্খলকে স্তব্ধ করে দিচ্ছে। এর সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক দিক হলো, এই ধ্বংসাত্মক হামলায় আমাদেরই নিরপরাধ প্রবাসী ভাইদের রক্ত ঝরছে। রুটি-রুজির সন্ধানে প্রিয়জনদের মায়া কাটিয়ে যে মানুষগুলো সুদূর প্রবাসে রক্তকে জল করে দেশের চাকা সচল রাখছিলেন, হুতিদের দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বর্বরোচিত হামলায় তাঁদের কয়েকজনকে প্রাণ দিতে হয়েছে, অনেকেই এখন হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। বেসামরিক নাগরিক ও প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে হুতিদের এই ধারাবাহিক আঞ্চলিক উগ্রতার তীব্র প্রতিবাদ জানানো এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাধ্যমে একে কঠোরভাবে সামাল দেওয়া এখন বৈশ্বিক মানবতা ও স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান দাবি।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায়, আমাদের বৈশ্বিক কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের স্তম্ভটি মূলত মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষত সৌদি আরবকেন্দ্রিক। বর্তমানে ৪০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি সৌদি আরবে কাজ করছেন। কেবল গত বছরই দেশটি থেকে প্রায় পৌনে ছয় বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স বাংলাদেশে এসেছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি মেটাতে ও সামষ্টিক অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু সৌদির অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থা যদি এই যুদ্ধের কারণে দীর্ঘমেয়াদে স্থবির হয়ে পড়ে, তবে তার সরাসরি ও চরম প্রভাব এসে পড়বে আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি ও প্রবাসী পরিবারগুলোর ওপর। সৌদি আরবের অভ্যন্তরে মূল্যস্ফীতি বাড়লে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেলে প্রবাসীদের সঞ্চয় কমে যাবে, যার অবধারিত পরিণতি হিসেবে দেশে রেমিট্যান্স আসা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাবে। অন্যদিকে, রিয়াদ বিমানবন্দরকেন্দ্রিক অচলাবস্থা ও ফ্লাইট বাতিলের কারণে ইতিমধ্যেই হাজার হাজার বাংলাদেশি কর্মী বিমানবন্দরে আটকা পড়েছেন, অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে, নতুন করে কাজে যোগ দেওয়ার স্বপ্নগুলো অনিশ্চয়তার মুখে ভেঙে পড়ছে। বিদেশে নতুন কর্মসংস্থানের বড় একটি দরজা যদি এভাবে বন্ধ বা সংকুচিত হয়ে যায়, তবে দেশের অভ্যন্তরীণ বেকারত্ব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।

এই সংঘাতের অভিঘাত কেবল শ্রমবাজারের গণ্ডিতেই আটকে থাকছে না, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও কৃষি খাতের ওপরও তা বড় ধরনের হুমকি তৈরি করেছে। বছরে আমাদের প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ আমদানি করতে হয়, যার অন্যতম প্রধান উৎস সৌদি আরামকো এবং আবুধাবির অ্যাডনক। লোহিত সাগর ও বাব এল-মান্দেব প্রণালির মতো কৌশলগত নৌপথ যদি যুদ্ধের উত্তেজনায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সময়মতো ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেল পাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। আমাদের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে পরিশোধিত তেলের ওপর ভিত্তি করেই দেশের পরিবহন, শিল্প ও কৃষি খাত সচল থাকে। জ্বালানির এই সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বা অতিরিক্ত পরিবহন খরচের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারগুলোতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। একই কথা প্রযোজ্য কৃষিভিত্তিক সারের ক্ষেত্রেও। সৌদি আরব থেকে নিয়মিত বিরতিতে ইউরিয়া ও ডিএপি সার আমদানি করে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক পরিবহন রুটে অনিশ্চয়তা বা শিপিং চার্জ বৃদ্ধি পেলে কৃষি উৎপাদনের খরচ অনেক বেড়ে যাবে, যা খাদ্যনিরাপত্তার ওপর নতুন এক চাপ সৃষ্টি করবে।মানচিত্র দেখুন

ভূরাজনৈতিক এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও জাতীয় কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে এক অভাবনীয় পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিগত কয়েক বছরে সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ ও বাণিজ্য প্রসারের যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল, অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার এই ডামাডোলে তার গতিও অনেকটাই শ্লথ হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে প্রথাগত ও গতানুগতিক পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সংকট মোকাবিলায় সরকারকে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী, সংবেদনশীল ও গতিশীল রাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে হবে। সর্বাগ্রে সৌদিতে অবস্থানরত আমাদের কর্মীদের জীবন ও জীবিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দূতাবাসের মাধ্যমে নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। বিমান জটিলতা ও সংঘাতের কারণে যেসব প্রবাসী কর্মী কাজে ফিরতে পারছেন না, তাঁদের ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষার বিষয়টি সৌদি সরকারের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করে নিশ্চিত করা জরুরি।

এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমাদের শ্রমবাজার ও জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প উৎস খুঁজে বের করার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। একক কোনো দেশ বা অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যেকোনো জাতীয় অর্থনীতির জন্যই মারাত্মক বিপজ্জনক হতে পারে—আজকের এই সংকট আমাদের সেই সত্যকেই পুনরায় মনে করিয়ে দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় অঞ্চলে দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করতে হবে। দেশের প্রচলিত শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করে এমন দক্ষ কর্মী তৈরি করা প্রয়োজন, যাঁরা যেকোনো বৈশ্বিক সংকটেও নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেন। একইভাবে, জ্বালানি ও কৃষি উপকরণের জন্য একক নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প আন্তর্জাতিক উৎস এবং অভ্যন্তরীণ নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।বাংলাদেশ সংবাদ

সৌদির আকাশের এই সামরিক সংঘাত কেবল একটি ভৌগোলিক এলাকার যুদ্ধ নয়, এটি আধুনিক বিশ্বায়নের যুগে আমাদের সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়েথাকা এক কঠিন বাস্তবতা। এই দুর্যোগময় মুহূর্তে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ, দূরদর্শী কূটনৈতিক সংলাপ এবং অভ্যন্তরীণ সতর্কতামূলক নীতি গ্রহণ করাই আমাদের একমাত্র পথ। সংকটকে যদি আমরা সময়োচিত রাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে মোকাবিলা করতে পারি, তবেই কেবল প্রবাসীদের রক্তের ঘামে অর্জিত আমাদের জাতীয় অর্থনীতি রক্ষা পাবে এবং দেশের কোটি পরিবারের ভবিষ্যৎ আবারও অনিশ্চয়তার আঁধার কাটিয়ে আলোর মুখ দেখবে ইনশাল্লাহ। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন।

সুত্র-মানবজমিন: লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, ‘আমার দিন’

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!