মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩

বিশ্লেষণ-মক্কা জোটে বাংলাদেশ, ইরান, মিসর যোগ দিলে কী হবে?

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬, ০৯:১০ পিএম

বিশ্লেষণ-মক্কা জোটে বাংলাদেশ, ইরান, মিসর যোগ দিলে কী হবে?

ডেইলি খবর ডেস্ক: পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরব ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে স্বাক্ষর করেছে মাত্র তিন সপ্তাহ আগে। এরপর চুক্তির যৌথ প্রতিরক্ষা অঙ্গীকারের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। সেটি হলো- আর কোন কোন দেশ এতে যোগ দিতে পারে?

বাংলাদেশ প্রকাশ্যে আগ্রহের কথা জানিয়েছে। মিসরও সম্ভাবনা পর্যালোচনা করছে। ইরান এতে যোগ দিলে তা সবচেয়ে বড় ঘটনায় পরিণত হবে। কিন্তু দেশটির যোগদান নিয়ে দুই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। পার্লামেন্টের  গণমাধ্যমবিষয়ক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তেহরান আমন্ত্রণ পেয়েছে। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তাদের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পৌঁছায়নি।

জোটের বিস্তার বাড়লে তা পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে পারস্য উপসাগর হয়ে ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে যাবে। তবে প্রথম সম্প্রসারণ সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যের কোনো শক্তিধর দেশ থেকে নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়া থেকে হতে পারে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সম্প্রতি বলেছেন, ঢাকা এই চুক্তিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এতে অংশ নেওয়ার বিষয়টিকেও ইতিবাচকভাবে দেখছে।

বাংলাদেশের যোগদানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়াবে
ঢাকাকে এই জোটে অন্তর্ভুক্ত করা হলে বর্তমান সদস্যদের সঙ্গে আরও একটি বড় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ যুক্ত হবে। একইসঙ্গে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জোটটির ভৌগোলিক পরিসর বাড়বে। সেক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত-পাকিস্তানের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নতুন মাত্রা যোগ হবে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোহাম্মদ আলী জাফর বলেন, মক্কা চুক্তির বর্তমান সদস্যদের জন্য বাংলাদেশ হয়তো একটি সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কিন্তু দেশটি সম্প্রতি অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। এটি বিবেচনায় নিলে ঢাকার পক্ষে এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে হচ্ছে।

আলী জাফরের মতে, মক্কা জোটে বাংলাদেশের যোগদান ভারতকে অস্বস্তিতে ফেলবে। দিল্লির উদ্বেগের বিষয় হলো, ভবিষ্যতে কোনো সংঘাতের ক্ষেত্রে ঢাকা পাকিস্তানের সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে পারে। কারণ চুক্তিতে বলা হয়েছে, এক সদস্যের ওপর হামলাকে সব সদস্যের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন আলী জাফর। তিনি বলেন, ‘ঢাকার কাছে দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে কোনো সংঘাতের দায়ভার নেওয়ার মতো যথেষ্ট কৌশলগত কারণ আছে কি না?’ উত্তরে জাফর নিজেই বলেন, বর্তমান অবস্থায় ঢাকার কোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার যুক্তি নেই। তবে ইরান ও অন্যান্য দেশ যোগ দিলে বাংলাদেশ সদস্য হওয়ার কৌশলগত মূল্য নতুন করে বিবেচনা করতে পারে।

কিন্তু ইরানের অবস্থানের কারণে জোট সম্প্রসারণের আলোচনা জটিল হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি পার্লামেন্টভিত্তিক বার্তা সংস্থার প্রধান মেহদি রহিমির বরাত দিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এতে বলা হয়েছে, তেহরানকে জোটে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং প্রস্তাবটি বিবেচনাধীন। তবে গত ২৪ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বিষয়টি অস্বীকার করেন।

ইরান: গুরুত্ব বাড়বে, ঝুঁকিও আছে
ইরান যোগ দিলে জোটের তাৎপর্য অনেক বেড়ে যাবে। কিন্তু জোটটি এমন সময়ে গঠন হয়েছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে তেহরান সরাসরি সংঘাতে যুক্ত। উপসাগরীয় দেশগুলোতে তাদের হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বৃহত্তর স্বার্থের কারণে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এরইমধ্যে বদলে গেছে। জোটের প্রতিষ্ঠাকালীন তিন সদস্যই ইরানের আগ্রাসী সামরিক অবস্থান ও ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বিগ্ন।

তেহরানের ইনস্টিটিউট ফর বিআরআই স্টাডিজের গবেষক আলি হোসেইনির (ছদ্মনাম) মতে, এই জোটে অংশগ্রহণ বড় ধরনের কৌশলগত ভুল হবে। কারণ, ইরানকে ঘিরে উদ্বেগ থেকেই চুক্তিটির নিরাপত্তা কৌশল তৈরি হয়েছে।

হোসেইনি বলেন, মক্কা চুক্তির কৌশলগত কাঠামোটি ইরানের সামরিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি ব্যবস্থা। বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট। ফলে এই কাঠামোর আওতায় থাকলে ইরানের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ সীমিত হয়ে যাবে। তাই সামরিকভাবে একীভূত না হয়ে সদস্যপদের প্রশ্নটি কূটনৈতিকভাবে উন্মুক্ত রাখলে তেহরান লাভবান হতে পারে।

অপরদিকে আলী জাফর বলছেন, ইরানের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ এই জোটকে ছোট থেকে বৃহৎ রূপ দিতে পারে। কিন্তু তার আগে রাজনৈতিক ও কৌশলগত মতপার্থক্যগুলো সমাধান করা প্রয়োজন। বর্তমান সদস্যরা নিশ্চয়ই ইরানকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সংঘাতে জড়াতে চাইবে না।

এই টানাপোড়েনই চুক্তিটির মূল বৈপরীত্যকে তুলে ধরে। নতুন সদস্য যুক্ত হলে কৌশলগত গুরুত্ব হয়তো বাড়বে। কিন্তু অতিরিক্ত সদস্যের সঙ্গে নতুন প্রতিপক্ষ, দায়বদ্ধতা এবং পরস্পরবিরোধী বিষয়গুলোও যুক্ত হবে।

মিসর: ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তির জটিলতা
জোটের সদস্য হওয়ার বিষয়ে মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি বলেছেন, তারা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সাংবিধানিক ও আইনি বাধ্যবাধকতাগুলো সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ (আইএনএসএস) ও তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষক অফির উইন্টার বলেন, মিসর এখানো দ্বিধায় আছে। কারণ, চুক্তিটি ঠিক কাদের ঠেকাতে তৈরি এবং সদস্য হলে কী ধরনের সামরিক দায়বদ্ধতা তৈরি হবে- এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি।

কায়রোকে অত্যন্ত জটিল কিছু সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে। ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের একটি শান্তি চুক্তি আছে। তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। পাশাপাশি ভারতসহ আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গেও কৌশলগত সম্পর্ক আছে।

উইন্টার বলেন, এ কারণে মিসর সামরিক জোটে সরাসরি যুক্ত হওয়ার পরিবর্তে কূটনৈতিক সমন্বয়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তারা একটি আঞ্চলিক জোটকে বেছে নিয়ে অন্যটির সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না। তারা শুধু ইসরায়েলের সঙ্গেই নয়, গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক ধরে রাখতে চায়। আবার তুরস্কের সঙ্গেও অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতায় জড়াতে চায় না।

এখানে আইনি বিষয়ও আছে। সেটি হলো ১৯৭৯ সালের মিসর-ইসরায়েল শান্তি চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদ। এতে বলা হয়েছে, কোনো পক্ষই চুক্তির সাংঘর্ষিক দায়বদ্ধতায় জড়াবে না। উইন্টার বলেন, মক্কা জোটের কোনো সদস্যের কারণে মিসরকে ভবিষ্যতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে কি না- এই বিষয়গুলো সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করতে হবে।

নজর রাখছে ইসরায়েল
ইসরায়েলের দৃষ্টিকোণ থেকে তুরস্কই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করেন উইন্টার। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, ইসরায়েলের প্রধান উদ্বেগ তুরস্ককে ঘিরে। কারণ আমরা প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বক্তব্য ও ঘোষণাগুলো শুনছি। মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের সমর্থন দেখছি। পাশাপাশি নতুন সিরীয় সরকারের সঙ্গে তুরস্কের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও আছে।’

উইন্টার বলেন, তুরস্ক যখন কোনো আঞ্চলিক জোটের অংশ হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই ইসরায়েলে উদ্বেগ তৈরি হয়। তারা সম্ভবত নতুন আঞ্চলিক অক্ষগুলোর সংহতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ, এটি আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের ধারণার বিপরীত।

পাকিস্তানের জন্য সুযোগ
ভৌগোলিকভাবে ইসলামাবাদ মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে হলেও সৌদি আরবের সঙ্গে গভীর সামরিক সম্পর্ক আছে। তারা তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা এবং ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখে। আলী জাফরের মতে, এই অবস্থান পাকিস্তানকে শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় সীমাবদ্ধ না রেখে একাধিক অঞ্চলের প্রভাবশালী শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে।

আলী জাফর বলেন, পাকিস্তানের বৃহত্তর লক্ষ্য শুধু সামরিক সহযোগিতা নয়। বরং দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আরও বেশি কৌশলগত সক্ষমতা ও প্রভাব অর্জন করা। ইসলামাবাদ ক্রমেই নিজেদেরকে একটি মধ্যম শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। তারা এমন কিছু দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে যারা নিজেরা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বি হলেও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন যেভাবে দেখবে
মক্কা জোটকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে দেখতে পারে সেটি নিয়েও ধারণা দিয়েছেন আলী জাফর। তিনি বলেন, ভিন্ন ভিন্ন করণে ওয়াশিংটন ও বেইজিং উভয়ই আঞ্চলিক অংশীদারদের বৃহত্তর নিরাপত্তা সহযোগিতাকে স্বাগত জানাতে পারে। চীন এটিকে বহুমেরুকেন্দ্রিক আঞ্চলিক ব্যবস্থার সহায়ক হিসেবে দেখতে পারে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন আঞ্চলিক দেশগুলোর দায়িত্ব ভাগাভাগির বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখবে। তবে নিজেদের কৌশলগত প্রভাব কমার বিষয়েও সতর্ক থাকবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ১৭ আগস্ট মক্কা চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তিনি এটিকে আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে, ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা থেকে পুরোপুরি সরে যেতে চায়।

এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব এবং বড় ধরনের অস্ত্র সরবরাহের সম্পর্ক আছে। মক্কা চুক্তিটিও এই বৃহত্তর উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেখানে অংশীদার দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে অস্ত্র বিক্রি, গোয়েন্দা সহযোগিতা, কূটনীতি ও কৌশলগত অংশীদারত্বের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রভাব ধরে রাখছে।

আলী জাফর বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে যে ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য উৎসাহ দিয়ে আসছে, মক্কা চুক্তিটি মোটামুটি সে ধরনেরই একটি ব্যবস্থা।’

(মূল প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক মার্কিন গণমাধ্যম দ্য মিডিয়া লাইন। গত ২৮ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনটি সংক্ষেপে অনুবাদ করা হয়েছে।)সংগৃহীত ছবি

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!