ডেইলি খবর ডেস্ক: দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গঠিত হয়েছিল ১১ দলীয় জোট। নির্বাচনী এই জোট গঠনের আগে দলগুলো নিজেদের হিসাব-নিকাশ মিলিয়ে জোটবদ্ধ হয়েছিল। তখনই বলা হয়েছিল, এই জোট আদর্শিক কোনো জোট নয়, বরং এটি নির্বাচনী জোট। জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পরই জোটের ভেতরে দেখা দেয় স্থবিরতা। গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের আন্দোলনে শরিকদের সামনে রাখা হলেও অন্যান্য ক্ষেত্রে তা করছে না প্রধান শরিক জামায়াত। ত্রয়োদশ সংসদে আসন না পাওয়া খেলাফত আন্দোলন এরই মধ্যে জোট ছেড়েছে। গত শনিবার বরিশালে জোটের বিভাগীয় সমাবেশে যায়নি খেলাফত মজলিস। এ ছাড়া মাঝেমধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে কর্মসূচি দিয়ে সক্রিয়তা জানান দেওয়ার অনুষ্ঠানেও যাচ্ছে না অনেক শরিক দল। ফলে ভাঙনের মুখে পড়েছে জোটটি।
জাতীয় নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেলেও নির্বাচনপরবর্তী সময়ে জোটের সেই ঐক্যের ভেতরে ধীরে ধীরে জমতে শুরু করেছে নানা অসন্তোষ। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান, সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন, সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা, স্থানীয় সরকার নির্বাচন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় দলের প্রাধান্য এবং আদর্শিক মতপার্থক্যÑ এসব ইস্যুতে শরিকদের মধ্যে বাড়ছে অস্বস্তি। এরই মধ্যে কওমি ধারার দলগুলোকে জোট থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। আবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে জামায়াতের এককভাবে এগোনোর কৌশলও শরিকদের মধ্যে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ফলে জোটের কর্মসূচি অব্যাহত থাকলেও অভ্যন্তরীণ টানাপড়েন ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের মতে, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনই হতে পারে ১১ দলীয় ঐক্যের জন্য বড় পরীক্ষা।
জোট-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, নির্বাচনের আগে আসন সমঝোতা, নির্বাচনী সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অংশীদারত্ব নিয়ে যে প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছিল, বাস্তবে তার অনেকটাই পূরণ হয়নি। তাদের ভাষ্য, নির্বাচন শেষ হওয়ার পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও রাজনৈতিক গুরুত্বের প্রশ্নে বড় দলই প্রাধান্য পাচ্ছে। অন্যদের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
১১ দলীয় ঐক্য জোটের ভেতরে প্রথম বড় ধরনের অসন্তোষের সৃষ্টি হয় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের নির্বাচনী পরাজয়কে কেন্দ্র করে। দলটির নেতাকর্মীদের অভিযোগ ছিল, জামায়াতে ইসলামী তার পক্ষে প্রত্যাশিত সাংগঠনিক সহযোগিতা দেয়নি। যদিও পরবর্তীতে শীর্ষ নেতাদের উদ্যোগে বিষয়টি বড় আকার ধারণ করেনি।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ওই ঘটনাই শরিকদের মধ্যে আস্থার সংকটের সূচনা করে। এদিকে, জামায়াতে ইসলামী ও তার মিত্ররা সংরক্ষিত নারী আসন পায় ১৩টি। এর মধ্যে জামায়াতের এককভাবে ১১টি আসনেরও বেশি ভাগে পড়ে। আর বাকি দুটি আসন শরিকদের। জোট শরিক অনেকেই আসন চেয়েছে জামায়াতের কাছে, কিন্তু দলটি সেইসব চাওয়া পূরণ করেনি। বরং বড় শরিকের মধ্যে তা বণ্টিত হয়। এতে জোটের ৮টি ছোট দলের মধ্যে বঞ্চনার অনুভূতি আরও তীব্র হয়।
অভিযোগ রয়েছে, শুধু নারী আসন নয়, জোটের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কর্মসূচি নির্ধারণ এবং সংসদে কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রেও শরিকদের মতামত সব সময় গুরুত্ব পায় না। জোটের কয়েকটি ছোট দলের দাবি, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং বাংলাদেশ খেলাফত তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব পায়।
অন্যদিকে, হেফাজতে ইসলামের সাম্প্রতিক অবস্থানও জোটের অভ্যন্তরীণ সমীকরণকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা কওমি ধারার রাজনৈতিক দলগুলোকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট থেকে সরে এসে পৃথক ঐক্য গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী বলেন, তারা ১১ দলীয় জোটের অংশ নয়। অন্যদিকে, খেলাফত মজলিসও জোটের কর্মসূচিতে নিজেদের অংশগ্রহণ সীমিত করেছে। দলটির মহাসচিব ড. আহমেদ আবদুল কাদের আমাদের সময়কে বলেন, সংসদে একসঙ্গে থাকলেও আপাতত জোটের কর্মসূচিতে থাকছি না। উপযুক্ত সময়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করা হবে। এ ছাড়া এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সারজিস আলম সম্প্রতি বলেছেন, জোটের মধ্যে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে ব্যবধান রয়েছে।
তবে জোটের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। কারণ, এতে দলীয় প্রতীক না থাকায় প্রতিটি দলই নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা ও জনভিত্তি যাচাই করতে চায়। ফলে জাতীয় নির্বাচনে মিত্র হলেও স্থানীয় পর্যায়ে একই জোটের শরিকরা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াতে পারেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে জামায়াত ও এনসিপির সম্পর্ক। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুদলের মধ্যে বড় টানাপড়েন সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ছোট দলগুলো জোটগত নির্বাচন চাইলেও জামায়াত এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। এতে শরিকদের মধ্যে অসন্তোষ আরও বেড়েছে।
অবশ্য কোনো ধরনের সংকটের কথা অস্বীকার করেছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও জোটের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ। স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল হালিম বলেন, এখন পর্যন্ত আমাদের দলের প্রথামিক সিদ্ধান্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচন এককভাবে করার।সুত্র-আমাদের সময়

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :