ডেইলি খবর ডেস্ক: বিশে^র যেকোনো আমদানিকারকের জন্য মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অর্থনৈতিক ঝুঁকিগুলো সমুদ্রপথেই ধেয়ে আসে—আর এই কথাটি তাদের পণ্য কেনা প্রতিটি সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
ইরান যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে পা দেওয়ার সাথে সাথে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেবল তেল ও গ্যাস শিল্পই নয়, বরং বিশ্বায়িত বাণিজ্যের প্রতীক `কনটেইনার শিপ` বা পণ্যবাহী জাহাজের বৈশ্বিক চলাচলও ওলটপালট হয়ে গেছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
ফরাসি আমদানিকারক ইমানুয়েল বেনিচুর কথাই ধরা যাক। তিনি চীন থেকে বাগান সাজানোর আসবাবপত্র আমদানি করে অনলাইনে বিক্রি করেন। যুদ্ধের কারণে পণ্যের দামের ওপর যে প্রভাব পড়ছে, তা নিয়ে তিনি চরম উদ্বিগ্ন। এএফপি-কে তিনি বলেন, ‘আমাদের পণ্যের দাম এখনো বাড়েনি। কিন্তু যুদ্ধ যদি কয়েক মাস ধরে চলে, তবে হয় আমাদের লাভের অংশ কমাতে হবে, না হয় দাম বাড়াতে হবে।’
ব্লুমবার্গের তথ্যানুযায়ী, গত বছর বৈশ্বিক কনটেইনার বাণিজ্যের ৯.৮ শতাংশ ছিল মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক। কিন্তু বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যের যে জটিল যোগসূত্র, তাতে এই যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা সারা বিশ্বে একের পর এক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তে হাজার হাজার বাণিজ্যিক জাহাজ আটকা পড়েছে, যার অর্থ হলো অনেক জাহাজ সঠিক সময়ে নির্দিষ্ট বন্দরে পৌঁছাতে পারছে না। জাহাজ পরিবহন জায়ান্ট ‘সিএমএ-সিজিএম’-এর প্রধান নির্বাহী রডলফ সাদে ফরাসি সংবাদপত্র ল্য ফিগারো-কে বলেন, ‘এমন অনেক পণ্য ভারতে পড়ে আছে যা সৌদি আরবে পৌঁছানোর কথা ছিল।’
উপসাগরীয় অঞ্চলে বেসামরিক জাহাজগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ২০টি বাণিজ্যিক জাহাজ (যার মধ্যে ৯টি তেলবাহী ট্যাঙ্কার) আক্রান্ত হয়েছে অথবা দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে।
অতিরিক্ত মাসুল-বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান রুট এই প্রণালিটি অবরুদ্ধ হওয়ায় জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। ফলে পরিবহন কোম্পানিগুলো এখন অতিরিক্ত মাসুল আরোপ করছে।
বেনিচু জানান, ‘সিএমএ-সিজিএম’ এবং তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ‘হুন্দাই মার্চেন্ট মেরিন-এইচএমএম’ যুদ্ধের কারণে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘এইচএমএম প্রতিটি কনটেইনারে জরুরি জ্বালানি খরচ বাবদ অতিরিক্ত ২৩০ ডলার নিচ্ছে এবং সিএমএ সিজিএম নিচ্ছে ১৫৫ ডলার।’
আমদানি বাজারে বেনিচু নতুন মুখ নন। তাঁর কোম্পানি ‘আয়োসম’ প্রতি মাসে প্রায় ৪০০ কনটেইনার পণ্য আমদানি করে। তিনি জানান, যুদ্ধের আগে এশিয়া থেকে ইউরোপে একটি কনটেইনার পাঠাতে যেখানে আড়াই হাজার ডলার লাগত, এখন তা বেড়ে চার হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ইয়েমেনের ইরান-পন্থি হুতি বিদ্রোহীদের হামলার ভয়ে অধিকাংশ জাহাজ লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল এড়িয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছে, যা জ্বালানি খরচ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কন্টেইনারের পাহাড়-বেনিচু আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে নিরাপত্তা ঝুঁকি, বীমা এবং গন্তব্য থেকে দূরে আটকা পড়া পণ্য সংরক্ষণের জন্য আরও বাড়তি খরচ যোগ হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজ কোম্পানিগুলো এখন কন্টেইনার গন্তব্যে পৌঁছাতে লরির সাহায্য নিচ্ছে। তারা জাহাজগুলোকে ইউরোপ ও আফ্রিকার দিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে এবং বিকল্প বন্দরের সন্ধান করছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে দুবাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে জাহাজ পৌঁছাতে না পারায় ‘সিএমএ সিজিএম’ এখন হরমুজ প্রণালির ঠিক আগেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের খোর ফাক্কান বন্দরে পণ্য খালাস করছে।
শিপিং জায়ান্ট ‘মায়ের্কস’-এর সিইও ভিনসেন্ট ক্লার্ক লা মন্ডে পত্রিকাকে বলেন, ‘সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো বন্দরগুলোতে কনটেইনারের পাহাড় জমে যাওয়া, যা টার্মিনালগুলোকে অচল করে দেবে এবং বিশাল সময়ক্ষেপণ সৃষ্টি করবে।’ অনেকের কাছে এটি কোভিড মহামারীর সেই দুঃসহ স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে, যখন প্রতিটি কনটেইনারের শিপিং খরচ ১৪ হাজার ডলারে পৌঁছেছিল।সংগৃহীত ছবি

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :