রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩

ফ্রান্সে ফের কঠোর পুলিশি পাহাড়ায় লাখো মানুষের বিক্ষোভ, হাজারো গ্রেপ্তার

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ১২:২৬ পিএম

ফ্রান্সে ফের কঠোর পুলিশি পাহাড়ায় লাখো মানুষের বিক্ষোভ, হাজারো গ্রেপ্তার

ডেইলি খবর ডেস্ক: ফ্রান্সে বিদ্যালয়ের অবনতিশীল পরিবেশ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারের নীতির প্রতিবাদে স্থানীয় সময় শনিবার (২৪ অক্টোবর) দেশজুড়ে দ্বিতীয় দফায় ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ৭০ হাজারের বেশি পুলিশ ও জেনদার্ম মোতায়েন করা হয়। দিন শেষে দেশজুড়ে প্রায় এক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, শনিবার দেশজুড়ে ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। এর মধ্যে রাজধানী প্যারিসে ছিলেন ১ লাখ ১০ হাজার। তবে দেশটির অন্যতম বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন সিজিটি দাবি করেছে, প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের প্রায় দ্বিগুণ। খবর আল জাজিরার।

প্যারিসে ইতালির ফটক থেকে শুরু হওয়া মিছিলটি শহরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের ভঁসেন ফটক পর্যন্ত যায়। শুরুতে বিক্ষোভ ছিল শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর। তবে সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। কালো পোশাক পরা কয়েকজন বিক্ষোভকারী রাস্তায় থাকা বিভিন্ন বস্তু পুলিশের দিকে ছুড়ে মারেন।

কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রায় ৫০০ দাঙ্গাকারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান। তবে গত সপ্তাহের সহিংসতার তুলনায় এবারের পরিস্থিতি ততটা ভয়াবহ ছিল না।

প্যারিসে বিক্ষোভের নির্ধারিত পথ শেষ মুহূর্তে পরিবর্তন করে শহরের কেন্দ্রের বদলে প্রান্তিক এলাকায় নেওয়ার সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আন্দোলনকারীরা। সরকার আন্দোলনের গতি কমাতে এবং বিক্ষোভকে আড়াল করতে চাইছে বলে অভিযোগ করেন তাদের কয়েকজন। শ্রমিক সংগঠন ছাড়া অন্য গোষ্ঠীর আয়োজিত বিক্ষোভও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

বিক্ষোভে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, পরিবেশকর্মী, নার্স ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তাদের স্লোগানে উঠে আসে বৈষম্য, ধনীদের সম্পদ এবং প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁর পদত্যাগের দাবি। একদল বিক্ষোভকারী স্লোগান দেন, ‘কোটি কোটি কোটিপতি, আমরা বিপ্লবের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

নিরাপত্তার কারণে প্যারিসের অন্তত ২৪টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়। লুভর ও ওর্সে জাদুঘরসহ বড় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ ছিল। আর্ট বাসেল প্যারিস তাদের সপ্তাহান্তের কর্মসূচি বাতিল করে। শহরের কেন্দ্রের অনেক দোকান বন্ধ রাখা হয় এবং বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জানালায় সুরক্ষাপ্যানেল বসায়।

গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে ব্যাপক লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সরকারি হিসাবে, দুই হাজারের বেশি মানুষকে সে সময় পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল এবং হাজারো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নতুন করে সহিংসতা ঠেকাতে এবার গত সপ্তাহের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পুলিশের বিশেষ ইউনিট রেইডও অভিযানে সহায়তা করেছে, যদিও তাদের সরাসরি জনতা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহারের কথা নয়।

শনিবার প্যারিসে দিনের শুরুতে তিন হাজারের বেশি ব্যক্তিকে তল্লাশি করে ৬৫ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় পুলিশ। পরে নুনেজ জানান, দেশজুড়ে গ্রেপ্তারের সংখ্যা প্রায় এক হাজারে পৌঁছেছে। তার দাবি, পুলিশকে ‘অত্যন্ত উচ্চমাত্রার সহিংসতার’ মুখোমুখি হতে হয়েছে।

মঁপেলিয়ে, রুয়াঁ ও নিসসহ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ ছিল। মার্সেইয়ে কঠোর শর্তে শ্রমিক সংগঠনের মিছিলের অনুমতি দেওয়া হয়, যদিও সেখানে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। লিয়নে শহরের কেন্দ্রে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ থাকলেও প্রায় ১৫০ জনের একটি জমায়েত ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে পুলিশ।

শুক্রবার শিক্ষার্থী আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রথমবারের মতো বৈঠক করেন মাক্রোঁ। তিনি আরও শিক্ষক নিয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন ও বাছাইপ্রক্রিয়া ‘পারকুরসুপ’ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। তবে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, বাস্তব পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ ভবন, শিক্ষকসংকট এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ব্যবস্থাকে অন্যায্য আখ্যা দিয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। পরে তা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সামাজিক বৈষম্য ও মাক্রোঁর সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর অসন্তোষের প্রতীকে পরিণত হয়।

গত শনিবার শিক্ষার্থী সংগঠন ও ২০১৮ সালের ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থকদের আহ্বানে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। আন্দোলনকারীরা আগামী শনিবারও নতুন বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছেন।

এদিকে, আগামী ছয় মাসের মধ্যে ফ্রান্সে গুরুত্বপূর্ণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সংবিধান অনুযায়ী, মাক্রোঁ টানা তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না এবং ২০২৭ সালে তার ক্ষমতা ছাড়ার কথা। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র‍্যালির নেতা মেরিন লে পেনকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে এগিয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে।

শনিবার ওর্লেয়াঁ শহরে লে পেনের দলের সম্মেলনে তার বিরুদ্ধে বামপন্থী বিক্ষোভকারীরা ফ্যাসিবাদবিরোধী স্লোগান দেন। একই দিন ন্যাশনাল র‍্যালি জানায়, জর্দান বারদেল্লা প্রায় ৯৯ শতাংশ ভোট পেয়ে দলের সভাপতি হিসেবে পুনর্র্নিবাচিত হয়েছেন। রোববার লে পেন ও বারদেল্লার প্রায় ১০ হাজার সমর্থকের সামনে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।সংগৃহীত ছবি

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!