ডেইলি খবর ডেস্ক: দুই সপ্তাহ আগে ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতার পুনরাবৃত্তি এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্ক অবস্থানের মধ্যেই টানা তৃতীয় সপ্তাহান্তের ছুটিতে প্যারিস ও অন্যান্য শহরের রাজপথে নেমে এসেছে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী। হ্যালোইন উৎসব উদযাপনের অংশ হিসেবে শনিবার (৩১ অক্টোবর) তাদের অনেকেই ভাঁড় ও ডাইনির পোশাক পরে এসব প্রতিবাদে অংশ নেন। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
প্যারিসের পূর্বাঞ্চলীয় সড়কগুলোতে কয়েক হাজার মানুষ মিছিল করে, যাদের অনেকের গায়ে স্পাইডার-ম্যান থেকে শুরু করে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের মতো নানা রূপসজ্জা দেখা যায়। এ সময় ওপর থেকে পুলিশের একটি হেলিকপ্টার পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিল। বিক্ষোভকারীদের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল- ‘আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার বোঝাতে কাঁদুনে গ্যাসের দরকার নেই’ বা ‘হ্যালোইনে ক্রুদ্ধ নাগরিকের সাজে এসেছি’ - এরকম কথাগুলো।
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সার্বিক পরিস্থিতি ‘সাধারণভাবে শান্ত’ রয়েছে। শনিবার দুপুর ২টা পর্যন্ত পুলিশ ২৭ জনকে গ্রেপ্তার করে, যা এক সপ্তাহ আগের ২১৭ জন গ্রেপ্তারের তুলনায় বেশ কম।প্যারিসের পাশাপাশি মার্সেই, তুলুজ এবং লিওঁসহ অন্যান্য শহরেও ছোট আকারের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।
পশ্চিমাঞ্চলীয় নঁতে শহরে কামিল গেরাঁ (৩১) নামের এক আন্দোলনকারী বলেন, "আমরা জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধিকে `না` বলছি, উগ্র-ডানপন্থীদের `না` বলছি; উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দাবিতে `হ্যাঁ` বলছি এবং নাগরিকদের মতামত প্রকাশের অধিকারকে `হ্যাঁ` বলছি।"
প্যারিস পুলিশ প্রশাসন ফরাসি রাজধানীর উপকণ্ঠে একটি শ্রমজীবী আবাসিক এলাকার মধ্য দিয়ে এই বিক্ষোভ মিছিল পরিচালনার অনুমতি প্রদান করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রায় ৭০ হাজার নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজের এক সহকারী শুক্রবার জানান, দুই সপ্তাহ আগে রাজপথে ঘটা সহিংস ঘটনার মতো এবারও পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে ভেবে পুলিশ আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। সেই সময়ে ভাঙচুর, দোকানপাট লুটপাট এবং সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগের দৃশ্য বিশ্বজুড়ে সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছিল।
একটি অভিজ্ঞ সূত্রের বরাতে জানা গেছে, প্যারিসে ৪০০ থেকে ৮০০ জনের মতো উগ্র-বামপন্থী সক্রিয়কর্মী সমবেত হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল।
`তুমি আমার ফ্রান্সকে ধ্বংস করেছো`
এমন এক উত্তপ্ত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হলো, যখন দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বাকি আর ছয় মাসেরও কম সময় এবং জনমত জরিপগুলোতে এগিয়ে রয়েছেন উগ্র-ডানপন্থী নত্রী মেরি লি পেন।
`ইয়েলো ভেস্ট` সক্রিয়কর্মী, ট্রেড ইউনিয়ন এবং স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই প্রতিবাদ আন্দোলন প্রাথমিক পর্যায়ে মূলত জীবনযাত্রার ঊর্ধ্বমুখী ব্যয়, বৈষম্য এবং শিক্ষাঙ্গনের মানহীন পরিবেশের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছিল।
তবে সরকারের কঠোর নিরাপত্তা অভিযান এবং কিছু বিক্ষোভকারী গুরুতর আহত হওয়ার পর, নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষা এবং সভা-সমাবেশের অধিকার জোরদারের দাবিও এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউরোপের অন্যান্য স্থানেও তরুণদের নেতৃত্বে একই ধরনের বিক্ষোভ দেখা গেছে, যার অংশ হিসেবে জার্মানিতেও মিছিলের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
দক্ষিণ ফ্রান্সের বন্দর শহর মার্সেইয়ের নগর কেন্দ্রে শত শত মানুষ সমবেত হন। উৎসবমুখর পরিবেশে আন্দোলনকারীরা ফ্যাসিবাদবিরোধী ও সরকারবিরোধী স্লোগান দেন। তাদের কেউ কেউ ভাঁড় ও জলদস্যুর পোশাকে সেজেছিলেন।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তুলুজ শহরে হাজার হাজার তরুণ একটি অনুমতিহীন মিছিলে অংশ নিতে সমবেত হন, যাদের মধ্যে কেউ কেউ হ্যালোইনের পোশাক পরা ছিলেন এবং ফরাসি পতাকা বহন করছিলেন।
বিক্ষোভকারীরা হাততালি দিয়ে গান গাইতে থাকেন। সেখানে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর প্রতি ইঙ্গিত করে একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল: ‘মানু (ম্যাক্রোঁ), তুমি আমার ফ্রান্সকে ধ্বংস করেছো।’
নতুন করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অবরুদ্ধের হুমকি
শিক্ষার্থী বিক্ষোভকারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, পুলিশ ফরাসি রাজধানীর কেন্দ্রের মধ্য দিয়ে পদযাত্রার অনুমতি দেয়নি। এর প্রতিবাদে আগামী সপ্তাহে তারা নতুন করে উচ্চবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অবরুদ্ধ করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
`ইউনিয়ন এতুদিয়ঁতে` ট্রেড ইউনিয়নের মুখপাত্র সাবরিন খারবাচ বলেন, ‘আগামী মঙ্গলবার থেকে আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চবিদ্যালয়গুলো বন্ধ রাখব এবং বৃহস্পতিবারও তা অব্যাহত রাখব; যা ৫ নভেম্বরের শ্রমিক ও ট্রেড ইউনিয়নগুলোর ডাকা সাধারণ ধর্মঘটের পূর্বপ্রস্তুতি।’
বিক্ষোভের আশঙ্কায় কিছু দোকানদার তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কাঠ বা বোর্ড দিয়ে ঢেকে সুরক্ষিত করেন।
প্যারিসের পূর্বাঞ্চলে ওয়ায়েল বুবাকের নামের এক ক্যাফে কর্মী কাঠের প্যানেল দিয়ে দোকানের সামনের অংশ ঢেকে দেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে বুবাকের বলেন, ‘সবাই ঘরে অবস্থান করছে। কেউ কেনাকাটা করতে বাইরে আসবে না।’
ম্যাক্রোঁ সরকারের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান স্বৈরাচারী মনোভাব গ্রহণের অভিযোগ এনে প্যারিসের এই বিক্ষোভে যোগ দেন উগ্র-বামপন্থী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জাঁ-লুক মেলঁশঁ। সামাজিক মাধ্যম `এক্স`-এ তিনি লেখেন, ‘একটি স্বাধীন জাতির মৌলিক অধিকার যেন অক্ষুণ্ন থাকে, তা নিশ্চিত করতে আমরা আমাদের সুদৃঢ়, শান্ত এবং সুশৃঙ্খল অঙ্গীকার তুলে ধরব।’
`উদ্বেগ ও অস্থিরতা`
ইউরো অঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফ্রান্সের অর্থনীতি এখন মন্দার দ্বারপ্রান্তে এবং রাষ্ট্রীয় ঋণ কমানোর প্রচণ্ড চাপে রয়েছে; ফলে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের শান্ত করার খুব বেশি সুযোগ সরকারের হাতে নেই।
পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকারি কর্তৃপক্ষের মধ্যে ব্যাপক ‘অস্থিরতা ও উদ্বেগ’ কাজ করছে।
ফ্রান্সের চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট অ্যালাঁ দি ক্রিসেনজো জানিয়েছেন, ব্যবসাহীরা বেশ চিন্তিত। ফ্রান্স ইন্টার ব্রডকাস্টারকে দি ক্রিসেনজো বলেন, ‘দোকানদাররা অধীর আগ্রহে শনিবারের দিনটি শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছেন।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শনিবার সন্ধ্যায় হ্যালোইনকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভকারীদের এক জায়গায় জড়ো হয়ে এক ‘বিপ্লব’ গড়ে তোলার আহ্বানের বিষয়টি তারা চিহ্নিত করতে পেরেছেন।সংগৃহীত ছবি

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :