ডেইলি খবর ডেস্ক:রাতে রাজধানীর একটি ফাঁকা মোড়। ট্রাফিক সংকেতে লাল বাতি জ্বলছে। ট্রাফিক পুলিশ নেই দেখে ওই সংকেত অমান্য করে গাড়ি নিয়ে মোড় পার হলেই মামলা থেকে আর নিস্তার নেই। সকাল হওয়ার আগেই গাড়ির মালিকের মোবাইলে চলে যাবে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের মামলা। এ ছাড়া ফুটপাতে মোটরসাইকেল চালানো, যেখানে-সেখানে পার্কিং, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে নির্ধারিত সর্বোচ্চ গতিসীমার চেয়ে বেশি গতিতে যান চালালেও মামলা হয়ে যাবে।
মামলার কাগজ বাড়িতে পৌঁছে যাবে কয়েক দিনের মধ্যে। এমন মামলায় জরিমানা গুনতে হবে সর্বনিম্ন ৫-১০ হাজার টাকা। ট্রাফিক আইন ভঙ্গের এসব ঘটনা ধরছে রাজধানীর সড়কে স্থাপন করা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির সিসি ক্যামেরা। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন যৌথভাবে নগরের ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এমন ক্যামেরা বসিয়েছে। ১ মে থেকে এসব ক্যামেরার কার্যক্রম শুরু হলেও মামলা করা শুরু হয়েছে গত বুধবার রাত থেকে।
ট্রাফিক আইন ভঙ্গের জরিমানা এড়িয়ে গেলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা থাকছে। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ ও ২০১৯ অনুযায়ী এসব মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করবে ট্রাফিক পুলিশ।
রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সম্প্রতি ডিএমপির ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। নিয়মিত ট্রাফিক মামলার পাশাপাশি এখন সিসিটিভি ক্যামেরা, ভিডিও ফুটেজ এবং এআই প্রযুক্তির সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করে মামলা দেওয়া হচ্ছে। সড়কে অনিয়ম করলে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা অনেক ক্ষেত্রে চালকের সঙ্গে তর্কে জড়াচ্ছেন না। মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করছেন অথবা সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করছেন। পরে ‘ই-ট্রাফিক প্রসিকিউশন সফটওয়্যার’-এর মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিকের ঠিকানায় নোটিশ পাঠানো হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগে হাজির হয়ে মামলা নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
১ মে থেকে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে চালু হয়েছে ‘এআই বেজড রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট ভায়োলেশন ডিটেকশন সিস্টেম’। শাহবাগ, বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটরসহ অন্তত ২৫টি মোড়ে আধুনিক সংকেত বাতি ও এআই প্রযুক্তির ক্যামেরা বসানো হয়েছে। সংকেত অমান্য করলেই ওই ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ির নম্বর শনাক্ত করে মামলা তৈরি করছে।সেই তথ্য সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোবাইল নম্বরে বার্তা হিসেবে পৌঁছে যাচ্ছে।এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে বসানো হয়েছে গতি পরিমাপক বিশেষ ক্যামেরা। নির্ধারিত গতিসীমার বেশি গতিতে গাড়ি চালালেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলার তথ্য সংরক্ষণ হচ্ছে।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সড়কে শৃঙ্খলা ভেঙে আর কেউ যানবাহন চালাতে পারবে না। যাঁদের কাগজপত্র ঠিক নেই, তাঁরাও মামলায় পড়বেন। এসব উদ্যোগের সুফল হিসেবে রাজধানীতে যানবাহনের গড় গতি এখন ঘণ্টায় প্রায় ১০ কিলোমিটারে উন্নীত হয়েছে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত তা ছিল প্রায় ৫ কিলোমিটার।জানতে চাইলে ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেন, ‘ঢাকা শহরের যানজট সহনীয় রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নিয়মিত মামলার পাশাপাশি ডিজিটাল ও ভিডিও মামলা দেওয়া হচ্ছে। আমরা এআইভিত্তিক রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট ভায়োলেশন ডিটেকশন সিস্টেম চালু করেছি। ইতিমধ্যে শহরের অনেক স্থানে এর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর সুফল হিসেবে সড়কে গাড়ির গতি বেড়েছে।’
মাঠপর্যায়ের ট্রাফিক সার্জেন্টরা বলছেন, আগে ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের থামিয়ে কাগজপত্র যাচাই, মামলা ও জরিমানার পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অনেক সময় লাগত। এতে অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হতো। অন্যদিকে রাজধানীতে যানবাহনের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়লেও সেই তুলনায় ট্রাফিক পুলিশের জনবল কম। ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে আইন প্রয়োগ কঠিন হয়ে উঠেছিল। এই বাস্তবতায় এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল নজরদারির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ডিএমপি ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে ২৫টি মোড়ে নতুন ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও বাড়ানো হবে।
এই এআই ক্যামেরা লাল বাতি অমান্য, জেব্রা ক্রসিং দখল, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, সিটবেল্ট ছাড়া গাড়ি চালানো, চালকের মোবাইল ফোন ব্যবহার এবং অনুমতি ছাড়া ভিআইপি লাইট ব্যবহারের মতো অপরাধ ধরবে। গাড়ির মেয়াদোত্তীর্ণ কাগজপত্রও এআই ক্যামেরা বিআরটিএর ডেটাবেইস থেকে শনাক্ত করবে।ট্রাফিক পুলিশের মাঠের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীতে এলোমেলো ও অবৈধ পার্কিংয়ের বিরুদ্ধেও বিশেষ নজরদারি শুরু হয়েছে। সড়কের পাশে অবৈধভাবে দাঁড়ানো গাড়ির ভিডিও করে ট্রাফিক বিভাগে পাঠানো হচ্ছে। পরে তা বিশ্লেষণ করে মামলা করা হচ্ছে। ১০-১২ দিনের মধ্যে সেই মামলার কাগজ গাড়ির রেজিস্ট্রেশনে দেওয়া ঠিকানায় পৌঁছে যাচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে মামলা নিষ্পত্তি না করলে সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারের একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে চাকরিরত আশিকুর রহমান তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, ‘এপ্রিলের মাঝামাঝি একদিন অফিস থেকে নেমে সড়কের পাশে মোটরসাইকেল রেখে বাজার করেছিলাম। পরে শুনি ট্রাফিক পুলিশ ভিডিও করেছে। তখন গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু কয়েক দিন পর বাসায় পাঁচ হাজার টাকার মামলার কাগজ আসে। পরে জরিমানা দিয়ে মামলা নিষ্পত্তি করেছি।’এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালিয়ে মামলায় পড়েছেন মহিউদ্দিন আহমেদ নামের এক চালক। তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকের গাড়ি চালান। তিনি বলেন, ‘না বুঝেই বেশি গতি দিয়েছিলাম। এখন সতর্ক থাকি। অন্যদেরও সতর্ক করি।’
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সূত্র জানায়, গত তিন মাসে শুধু ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রায় ১২ হাজার মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার, মার্চে ৪ হাজার ৩২১ এবং এপ্রিলে প্রায় পাঁচ হাজার মামলা হয়েছে। একই সময়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে অতিরিক্ত গতির কারণে তিন হাজারের বেশি মামলা হয়েছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান বলেন, শুরুতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে দিনে ৩০০টির বেশি গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা হতো। চালকেরা সচেতন হওয়ায় এখন কমে ৩০টির মতো হচ্ছে।ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ৩০০ ফিট এক্সপ্রেসওয়ে এবং বনানী থেকে টঙ্গী সড়কেও গতি পরিমাপক ক্যামেরা বসানোর প্রস্তুতি চলছে।
এদিকে প্রযুক্তিনির্ভর মামলার প্রক্রিয়া চালুর পর একটি প্রতারক চক্র এর সুযোগ নিচ্ছে। ট্রাফিক মামলার নামে ফোন করে টাকা দাবি করার অভিযোগ পেয়েছে পুলিশ। এ বিষয়ে ডিএমপি সতর্ক করে বলেছে, ট্রাফিক মামলা-সংক্রান্ত কোনো অর্থ কখনো ব্যক্তিগতভাবে কাউকে দেওয়া যাবে না। নির্ধারিত সরকারি পদ্ধতিতেই জরিমানা পরিশোধ করতে হবে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, রোড ট্রান্সপোর্ট আইন ভায়োলেশন ডিটেকশন সিস্টেমের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে দ্রুত ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, দুর্ঘটনা কমানো এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।সংগৃহীত

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :