ডেইলি খযর ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিয়েছে ঢাকা। গতকাল রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে ভারতের কাছে দুটি বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ চাওয়ার কথা স্পষ্ট হয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনা চলছে বলেও জানায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরের দিন-তারিখ ঠিক হয়নি। যেহেতু দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে, তাই বলা চলে, এটা এখন দরকষাকষির পর্যায়ে আছে। ঢাকার চাওয়া ও দিল্লির পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর সফরের সময় নির্ভর করছে বলে মনে করছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
ঢাকার চাওয়া দুটি বিষয় এখন স্পষ্ট। এক. সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা। দুই. ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা।
গতকাল দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম ব্রিফিংয়ে সরকারের এ অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে দুই দেশের কর্মকর্তারা কয়েক সপ্তাহ ধরে যোগাযোগ করছিলেন। তবে গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্য সেই পরিবেশকে নষ্ট করেছে।
মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা মনে করি, এই সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা দরকার। এ জন্য দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনা ও অন্যান্য পলাতক অপরাধীর প্রত্যর্পণের অনুরোধ ত্বরান্বিত করা এবং হাদি হত্যা মামলার আসামিদের দ্রুত হস্তান্তরের অনুরোধ করা হয়েছে ভারতকে। এখন দিল্লির জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, তারেক রহমানের সফরকে শুধু আনুষ্ঠানিক সফর হিসেবে দেখছে না ঢাকা। সফরের আগে দুই দেশের সম্পর্কে জমে থাকা কিছু স্পর্শকাতর বিষয়েও দৃশ্যমান অগ্রগতি চাইছে। ফলে সফরের তারিখ নির্ধারণের পাশাপাশি এখন মূল আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে– ভারত এই দুই বিষয়ে কতটা সাড়া দেবে।
ইতোমধ্যে দুই পক্ষের সূত্র থেকে হাদি হত্যা মামলার আসামিদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর বিষয়ে ভারতের ইতিবাচক মনোভাবের তথ্য জোরালো হয়েছে। তবে ভারত চায়, হস্তান্তর, বিচার– সব যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে হোক।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে বড় পরিবর্তন আসে। ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান, সীমান্ত ও রাজনৈতিক নানা ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে ভারতীয় ভিসা কার্যক্রমও ব্যাপকভাবে সীমিত হয়ে যায়। ফলে সাধারণ মানুষের চলাচল থেকে শুরু করে রাজনৈতিক পর্যায়ের যোগাযোগেও এর প্রভাব পড়ে। পরে তারেক রহমানের সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেসব বিধিনিষেধ উঠিয়ে নেওয়া হয়।
এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ভারত দিয়ে না হওয়াও কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তবে জুনে প্রথম বিদেশ সফরে তারেক রহমান মালয়েশিয়া যান। এরপর তিনি চীন সফর করেন।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, মালয়েশিয়া ও চীন সফরের পেছনে ঢাকার নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কারণ ছিল। মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে শ্রমবাজার ও অভিবাসন গুরুত্বপূর্ণ ছিল। চীনের সঙ্গে বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাও ছিল সফরের বড় বিষয়। তাই এসব সফরকে সরাসরি ভারতবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম বিদেশ সফর ভারত দিয়ে না করে ঢাকা এটাও বুঝিয়েছে– নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে একক কোনো দেশের ওপর নির্ভরতার জায়গা থাকছে না।
এরপর আসে দিল্লির আরেকটি আমন্ত্রণ। সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এর আগে তাঁকে আলাদা দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছিল। ফলে দিল্লি সফরের দুটি সম্ভাব্য পথ তৈরি হয়। একটি রাষ্ট্রীয় দ্বিপক্ষীয় সফর, অন্যটি ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক।
কিন্তু গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্য সেই প্রক্রিয়ায় নতুন চাপ তৈরি করে। ঢাকা এর প্রতিবাদ জানায়। এরপর দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ে। ১০ আগস্ট ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এর আগের দিন তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গেও বৈঠক করেন। এসব আলোচনায় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহের পাশাপাশি ঢাকার পক্ষ থেকে ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
এরপর দীনেশ ত্রিবেদী দিল্লি যান। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, ঢাকার বার্তা তিনি ভারতের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে দেন। দিল্লি থেকে ফিরে আসার পর দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে আবারও আশাবাদ তৈরি হয়। এর মধ্যেই তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফরের তারিখ হিসেবে গণমাধ্যমে ২০ আগস্টের পরে সময় সামনে আসে। ফলে চলতি মাসেই সফর হতে পারে, এমন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। গতকালের ঢাকার বক্তব্যে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও হাদি হত্যা মামলার আসামিদের হস্তান্তর বিষয়টি সরাসরি ‘অনুকূল পরিবেশ’-এর সঙ্গে যুক্ত করল বাংলাদেশ।
কূটনৈতিকরা বলছেন, এখানেই বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি রয়েছে। ঢাকা সফরের দরজা বন্ধ করেনি; সফরের জন্য দিল্লির কাছে কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপও চাইছে। অর্থাৎ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আলোচনা চলছে। কিন্তু সেই আলোচনায় নিজের অবস্থান ধরে রাখতে চাইছে বাংলাদেশ।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমানের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে যে ধারণা তৈরি হয়েছিল, ঢাকার বর্তমান অবস্থান তার চেয়ে অনেক কঠোর। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নির্মাণের ক্ষেত্রে দরকষাকষির পথ বেছে নিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে অনেক বিষয় আলোচনার টেবিলে রয়েছে। এক বিষয়ে মতবিরোধ থাকলেও অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া দরকার। আলাপ-আলোচনা ছাড়া কূটনীতিতে সমস্যার সমাধান করা খুবই কঠিন বলে মন্তব্য করেন এ কূটনীতিক।
ভারতীয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক শ্রীরাধা দত্তও বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। তিনি সমকালকে বলেন, সাম্প্রতিক আলোচনায় মনে হচ্ছিল, তারেক রহমানের সফরের পথ তৈরি হচ্ছে। হঠাৎ ঢাকার পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য কেন এলো– তা স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশের শেখ হাসিনাকে নিয়ে আপত্তি আছে– এটি বোঝা যায়। তবে এ ধরনের সমস্যা সমাধানে দুই দেশের নেতৃত্বের মধ্যে আলোচনা প্রয়োজন।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ বিষয়ে দিল্লি এখনও সরাসরি কিছু বলেনি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল গত শুক্রবার বলেন, বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কোনো অগ্রগতি হলে জানানো হবে।
তবে গতকাল ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বা কূটনৈতিকভাবে নেওয়া হবে না। বাংলাদেশের অভিযোগগুলো ভারতের আইনেও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত কিনা– আইনি প্রক্রিয়ায় সেটি যাচাই করা হবে। সে দেশের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এ তথ্য জানিয়েছে।
২০১৩ সালের ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি সম্পন্ন হয়। চুক্তিতে দণ্ডিত বা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ফেরত দেওয়ার বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রকৃতির অপরাধের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমের ব্যবস্থাও আছে। আবার খুন, মানুষ হত্যা ও হামলার মতো কয়েকটি অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করার কথাও চুক্তিতে বলা হয়েছে।
ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে একটি বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে। ঢাকা দ্রুত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অগ্রগতি চায়। দিল্লি বিষয়টিকে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেখার কথা বলছে।
হাদি হত্যা মামলার আসামিদের বিষয়েও একইভাবে সক্রিয় বাংলাদেশ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভারতে অবস্থানরত তিন আসামিকে ফেরত আনার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদও রয়েছেন। ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলায় প্রত্যর্পণে সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।
জ্বালানি সংকট ও অন্যান্য
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এসব বিষয়ে আলোচনা চললেও দুই দেশের সম্পর্কের পুরো এজেন্ডা শেখ হাসিনা ইস্যুতে আটকে নেই। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, ভিসা, যোগাযোগ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও রয়েছে। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ এ বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। ফলে এর নবায়ন নিয়েও দ্রুত আলোচনা প্রয়োজন।
চলমান জ্বালানি সংকটের সময়ে ভারত থেকে বাড়তি ডিজেল পাওয়ার বিষয়টিও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি ভারত জানিয়েছে, বিদ্যমান বোঝাপড়ার আওতায় বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহ করা হয়। বাড়তি চাহিদার বিষয়টি নিজেদের প্রয়োজন, শোধনাগারের সক্ষমতা ও সরবরাহ পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেখা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব স্বার্থের কারণে দুই দেশের সম্পর্ককে দীর্ঘদিন অচল রাখা কারও জন্যই লাভজনক নয়। আবার শেখ হাসিনা ইস্যু বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের জন্য রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে দুই পক্ষকেই নিজেদের অবস্থান সামলে এগোতে হবে।
গতকালের বক্তব্যে ঢাকা সেই কৌশলই নিয়েছে বলে মনে করছে কূটনৈতিক সূত্রগুলো। সফরের সম্ভাবনা নাকচ না করে দিল্লির কাছে কিছু পদক্ষেপ চাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ভারতও আমন্ত্রণ প্রত্যাহার করেনি। ফলে আলোচনার পথ খোলা আছে।
কূটনীতিকদের মতে, এ অবস্থায় তারেক রহমানের দিল্লি সফর এখন শুধু একটি বিদেশ সফরের বিষয় নয়। নতুন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কোন ভিত্তিতে দাঁড়াবে, তারও একটি পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। ঢাকার বর্তমান অবস্থান হলো, সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে। তবে তা হতে হবে সার্বভৌম সমতা, জাতীয় মর্যাদা, পারস্পরিক সংবেদনশীলতা ও স্বার্থের ভিত্তিতে।
দুই পক্ষই এখন নিজেদের দরকষাকষির অবস্থানে রয়েছে। ঢাকা চাইছে সফরের আগে দিল্লি কিছু বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাক। ভারত চাইছে সংবেদনশীল বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে সামলে নিয়ে বৃহত্তর সম্পর্ক এগিয়ে নিতে।সংগৃহীত

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :