মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই, ২০২৬, ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩

গণতন্ত্রের শক্তি বিভাজনে নয়, সহাবস্থানে: ঐক্যের রাজনীতি বদলে দিতে পারে বাংলাদেশ?

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ৭, ২০২৬, ০৫:৪০ পিএম

গণতন্ত্রের শক্তি বিভাজনে নয়, সহাবস্থানে: ঐক্যের রাজনীতি বদলে দিতে পারে বাংলাদেশ?

বিশেষ প্রতিনিধি: বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন, ক্ষমতার পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে প্রতিটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের শেষে একটি প্রশ্ন আবারও সামনে আসে রাষ্ট্র কি বিভাজনের পথে এগোবে, নাকি জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে নতুন যাত্রা শুরু করবে? বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই প্রশ্নটি আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের শোক ও বিজয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিশোধের পরিবর্তে ঐক্যের রাজনীতির আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরও তিনি বিভিন্ন সময় একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও সংলাপ, সহনশীলতা এবং সহযোগিতার যে প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি তুলে ধরেছেন, তা নিঃসন্দেহে আলোচনার দাবি রাখে।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতিকে গতিশীল করা, বিনিয়োগের আস্থা ফিরিয়ে আনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং জনগণের জীবনযাত্রার চাপ কমানো। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য কেবল সরকারের একক প্রচেষ্টায় অর্জন করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বৃহত্তর জাতীয় ঐকমত্য।

গণতন্ত্রের শক্তি বহুমত। ভিন্নমত থাকবে, সমালোচনা থাকবে, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধও থাকবে। কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থ—অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা কিংবা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশ্নে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর অভিজ্ঞতাও সেটিই বলে।

গত পনেরো বছরের দুর্নীতি, লুটপাট এবং একদলীয় শাসনের ফলে দেশের অবস্থা এমনিতেই বেহাল ছিল। ২০২৪ এর পাঁচ আগস্টের পর ডঃ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্র্বতী সরকারের দেড় বছরের শাসন দেশকে আরো গভীর সংকটে ঠেলে দিয়েছে। ইউনুস সরকারের অর্থনীতি বিনাশী তৎপরতার কারণে বেসরকারি খাত আজ মুখ থুবডে পড়েছে। হাজার হাজার কলকারখানা বন্ধ। নতুন বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উর্ধগতি এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির চাপে মানুষ দিশেহারা।

ইউনুস আমলে সংক্রামিত মহামারী মব সন্ত্রাস পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এখনও। ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধ এখনও জনজীবনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইউনুস সরকারের অপশাসনের ক্ষত। এই ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে উদ্ধার করতে হলে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। সরকারের একার পক্ষে এইসব সমস্যার চটজলদি সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।

২৪ এর গনঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল, ঐক্যের বাংলাদেশ। বিভক্তি, হানাহানি, বৈষম্য এবং প্রতিহিংসার শেকল ভেঙে বাংলাদেশকে মুক্ত স্বাধীনভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই রাজপথে নেমে এসেছিল আপামর জনতা। সকলেই আশা করেছিল, আওয়ামীলীগের পতনের পর, দেশে মন খুলে কথা বলা যাবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে, ভিন্নমতের কারণে কেউ নিগৃহীত হবে না। মানুষের উপর জুলুম নির্যাতন বন্ধ হবে। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে। অন্তর্র্বতী সরকারের সামনে দেশকে এক সুতোয় গাঁথার মহা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু ইউনুস সরকার ঐক্যের বদলে বিভাজন বাড়িয়ে দেয়। নতুন করে শুরু হয় দুর্নীতি এবং লুটপাট। একটি নব্য লুটেরা ফ্যাসিস্ট শক্তির জন্ম দেন ডঃ ইউনূস। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে আবার দেশকে সঠিক পথে নিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এজন্য দরকার সকলের সহযোগিতা এবং দায়িত্বশীল আচরণ।

১৯৭৫ এর পর বাংলাদেশ হয়ে পড়েছিল বিভক্ত। দেশে সৃষ্টি হয়েছিল ভয়াবহ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ অস্তিত্বের সংকটে পড়েছিল। সেই সময় কান্ডারী হয়ে দেশের হাল ধরেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।

শহীদ জিয়া, দিশেহারা, বিভ্রান্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেন। বহুদলীয় গণতন্ত্রের মাধ্যমে তিনি সকল মতকে সম্মান দেখানোর বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সূচনা করেন। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির শৃঙ্খল থেকে মুক্ত বাজার অর্থনীতি চালু করে দুর্ভিক্ষ পীড়িত একটি দেশকে নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুচনা করেন। বহুদলীয় গণতন্ত্র, বেসরকারি খাতের জন্য পথ তৈরি, দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন চিরকাল।

মাত্র তিন বছরের মধ্যে জিয়াউর রহমান হতাশাগ্রস্ত, দিশেহারা একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এগিয়ে চলার পথ দেখিয়েছেন। জিয়াউর রহমান দেখিয়েছেন ঐক্যেই বাংলাদেশের সাফল্যের চাবিকাঠি।

শহীদ জিয়ার মৃত্যুর পর বাংলাদেশ আবার পথ হারায়। আবারও শুরু হয় দুর্নীতি লুটপাটের রাজনীতি। এরশাদ ক্ষমতা দখল করে আবারও দেশের জনগণকে করেন অধিকারহীন। দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশ হয়ে যায়, বিদেশি ঋণ নির্ভর। দাতাদের শর্তের জালে আটকা পড়ে বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য এগিয়ে আসে জিয়া পরিবার। বেগম খালেদা জিয়া গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে আসেন শুধু দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য। দেশ বাঁচাতে তিনি চরম ত্যাগ স্বীকার করেন। বেগম জিয়ার নেতৃত্বে দীর্ঘ নয় বছরের আন্দোলনের পর বাংলাদেশ স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত হয়।

বেগম খালেদা জিয়া, ১৯৯১ এর নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেশ পরিচালনা করেননি। বরং দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার নীতি গ্রহণ করেন। যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। বিএনপি দলীয়ভাবে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতিতে বিশ্বাসী ছিল। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলে বেগম জিয়া যে বিপুল ভোটে বিজয়ী হতেন তা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না। কিন্তু তিনি দেশের স্বার্থে, জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে, বিরোধীদলের দাবির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার বিল সংসদে উত্থাপন করেন।বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং ভিন্নমতের লালনের এটি একটি অনন্য উদাহরণ।

২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে বেগম খালেদা জিয়া এককভাবে বিএনপির সরকার গঠন করেননি। জোটসংগী জামায়াতকেও মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভুক্ত করে গনতন্ত্রের এক মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। ২০০৭ সালে এক এগারোর মাধ্যমে গনতন্ত্র বিরোধী অপশক্তি ক্ষমতা দখল করে। জাতির এই চরম সংকটে বেগম জিয়া গনতন্ত্রের ডাক দিয়েছিলেন। তিনি সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দীন সরকারের প্রলোভনের ফাঁদে পা দেননি। এজন্য জিয়া পরিবারকে চরম নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। বেগম জিয়া, তার বড় ছেলে, আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বেগম জিয়ার ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোকে মিথ্যা অভিযোগে গ্রেফতার করে অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। কিন্তু তারপরও আপোষ করেননি বেগম জিয়া।

২০০৮ এর সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানো হয়। আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এসে জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করতে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করে। এর প্রতিবাদে আবারও রাজপথে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলেন বেগম খালেদা জিয়া। ২০১৪ সালে বেগম জিয়া যে একদফা আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন তারই চুড়ান্ত পরিণতি ২০২৪ এর পাঁচ আগস্টের গনঅভ্যুত্থান। ১৭ বছর দেশের জন্য,জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করেছে জিয়া পরিবার। বেগম জিয়াকে বিনা অপরাধে নির্জন কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছিল বছরের পর বছর। তারেক রহমান নির্বাসিত ছিলেন। স্বৈরশাসনের জুলুম নির্যাতনে মারা যান আরাফাত রহমান কোকো। তবুও আপোষহীন ছিলেন বেগম জিয়া। আপোষ করেনি জিয়া পরিবার।

২৪ এর পাঁচ আগস্টের পর ইউনুস সরকার যখন জনগণের অধিকার হরণ করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার ষড়যন্ত্র শুরু করে, তখন তারেক রহমান দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন। বস্তুত, তারেক রহমানের রাজনৈতিক বিচক্ষণতা এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই শেষ পর্যন্ত ইউনুস সরকার নির্বাচন দিতে বাধ্য হন। আর তাই নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানান দেশবাসী। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয় শুধু বিএনপির বিজয় নয়, ঐক্যের পক্ষে জনরায়। শান্তি এবং সংহতির পক্ষে জনমত।

বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো, দেশ যখনই পথ হারিয়েছে, যখনই জাতি বিভক্তির চোরাগলিতে আটকে গেছে, তখনই জিয়া পরিবার জাতির ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। দেশ বাঁচাতে ঐক্যবদ্ধ করেছে দেশের মানুষকে।

এই ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের "আমি সবার প্রধানমন্ত্রী"—এই বক্তব্যও তাৎপর্যপূর্ণ। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচিত সরকার কেবল সমর্থকদের নয়, পুরো দেশের প্রতিনিধিত্ব করে। রাজনৈতিক দর্শনের পার্থক্য থাকলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় অন্তর্ভুক্তিমূলক মনোভাব গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।

তবে জাতীয় ঐক্যের দায়িত্ব কেবল সরকারের ওপর বর্তায় না। বিরোধী দলেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে। সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা অবশ্যই হবে, কিন্তু সেই সমালোচনার প্রধান ক্ষেত্র হওয়া উচিত জাতীয় সংসদ। সংসদ কার্যকর হলে রাজনীতিতে সংলাপের সংস্কৃতি শক্তিশালী হয়, আর রাজপথনির্ভর সংঘাতের প্রয়োজনও কমে আসে। গণতন্ত্রে জবাবদিহির সর্বোত্তম মঞ্চ সংসদই।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভাজন যেমন রয়েছে, তেমনি সংকট অতিক্রমে ঐক্যের নজিরও রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করার সংস্কৃতি কোনো গণতন্ত্রকেই শক্তিশালী করে না। মতের ভিন্নতা গণতন্ত্রের প্রাণ, আর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তার ভিত্তি।

রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সহনশীলতা এবং দায়িত্বশীলতার ওপর। ক্ষমতার পালাবদল গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া; কিন্তু রাষ্ট্রের ধারাবাহিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন জাতীয় স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া। বিভক্ত সমাজ কখনো দীর্ঘমেয়াদে এগোতে পারে না। তাই আজকের বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হতে পারে—প্রতিযোগিতা থাকুক, বিভাজন নয়; মতভেদ থাকুক, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রশ্নে থাকুক জাতীয় ঐক্য।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত শনিবার জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের শোক ও বিজয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে জুলাই জাতীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির ভাষণে বলেন, “প্রতিশোধ নয়, ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।”

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই প্রথম নয়, গত প্রায় পাঁচ মাসে একাধিকবার সংসদে এবং সংসদের বাইরে তারেক রহমান দেশ পুনর্গঠনে ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য স্রেফ কথার কথা নয়, তিনি এই স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশের রাজনীতিতে একটি ঐক্যের আবহ সৃষ্টির চেষ্টা করে চলেছেন। জাতীয় সংসদে সরকারিদল এবং বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধ ভাবে যেন দেশ পরিচালনা করতে পারে সেজন্য সংসদ নেতা হিসেবে তারেক রহমানের একাধিক পদক্ষেপ সকলের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যেভাবে আন্তরিকতার সাথে ঐক্যের বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য হাত বাড়িয়েছেন সেভাবে কি সাড়া দিচ্ছেন সকলে?

একটি অবাধ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে বহুল কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ এখন ক্ষতবিক্ষত। ধ্বংসের কিনারে দাঁড়িয়ে। বিগত পনেরো বছরের  দুর্নীতি, লুটপাট এবং একদলীয় শাসনের ফলে দেশের অবস্থা এমনিতেই বেহাল ছিল। ২০২৪ এর পাঁচ আগস্টের পর ডঃ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্র্বতী সরকারের দেড় বছরের শাসন দেশকে আরো গভীর সংকটে ঠেলে দিয়েছে। দেশের অর্থনীতি আজ বিপর্যস্ত। বেকারত্ব বেড়েছে উদ্বেগজনক ভাবে। ইউনুস সরকারের অর্থনীতি বিনাশী তৎপরতার কারণে বেসরকারি খাত আজ মুখ থুবডে পড়েছে। হাজার হাজার কলকারখানা বন্ধ। নতুন বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উর্ধগতি এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির চাপে মানুষ দিশেহারা।

সামাজিক জীবনে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ইউনুস আমলে সংক্রামিত মহামারী মব সন্ত্রাস পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এখনও। ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধ এখনও জনজীবনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। শিক্ষা, স্বাস্হ্য সহ দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইউনুস সরকারের অপশাসনের ক্ষত। এই ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে উদ্ধার করতে হলে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। সরকারের একার পক্ষে এইসব সমস্যার চটজলদি সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।

২৪ এর গনঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল, ঐক্যের বাংলাদেশ। বিভক্তি, হানাহানি, বৈষম্য এবং প্রতিহিংসার শেকল ভেঙ্গে বাংলাদেশকে মুক্ত স্বাধীনভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই রাজপথে নেমে এসেছিল আপামর জনতা। সকলেই আশা করেছিল, আওয়ামীলীগের পতনের পর, দেশে মন খুলে কথা বলা যাবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে, ভিন্নমতের কারণে কেউ নিগৃহীত হবে না। মানুষের উপর জুলুম নির্যাতন বন্ধ হবে। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে। অন্তর্র্বতী সরকারের সামনে দেশকে এক সুতোয় গাঁথার মহা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু ইউনুস সরকার ঐক্যের বদলে বিভাজন বাড়িয়ে দেয়। নতুন করে শুরু হয় দুর্নীতি এবং লুটপাট। একটি নব্য লুটেরা ফ্যাসিস্ট শক্তির জন্ম দেন ডঃ ইউনূস। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে আবার দেশকে সঠিক পথে নিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এজন্য দরকার সকলের সহযোগিতা এবং দায়িত্বশীল আচরণ।

বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো, দেশ যখনই পথ হারিয়েছে, যখনই জাতি বিভক্তির চোরাগলিতে আটকে গেছে, তখনই জিয়া পরিবার জাতির ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। দেশ বাঁচাতে ঐক্যবদ্ধ করেছে দেশের মানুষকে।

১৯৭৫ এর পর বাংলাদেশ হয়ে পড়েছিল বিভক্ত। দেশে সৃষ্টি হয়েছিল ভয়াবহ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ অস্তিত্বের সংকটে পড়েছিল। সেই সময় কান্ডারী হয়ে দেশের হাল ধরেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। শহীদ জিয়া, দিশেহারা, বিভ্রান্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেন। বহুদলীয় গণতন্ত্রের মাধ্যমে তিনি সকল মতকে সম্মান দেখানোর বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সূচনা করেন। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির শৃঙ্খল থেকে মুক্ত বাজার অর্থনীতি চালু করে দুর্ভিক্ষ পীড়িত একটি দেশকে নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুচনা করেন। বহুদলীয় গণতন্ত্র, বেসরকারি খাতের জন্য পথ তৈরি, দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন চিরকাল। বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রার তিনিই রুপকার। তিনি প্রথম বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছিলেন। তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত একটি দেশকে বিশ্বের দরবারে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য, সকলের সাথে বন্ধুত্ব কারও সাথে বৈরিতা নয়- এর দার্শনিক ভিত্তির জনক ছিলেন শহীদ জিয়া। মাত্র তিন বছরের মধ্যে জিয়াউর রহমান হতাশাগ্রস্ত, দিশেহারা একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এগিয়ে চলার পথ দেখিয়েছেন। জিয়াউর রহমান দেখিয়েছেন ঐক্যেই বাংলাদেশের সাফল্যের চাবিকাঠি।

শহীদ জিয়ার মৃত্যুর পর বাংলাদেশ আবার পথ হারায়। আবারও শুরু হয় দুর্নীতি লুটপাটের রাজনীতি। এরশাদ ক্ষমতা দখল করে আবারও দেশের জনগণকে করেন অধিকারহীন। দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশ হয়ে যায়, বিদেশি ঋণ নির্ভর। দাতাদের শর্তের জালে আটকা পড়ে বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য এগিয়ে আসে জিয়া পরিবার। বেগম খালেদা জিয়া গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে আসেন শুধু দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য। দেশ বাঁচাতে তিনি চরম ত্যাগ স্বীকার করেন। বেগম জিয়ার নেতৃত্বে দীর্ঘ নয় বছরের আন্দোলনের পর বাংলাদেশ স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত হয়। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিপুলভাবে জয়ী হয় বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি।শুরু হয় গনতন্ত্রের নতুন অভিযাত্রা। বেগম খালেদা জিয়া, ১৯৯১ এর নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেশ পরিচালনা করেননি। বরং দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার নীতি গ্রহণ করেন। যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। বিএনপি দলীয়ভাবে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতিতে বিশ্বাসী ছিল। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলে বেগম জিয়া যে বিপুল ভোটে বিজয়ী হতেন তা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না। কিন্তু তিনি দেশের স্বার্থে, জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে, বিরোধীদলের দাবির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার বিল সংসদে উত্থাপন করেন।বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং ভিন্নমতের লালনের এটি একটি অনন্য উদাহরণ।

২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে বেগম খালেদা জিয়া এককভাবে বিএনপির সরকার গঠন করেননি। জোটসংগী জামায়াতকেও মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভুক্ত করে গনতন্ত্রের এক মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

২০০৭ সালে এক এগারোর মাধ্যমে গনতন্ত্র বিরোধী অপশক্তি ক্ষমতা দখল করে। জাতির এই চরম সংকটে বেগম জিয়া গনতন্ত্রের ডাক দিয়েছিলেন। তিনি সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দীন সরকারের প্রলোভনের ফাঁদে পা দেননি।এজন্য জিয়া পরিবারকে চরম নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। বেগম জিয়া, তার বড় ছেলে, আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বেগম জিয়ার ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোকে মিথ্যা অভিযোগে গ্রেফতার করে অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। কিন্তু তারপরও আপোষ করেননি বেগম জিয়া।

২০০৮ এর সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানো হয়। আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এসে জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করতে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করে। এর প্রতিবাদে আবারও রাজপথে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলেন বেগম খালেদা জিয়া। ২০১৪ সালে বেগম জিয়া যে একদফা আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন তারই চুড়ান্ত পরিণতি ২০২৪ এর পাঁচ আগস্টের গনঅভ্যুত্থান। ১৭ বছর দেশের জন্য,জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করেছে জিয়া পরিবার। বেগম জিয়াকে বিনা অপরাধে নির্জন কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছিল বছরের পর বছর। তারেক রহমান নির্বাসিত ছিলেন। স্বৈরশাসনের জুলুম নির্যাতনে মারা যান আরাফাত রহমান কোকো। তবুও আপোষহীন ছিলেন বেগম জিয়া। আপোষ করেনি জিয়া পরিবার।

২৪ এর পাঁচ আগস্টের পর ইউনুস সরকার যখন জনগণের অধিকার হরণ করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার ষড়যন্ত্র শুরু করে তখন তারেক রহমান দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন। বস্তুত, তারেক রহমানের রাজনৈতিক বিচক্ষণতা এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই শেষ পর্যন্ত ইউনুস সরকার নির্বাচন দিতে বাধ্য হন। আর তাই নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানান দেশবাসী। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয় শুধু বিএনপির বিজয় নয়, ঐক্যের পক্ষে জনরায়। শান্তি এবং সংহতির পক্ষে জনমত।

তাই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, আমি সবার প্রধানমন্ত্রী। যারা ভোট দিয়েছে, যারা ভোট দেয়নি, সবাইকে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তারেক রহমান।এটাই জাতীয় ঐক্যের মূল ভিত্তি। গনতন্ত্রে দলের প্রধানমন্ত্রী হন না, হন দেশের প্রধানমন্ত্রী। চিরায়ত এই গণতন্ত্রের সংস্কৃতি দেশে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যে পথ দেখিয়েছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়া। ঐক্যের মশাল নিয়ে এখন জাতিকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান।

দেশের এই সংকটময় সময়ে বিরোধীদলকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে, এটা থাকাটাই স্বাভাবিক। বহুমতই গনতন্ত্রের শক্তি। কিন্তু দেশের মৌলিক প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, দেশরক্ষা, জনগণের অধিকার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের বিকল্প নেই।

এখন সরকার পতনের হুমকি দেয়ার সময় নয়। এখন সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথ উত্তপ্ত করার সময় নয়। আন্দোলনের নামে অস্থিরতা দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত করবে।

গনতন্ত্রে ক্ষমতা পরিবর্তনের একমাত্র উপায় হলো নির্বাচন। সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরার একমাত্র প্লাটফর্ম হচ্ছে জাতীয় সংসদ।জাতীয় সংসদ হোক সকল বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচারের মাধ্যমে বিকশিত হোক গণতন্ত্র। আর গনতন্ত্র টেকসই হলেই কেবল অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। সরকারর জবাবদিহিতার জায়গা জাতীয় সংসদ, রাজপথ নয়- এটা যদি বিরোধী দল বুঝতে পারে তাহলেই গনতন্ত্র রক্ষা পাবে। দেশ বাচবে।তাই দেশ বাঁচাতে সরকার ও বিরোধী দল উভয়কেই দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, এই দেশ যদি না বাঁচে তাহলে ক্ষমতা দিয়ে কী হবে? সকল পক্ষকে এই সত্য উপলব্ধি করতে হবে।
 

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!