রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৯ ফাল্গুন ১৪৩২

বিদ্রোহী ভাষা-মাথা নত না করার অধ্যায়

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬, ০৫:৫৬ পিএম

বিদ্রোহী ভাষা-মাথা নত না করার অধ্যায়

বেগম আকতার কামাল: তত্ত্ববিদ ভিটগেনস্টাইন বলেন, আজকের দিনে সৃষ্টিরহস্য নিয়ে দর্শনের কাজ করার কিছু নেই। দর্শন বরং ভাষার রহস্য নিয়ে চিন্তাভাবনা করুক। ভাষা নিজে কি চিন্তা করে? নাকি ভাষা দিয়ে মানুষ চিন্তা করে, কল্পনা কুশল হয়, সৃষ্টিশীল হয়? এবং বাস্তবকে বিনির্মাণ করে? ইতিহাস থেকে আমরা জানি, মানুষই ভাষা সৃষ্টি করে নিজেকে অন্যের কাছে ব্যক্ত করার জন্য। আবার ভাষার আড়াল দিয়েই মানুষ নিজের কথাকেও গোপন করে, সবই আড়াল তৈরির ব্যাপারটা ঘটে ভাষাকে অলংকৃত করে, রূপক-উপমা-ধ্বনির মাধ্যমে। আর শিল্পসাহিত্য, তত্ত্বদর্শন ও শাস্ত্র রচনার ক্ষেত্রে এই অলংকৃত ভাষা ব্যতীত উপায় নেই। আবার আমরা যখন সংগীত সৃষ্টি করি ও গণিত রচনা করি তখন সেখানে বিমূর্ত-মৌলিক ভাষা জন্মায়। তবে কাজকর্ম, প্রতিষ্ঠান-রাষ্ট্র-সমাজ ইত্যাদি ক্ষেত্রে ভাষার অস্তিত্ব মানুষের নানা অধিকারের আওতাভুক্ত একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে। অনিবার্যভাবে এখানে মাতৃভাষার কথাই বলা হচ্ছে। অধিকারের এলাকায় ভাষার প্রসারণ ও স্বীকৃতি ঘটানো বা আদায়ের ইতিহাসিত ঘটনাক্রম ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রজনতার রক্তপাত ও লড়াইয়ের ফলে বাংলা ভাষা রাষ্ট্র ভাষা হয়ে গেল। সঙ্গে রইল এই প্রত্যয়– একুশ মানে মাথা নত না করা। ফলে ভাষা-আন্দোলন হয়ে উঠল অধিকার ও সংগ্রামের উৎসারণ এবং আত্মসম্মানের প্রতীক। কেন এমনটি হলো? 
যখন ১৯৪৭ সালে ‘স্বপ্নরাষ্ট্র’ পাকিস্তান নিয়ে যেসব আশা-আকাঙ্ক্ষা জনমানুষের পরিস্ফুটিত হচ্ছিল তখন ভাষা ও শ্রেণিসংগ্রামের অ্যান্টিথিসিসকে সিনথেসিসের মীমাংসা তৈরি করেনি। বাঙালিরা ছিল বঞ্চিত ও অধিকারহীন, অন্তত রাষ্ট্রভাষার অংশীজন হয়ে ওঠেনি। তাই ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’– শাসকের এই ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করতে দেরি হয়নি বাঙালির। প্রত্যাখ্যানের আরও একটি গভীর কারণ ছিল। শুধুই ভাষা-সংস্কৃতি কোনো দেশের একমাত্র অনুজ্ঞা হতে পারে না– যদি না তা আর্থসমাজকাঠামো বদলের তাৎপর্য তৈরি করে। বাঙালিরা চেয়েছিল আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সমান অধিকার লাভের দাবি। কেননা প্রাদেশিক ঢাকার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি তখন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাদের অস্তিত্ব হয়ে উঠেছে দৃশ্যমান ও শক্তিশালী। হাজার বছরের বাংলা ভাষার ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব ও প্রত্যাশা তখন বিকাশের পথ খুঁজছিল এবং সম্মুখগামী হতে চাইছিল। একুশের ভাষা আন্দোলন এই খোঁজার তাৎপর্যই অনিবার্য ছিল। উক্ত আন্দোলন বাংলা ভাষার পক্ষে মতাদর্শ তৈরি করার লক্ষ্যে আধুনিকও হতে চাইছিল। বরং আধুনিকায়নটাই ছিল প্রভূত আকারে, বিপরীতক্রমে শ্রেণিগত বদলটায় বেশি মনোযোগী ছিল না। যদি আজকে আমরা ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করি তবে একটি ভুল শনাক্ত করতে পারি। 
লড়াইটা ছিল মূলত উর্দু ভাষার আধিপত্যের বিরুদ্ধে, অর্থাৎ পশ্চিম পাকিস্তানের শাসনক্ষমতার অবসান ঘটানোর জন্য। উর্দু ভাষার ক্ষমতায়নকে বিরোধিতার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষার বিরুদ্ধাচারণের দিকে শিক্ষালয়গুলোকে ও জনমানসকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। ফলে বাঙালিরা গ্লোবাল ভাষা হিসেবে ইতোমধ্যে গেড়ে বসা ইংরেজি ভাষাটিকে কিছুটা বর্জনই করেছিল। প্যারালাল ভাষা হিসেবে ইংরেছি না শেখায় বাঙালিরা আন্তর্জাতিক বিশ্বে পশ্চাৎবর্তী হয়ে রইল। যার ফলে এখনও জনমনে ইংরেজি ভাষা-ভীতি প্রবল। যদিও ইংরেজি ভাষার গায়ে লেগে থাকছে উপনিবেশের কানিঝুলি, পশ্চিমা জাতীয়তাবাদের নানা উপচার, তবু ইংরেজি ভাষা আয়ত্তের প্রয়োজন আছে ওইসব বাদ প্রতিবাদকে জ্ঞানতত্ত্বকে কাঁটাছেঁড়া করার জন্যই। আরও বেশি প্রয়োজন ছিল রাষ্ট্রীয় ভাষার ক্ষেত্রে মাতৃভাষার অংশভাগ বুঝে নেওয়ার দায়। ফলে বিলম্বিত সঠিকভাবে মাতৃভাষা শিক্ষা ও গ্লোবাল ভাষা শিক্ষণের সমস্যা তৈরি হয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারি যতটা না জাতিতাত্ত্বিক ও  স্বদেশভিত্তিক আবেগের পরিশ্রুতি, যতটা না মিথিক তাৎপর্যবহ ও রিচ্যুয়াল, ততটা মতাদর্শিক রাজনীতির হাত ধরে চলেনি, বারবার নানা বিভ্রান্তি ও লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। এই এগোনোর শক্তি তৈরি করেছেন আমাদের কবি-সাহিত্যিক এবং সংস্কৃতিবিদরা।
আমরা জানি, বাংলাদেশের কবিতার ভাষারূপ নির্মিত হয়েছে হাজার বছরের কবিতার পরম্পরায় ও সাম্প্রতিক কাঠামো দিয়ে। বিশ শতকে ’৪৭-পরবর্তী সময়ে ওই পরম্পরায় যুক্ত হয় রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পুনর্বিন্যাস ও বিনির্মাণের এক দ্বন্দ্বকুটিল সংঘাতক্ষুব্ধ রণাঙ্গন। তখন রাষ্ট্র ও সমাজ ছিল আধা-সামন্ত, আধা-উপনিবেশবাদী। কবিরাও বিচিত্রচারী নিজ নিজ শ্রেণি ও সমাজ প্রতিবেশে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ও বিষয়-বিচিত্রচারী ভাষাশিল্পীদের নিষ্ফল করে দিয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠাকামী ব্যক্তি নাগরিককে প্রতিকায়িত করতে থাকে বাঙালি জাতিসত্তার নৃতত্ত্বে, মানচিত্রে, মনোজগতে এবং তজ্জাত ভাষার আকরণে। ক্রমে তারা আবিষ্কার ও রূপায়িত করতে থাকেন পৃথক অনুষদ, অজানিত অবহেলিত জীবন প্রতিবেশ ও বঙ্গীয় সংস্কৃতির রূপচিত্র ও অর্থদ্যোতনা। বস্তুত আমাদের সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক ভাষাগত চরিত্র ভাষা অন্দোলনের প্রেক্ষাপটেই গড়ে উঠতে থাকে, কিন্তু সে তুলনায় জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চায় বাংলা ভাষার বিকাশ সমরূপ হয়নি।
কিন্তু একুশ শতকের চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের পর্যায়ে আজ যখন বিশ্বব্যাপী অন্তর্জাল-ফেসবুক ইত্যাদি প্রযুক্তি ব্যবহার অনিবার্যভাবে প্রবল ও ঐকান্তিক হয়ে উঠছে, তখন বাংলা ভাষার কী অবস্থা লক্ষ্য করি আমরা। প্রচুর লেখালেখিতে প্রযুক্তিগত ব্যবহার ঘটছে, বিচিত্র ভাষাধ্বনি লক্ষিত হচ্ছে, সে মাত্রায় কল্পনাকুশলতা ও চিত্রধ্যানী তন্ময়তা যেন ভাষা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তির অতিদ্রুত স্ফীতি মুছে দিচ্ছে ক্লাসিক ভাষাকে। স্থান করে নিচ্ছে মৌলিক কথ্যধ্বনি ও চিত্রলতা। বাংলা ভাষা ধ্বনিচিত্রের যুগলবন্দি এবং সুরাত্মক ও গীতল, পঙক্তির পরিসরে যা সংক্ষিপ্ত। ফলে বাংলা ভাষার জন্মায়ন ঘটতে পারে প্রযুক্তিকে উন্নত ও বিকশিত করার মধ্যে ভাষা ব্যবহারের ক্ষমতায়নে। আমরা এমন এক ভাষা বিভূতি আবিষ্কার, যা এআইকে দিলে সে উপমেয়র জগৎ গড়ে দেবে, মাঠের বর্ণনা দিতে বলব এমন নির্দেশাত্মক কোডে যাকে এআই সহজেই বুঝে নেবে। শুধু শূন্য মাঠ হাজির করবে না, দেবে শস্য-শ্যামল দিগন্ত বিস্তৃত এক সবুজ প্রান্তর। অনেক সম্ভাবনা আছে ভাষাগত কোড, নির্দেশ, সংকেত ইত্যাদি শিক্ষণের ক্ষেত্রে। বাংলা ভাষা তাতে হবে সময়োপযোগী ও বিশাল শক্তির অধিকারী। বাংলা ভাষার জয় হোক। একুশের চেতনা অক্ষয় থাকুক। সৌজন্য-সমকাল-শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!