ডেইলি খবর ডেস্ক: তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় কূটনৈতিক সমাধানের আশা ম্লান হয়ে যাচ্ছে। দুই পক্ষ ক্রমেই দ্রুত সামরিক সংঘাতের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিশেষ করে ইরানের শত্রু ইসরায়েল একটি সংঘাতকে সংকটের সমাধান হিসেবে দেখছে। কূটনীতিকরা মনে করেন, তেল উৎপাদনকারী উপসাগরীয় দেশগুলো সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
প্রাক্তন মার্কিন কূটনীতিক এবং ইরান বিশেষজ্ঞ অ্যালান আইয়ার রয়টার্সকে বলেন, উভয় পক্ষই তাদের বন্দুক আঁকড়ে ধরে আছে। যদি না তারা রেডলাইন থেকে সরে আসে, তাহলে যুদ্ধ অনিবার্য।
বিবিসি জানায়, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে গত মঙ্গলবার দ্বিতীয় দফা আলোচনাও ব্যর্থ হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে এখন যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। মার্কিন সামরিক পরিকল্পনা এখন আরও অগ্রসর পর্যায়ে পৌঁছেছে। যে কোনো সময় ইরানে হামলা হতে পারে এমন আশঙ্কার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফের হামলার হুমকি দিয়েছেন। যদিও তিনি এবার সীমিত হামলার কথা বলেছেন।
অন্যদিকে ইরান আলোচনার আলোকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে একটি খসড়া প্রস্তাব প্রস্তুত করবে বলে জানিয়েছে। তবে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরঘচি জানিয়েছেন, চলমান সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই। এই অবস্থায় পরিস্থিতি যে কোনো সময় চূড়ান্ত উত্তেজনার দিকে যেতে পারে।
বিবিসি লিখেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট মধ্যপ্রাচ্যে নৌবাহিনীর বিশাল বহর তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। এই বহরে রয়েছে বিমানবাহী রণতরী এবং অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ। ফলে যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, পারমাণবিক কর্মসূচির আলোচনা নিজের পক্ষে নিতে সামরিক উত্তেজনা ট্রাম্পের একটি কৌশল হতে পারে।
দুই মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, মার্কিন সামরিক পরিকল্পনা একটি অগ্রসর পর্যায়ে পৌঁছেছে। আক্রমণের অংশ হিসাবে ইরানের শীর্ষ ব্যক্তিরা লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এমনকি তেহরানে নেতৃত্ব পরিবর্তনের চেষ্টা করার বিকল্প পদ্ধতিও প্রয়োগ করতে পারেন ট্রাম্প।
গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প তেহরানকে তাদের দীর্ঘস্থায়ী পারমাণবিক বিরোধ সমাধানের জন্য একটি চুক্তি করতে ১০ থেকে ১৫ দিনের সময়সীমা দিয়েছিলেন। অন্যথায় সত্যিই খারাপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে বলে হুমকি দিয়েছিলেন। শুক্রবার হোয়াইট হাউসে আগের হুমকির কথা জিজ্ঞাসা করা হলে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি মনে করি এটা বিবেচনা করছি। একটি ন্যায্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা করাই ভালো।’
যুদ্ধে সমাধান দেখছে না তেহরান -মার্কিন কেবল নিউজ নেটওয়ার্ক এমএসএনবিবির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, ‘ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য কোনো সামরিক সমাধান নেই। গত বছরই তা প্রমাণিত হয়েছে। আমাদের স্থাপনাগুলোতে বিশাল আক্রমণ হয়েছিল। তারা আমাদের বিজ্ঞানীদের হত্যা করেছিল। কিন্তু তারা আমাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করতে পারেনি।’
আরাঘচি গত মঙ্গলবার জেনেভায় ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা করেন। তবে তা ফলাফল ছাড়াই শেষ হয়। তিনি বলেন, আগামী দুই বা তিন দিনের মধ্যে একটি খসড়া প্রস্তাব প্রস্তুত করা হচ্ছে, যা ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা পর্যালোচনা করছেন। এক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও একবার বসা সম্ভব।
যুদ্ধে অনীহা মার্কিন প্রশাসনের -ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে নিজ হাতে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন বলে তার সরকারের পরামর্শদাতারা সতর্ক করেছেন। তারা ট্রাম্পকে অর্থনৈতিক উদ্বেগের দিকে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, এই বছর মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেসিডেন্টের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি ডেকে আনবে।
হোয়াইট হাউসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, ট্রাম্পের যুদ্ধবাজ বক্তব্য সত্ত্বে ইরানের ওপর আক্রমণ চালানোর জন্য প্রশাসনের মধ্যে এখনও কোনো ‘ঐক্যবদ্ধ সমর্থন’ নেই। হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা এবং রিপাবলিকান প্রচারণা কর্মকর্তারা চান ট্রাম্প অর্থনীতির ওপর মনোযোগ দিন। আমেরিকা ফার্স্ট নীতি অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে বাস্তাবায়ন হোক, যুদ্ধের মাধ্যমে নয়।
রিপাবলিকান কৌশলবিদ রব গডফ্রে মনে করেন, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ট্রাম্প এবং তার সহকর্মী রিপাবলিকানদের জন্য উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক বিপদ ডেকে আনবে।
য্দ্ধু হলে পরিণতি কী-ইউরোপীয় এবং আঞ্চলিক কর্মকর্তারা মনে করেন, এই অঞ্চলে মার্কিন মোতায়েনের মাত্রা ওয়াশিংটনকে ইরানের ওপর হামলা চালানোর সুযোগ করে দেবে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, ওয়াশিংটনের মিত্র ইসরায়েলকে রক্ষা করতে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ডেভিড ডেস রোচেস বলেন, যদি আলোচনা ব্যর্থ হয়, তাহলে উপসাগরে মার্কিন তৎপরতা ইতিমধ্যেই হামলা শুরুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাই যদি হয়, তাহলে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অচল করে দেওয়া এবং বিপ্লবী গার্ড নৌবাহিনীর ওপর আঘাত করাই হবে প্রধান লক্ষ্য। এরই মধ্যে বিপ্লবী গার্ড হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার হুমকি দিয়ে রেখেছে। তা ঘটলে বিশ্বব্যাপী তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনে ব্যাঘাত ঘটবে।
কিন্তু কিছু আরব ও ইউরোপীয় কর্মকর্তা বলছেন, ট্রাম্পের লক্ষ্য সম্পর্কে এখন তারা নিশ্চিত নন। তবে ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা হ্রাস করাই হবে ট্রাম্পের প্রধান উদ্দেশ্য। ইরানে শাসন পরিবর্তনের উচ্চাকাঙ্ক্ষাও ট্রাম্পের রয়েছে। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, সামরিক পদক্ষেপ কি ইরানের শাসকগোষ্ঠীর গতিপথ পরিবর্তন করতে পারবে?
এদিকে দুই পক্ষের মধ্যে আপসের লক্ষণ খুব কমই দেখা যাচ্ছে। খামেনির ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা আলী লারিজানি আলজাজিরাকে বলেছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে কিনা তা প্রমাণে তেহরান আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থাকে (আইএইএ) পর্যবেক্ষণের অনুমতি দিতে প্রস্তুত। তেহরান আগেই আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসিকে তার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের ডেভিড মাকোভস্কি বলেন, দুই পক্ষই নিজের দাবিতে বাজি ধরে বসে আছে। ওয়াশিংটন বিশ্বাস করে, প্রচণ্ড শক্তি তেহরানকে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করবে। অন্যদিকে তেহরান বিশ্বাস করে, ট্রাম্পের দাবি পূরণ করা অসম্ভব। ফলে সংঘর্ষ প্রায় অনিবার্য হয়ে পড়েছে। সূত্র: বিবিসি ও রয়টার্স

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :